Thursday, 10 November 2022

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় --
অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --
বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল 
-------------------------------------------

গঙ্গা দিবিধা জাতো  গৌতমী  চ
তদুকতং  ব্রাহ্মণ পুরানে
 একমেব জটাজুটে শম্ভোরাসীন মহজজলম 
অর্ধং ভাগীরথানিতম অর্ধংতদ গৌতমাহুতম ।। 
 
গৌতম মুনি থাকতেন ব্রহ্মগিরি  আশ্রমে ।একবার দেখা দিল ভীষণ  দুর্ভিক্ষ । চারিদিকে হাহাকার পড়ে গেল। 
তখন শিষ্যদের নিয়ে মহর্ষি বশিষ্ট্য গৌতম মুনির অতিথি হলেন । গৌতম মুনি প্রতিদিন ক্ষেতে  বীজ বপন ও   চাষ বাস করে সন্ধ্যার সময় ফসল আমল করে আশ্রমে নিয়ে আসতেন এবং প্রতিদিন অতিথিদের  ভুরিভোজের বন্দোবস্ত করতেন । এইভাবে অনেকদিন কেটে গেল। 
একদিন বশিষ্ঠমুনি বিদায় নিতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। 
গৌতম মুনি তখন বশিষ্ঠ মুনিকে আরো কিছুদিন থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। বশিষ্ঠ মুনি তখন থাকতে রাজি 
হয়ে যান। 

ইতিমধ্যে গৌতম মুনির অতিথিপরায়নতাকে পরীক্ষা করার জন্য বশিষ্ঠ মুনি গনপতির নির্দেশক্রমে কার্তিকেয় 
গরুর রুপ  ধরে গৌতম মুনির সব ফসল নষ্ট করে দেন ।
গৌতম মুনি গরুটির  দিকে তাকালে গরুটি মরার মত পড়ে রইল। বশিষ্ট্য ও তার শিষ্যরা বললেন যে এ ভুমি গোহত্যা পাপে কলঙ্কিত হয়ে গেল। অতএব আমরা অন্যত্র চলে যাব। গৌতম মুনি তাদের ভূমি শোধনের আশ্বাসনা  দিয়ে ত্রয়মবক  পর্বতে এসে কঠোর তপস্যা করেন ।
প্রসন্ন হলেন শঙ্কর মহাদেব। গৌতম মুনি কে বর  চাইতে বললেন। গৌতম মুনি মহাদেব কে বললেন আপনার মস্তকে যে গঙ্গা আছেন  তাকে দিন। গঙ্গা আমার আশ্রমের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হলে আমার ক্ষেত্র পবিত্র হবে ও আমার সুনাম হবে। শঙ্কর ভগবান তথাস্তু বলে গঙ্গা কে মুক্ত করে দিলেন । দক্ষিণ সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গার নাম হল গৌতমি গঙ্গাগোদাবরী। 
সুতরাং গঙ্গার অন্য নাম হল গৌতমি গঙ্গা। 

সমাপ্ত

সম্পাদকীয়--

সম্পাদকীয়--

আকাশের দিকে তাকালে আমরা এক অনন্তকালের আভাস খুঁজে পাই। এই অনন্তকাল কিন্তু কোথাও থেমে থাকে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে চলমান। এই জীবন, জীবন মানে, গণ্ডিবদ্ধ এক সীমারেখা। একটা কাল থাকে যখন পৃথিবীর মূল্যবান বস্তু জড়ো করে আমরা ঘর ভরি। ভবিষ্যতের জন্য গুটিয়ে রাখতে চাই অর্থ, কড়ি, ধন-রত্ন। স্বার্থপরতার চরম সীমা লংঘন করে অনেকে শুধুমাত্র ব্যক্তি স্বার্থে আতিশয্যের পাহাড় দাঁড় করাতে চায়--সব কিছুকে টাকা-পয়সার মূল্যে গুনে নিতে চেষ্টা করে। সেখানে নিঃস্বার্থ ভাবনা লেশ মাত্র থাকে না।

এক অর্থ পিপাসু ব্যক্তি লেখককে প্রশ্ন করেন, তুমি দিনভর কি এমন লেখো ! এতে কত পয়সা পাও ? 

লেখক বলেন, যত সামান্য। 

-- তবুও কত বল ? 

-- এই মাসে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা-- 

-- ফুঃ, এই জন্য এত প্রাণপাত ? 

এক অর্বাচীন লেখক বললেন, আমি তো কিছুই পাই না ! 

তাকে কি বলা যায়, অর্থ পিপাসু ব্যক্তি মুখে তখন কোন ভাষা খুঁজে পান না, কেমন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ওঠেন।

কিন্তু আমরা লেখক কবিরা জানি যে লেখাতে কতটা মনের খোরাক ভরা থাকে। মন সন্তুষ্টি, মানে জীবনের অর্ধ সন্তষ্টির প্রাপ্তি। লেখা আমাদের নেশা, পেশা নয়, মন স্বাস্থ্যের উপযোগী নিঃস্বার্থ ভাবনার দ্যোতক।

মানুষের ভালো থাকা না থাকার ব্যাপারটা তো সম্পূর্ণ মনের। লেখা মন ভরায়, নিজের জন্যে, অন্যের জন্যে, সেখানে অর্থ নেই, স্বার্থ নেই, সময় মাপের প্রাপ্তি নেই।

এবার ফিরে আসি আসল প্রসঙ্গে, এবার আমাদের গল্পের ব্লগ ও ই- পত্রিকা বর্ণালোক  প্রকাশিত হচ্ছে। বারবার লেখক, পাঠকবর্গ ও সর্বসাধারণকে এই পত্রিকা পড়ে দেখতে অনুরোধ জানাই। ধন্যবাদ--

তাপসকিরণ রায়।



সম্পাদকীয়:


রথের রশিতে টান দিয়ে সেই যে শুরু হয়ে যায় উৎসবের বাদ্যি বেজে ওঠা,এক এক করে  পূজোর যেন মিছিল শুরু হয়ে যায়।দুর্গা পূজা ,লক্ষ্মী পূজা,কালী পূজা পার হতে না হতেই ছট্ পূজার সমারোহে মন মেতে ওঠে। এত উৎসবের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে কখন যেন বেলা ছোট হতে শুরু করে। হেমন্তের বেলা বড়ো স্পর্শকাতর! বড়ো তাড়াতাড়ি বেলা ফুরিয়ে ,ঝুপ করে সন্ধ্যা আসে নেমে। ধূসর কুয়াশায় সন্ধ্যার মুখ দেয় ঢেকে। হালকা হিমের পরশে সন্ধ্যেগুলো বড়ো নির্জন মনে হয়,সর্বত্রএকটা মনকেমনের ছায়া!একাকীত্বের নির্জনতায়  একা একা চোখ মেলে সগগো বাতি পথ দেখায় পূর্ব পুরুষদের। হেমন্তে নূতন ফসল কেটে ঘরে তোলার পালা । নূতন ধানের সঙ্গে নবান্ন উৎসব তো গ্রামীন জীবনের অন্যতম উৎসব।প্রকৃতির সঙ্গে মিলে মিশে থাকা পল্লীজীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে কত না প্রবাদ ,কত গল্পের অবতারণা হয় দৈনন্দিনের জীবনকে ঘিরেই। সব গল্পই তাই জীবন মুখী,জীবনকে ঘিরেই তার যত উৎসব , আর তাই নিয়েই কত না  গল্প গাথার আয়োজন!–সাবিত্রী দাস।


সম্পাদকীয়:


জীবন কখনও শূন্য থাকে না।একটি উৎসবের কাল শেষ হলে শুরু হয় আরো একটি উদযাপন।মৃন্ময়ী রূপে প্রকৃতি ও সৃষ্টির আরাধনা শেষে ভক্তকুল পরমব্রহ্ম বা নিরাকার সাধনের দুরূহ পথের যাত্রী হবেন এবার তাই শুভ হয় বিজয়া।বাহ্যিক শেষে অন্তরে চোখ।আমাদের শারদীয় উৎসব শেষে আবার শুরু পথ চলা।বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের অবশ্যই একটি অর্থনৈতিক দিকও আছে।পূজো শেষ হলে সারা বছরের রোজগার শেষে পরিবারের জন্য নতুন জামা কিনে ঘরে ফিরবেন ঢাকি রা,ছোটো ব্যবসায়ী,মৃতশিল্পীরাও।হেমন্তের শেষে নতুন খড় পড়বে চালে,নতুন করে বীজ বোনা শুরু।আমাদের চলা থামে না।সামনে শীতের উৎসব ও বইমেলা।সৃজন চলতেই থাকে।এভাবেই  নতুন নতুন লেখায় ভরে উঠুক বার্ণালোকের চিরসবুজ পাতাগুলি।সকলকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।উৎসব হোক জীবনের আবহমান।—-জয়িতা ভট্টাচার্য।

Wednesday, 9 November 2022

হঠাৎ ফোন -- সন্ধ্যা রায়

হঠাৎ ফোন -- 
সন্ধ্যা রায়

অবসরপ্রাপ্ত বিশাল বাবু ঘরে একাই থাকেন। তিনি সারাদিন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চান। ঘরের কাজে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঘুরে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। রাত হলেই ওনার মনে পড়ে, দুই ছেলে  চাকরি নিয়ে বাইরে থাকে। ওরা বিয়ে শাদী করে বাইরে সুখেই আছে। সবাই বিশাল বাবুকে একা করে চলে গেছে। এমন কি স্ত্রীও তাকে মনে রাখেন নি যে কি সাত জনমের ভার নিয়ে বিয়ে করেছিল । এক জনমেই তা পুরো করতে পারেনি। ছোট ছেলের বয়স তখন মাত্র পাঁচ, স্ত্রীর জ্বর হল, হাসপাতালে গেল, আর ফিরে এলো না। 
ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো, ক্রিং ক্রিং–কাকা বাবু আমি সৎপতির বন্ধু বলছি– 
–কি ব্যাপার, এত রাতে ফোন করলে? 
–উপায় ছিল না কাকাবাবু, খুব দরকারেই এই ফোন করেছি। 
–আমি তোমাকে ভালো করে চিনতে পারছি না। –হ্যা কাকা বাবু খুব ব্যস্ত থাকতাম, কোথাও যাওয়া আসার মত সময় থাকত না। তাই আপনার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি, তবে আমার নাম তো শুনে থাকবেন।
 –হয়ত বা শুনেছি, তবে অনেক বছর আগের কথা এখন আর মনে করতে পারছি না। আমি বয়সের ভারে নুব্জ। এখন আর কিছু মনে রাখতে পারি না।
–না না, কাকাবাবু, আমি হলাম শিবাজী, আমি সতপতির বন্ধু, আমার ভাই রামোজি।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, তোমাদের বাড়ি তো নাগপুরে, তুমি আর তোমার ভাই রামোজি কখনো আসতে তাই তো? 
–হ্যাঁ হ্যাঁ কাকাবাবু, আমি একবার এসেছিলাম । সৎপতির সাথে পড়তাম আপনি জানতেন সেটা। আমি জানি আজকে আপনাকে যেটা বলবো সেটা আপনি জানতেন না। আমার ছোট ভাই খুব জুয়া খেলতো, মদ খেত, এমন কি রেসের মাঠে আমাদের ঘরের জমানো সব টাকা পয়সা উড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর আর যাওয়া আসা ছিল না। তখন আমি আর আমার ভাই দুজনেই কলেজে পড়তাম আমি সৎপতির সঙ্গে বম্বে পড়াশোনা করি। এক দিন বাবা আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি এসে দেখি । আমার কলেজে পড়া তো দূরের কথা । মাথার ছাদটাও যাওয়ার অবস্থা, মা-বাবা কান্নাকাটি করছেন । আমি সৎপতিকে বুঝিয়ে বললাম আমার সব কথা। আমার আর পড়াশোনা হবে না। আমাদের এমনি অবস্থার কথা শুনে সৎপতি বম্বে থেকে কলকাতা এসে গেল। আমরা ছোটবেলা থেকেই একসাথে পড়তাম আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম । ওই আমাকে বলল, তোর পড়া ছাড়লে চলবে না, আমাকে কিছু ভাবতে দে। আমরা আবার দুজনেই একসাথে বোম্বে যাব। বলে সে ঘরে চলে গেল। তখন ভাই রামোজি যে কোথায় আছে ,আমি জানি না, দুদিন ও ঘরে আসেনি। ঘরে শুয়ে আমি আকাশ পাতাল ভাবছি সকালে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। ভোরবেলা সৎপতির ডাকে ঘুম ভাঙলো। শিবাজী একটু থেমে আবার বলে উঠলো, কাকাবাবু আপনি আমার কথা শুনছেন তো  ? 
–হ্যাঁ শুনছি। তুমি তারপর বল । 
সৎপতি আমাকে এসে বলল, এই নে এটা রাখ । এটা সোনার দোকানে দিয়ে সব দেনা পরিশোধ করতে পারবি মনে হয়। তোদের এই বাড়িও থেকে যাবে । আমি দেখে তো চমকে গেছি । একটা আংটি ঝকঝক করছে। 
শতপতি বলল, এটা আমার ঠাকুরদার ছিল । বাবাকে মরার আগে এটি দিয়ে গেছেন । আমার ঠাকুরদা বাংলাদেশের রংপুরের জমিদার প্রতাপ রঞ্জন চৌধুরী ছিলেন। সৎপতি তারপর আর দাঁড়ায়নি, চলে গেছে । সে রাতেই আমার জ্যাঠামশাইকে নিয়ে ফিরে এলো রামোজী।  রামোজীর কাছ থেকে সব কথা শুনেছেন জ্যাঠা মশাই । রামোজি দুদিন পুলিশের ভয়ে জ্যাঠামোশের কাছেই ছিল। জ্যাঠামশাই নিঃসন্তান। জেঠিমা মারা গেছেন। জ্যাঠামশাই সব টাকা পয়সা দিয়ে বাবাকে সাহায্য করে ছিলেন । কিন্তু আমি আর আংটিটা ফিরিয়ে দিইনি । আমার আংটিটার প্রতি খুব লোভ হয় ছিল। আমি সেটা আমার কাছেই রেখেছিলাম । এখন আমার আর কোন প্রয়োজন নেই, তাই এখন আমি এটা ফিরিয়ে দিতে আসছি। 
বিশাল বাবু শুনে বললেন, এখন এই এত রাতে কেন দেবে? তার থেকে তুমি কাল সকালে এসো। 
শিবাজী বলল, না, না, কাকাবাবু, আমার আবার এক জায়গায় যাবার তাড়া আছে। তাই আমার হাতে আর সময় নেই। কথা বলতে বলতে আমি আপনার দরজার সামনে এসে পড়েছি। আপনি দরজা খুলুন।
বিশাল বাবু বিছানা থেকে উঠে হাতের মোবাইলটা রেখে দরজাটা খুলে দিতেই দেখলেন বাইরে প্রচন্ড ঝড় উঠেছে। ঝড়ের মধ্যেই একটা ছেলে তার মুখটা ঢাকা। সে ছুটে গিয়ে টেবিলের ওপর একটা ছোট বক্স রেখেল। তারপর সে আবার ছুটে বেরিয়ে গেল । যাওয়ার সময় বলল, কাকাবাবু যাই । লজ্জায় আমার আর মুখ দেখাতে পারলাম না । আমি আমার কৃতকর্মের ফল পেয়ে গেছি । আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। বলেই সে উধাও হয়ে গেল । বিশাল বাবু দরজা বন্ধ করতে করতে দেখলেন বাইরের হাওয়া ঝড় যেন হঠাৎই থেমে গেছে। উনি ভিতরে এসে আংটিটা দেখে উত্তেজনা আর সামলাতে পারলেন না । খুব খুশিতে ছেলেদেরকে ফোন করে সব বললেন । ছেলেরা শুনে খুব খুশি হল। বিশাল বাবু ভাবতে থাকলেন এটা এখন আমারও কোন দরকার নেই। বিশাল বাবু শুয়ে পড়লেন। ভোর হলে উনি উঠে তৈরি হয়ে রোজগার মত চা হাতে বাইরে বারান্দায় এসে বসলেন । কাগজ পড়ার জন্য কাগজে চোখ রাখতেই উনার চক্ষু চড়ক গাছ । প্রথম পৃষ্ঠাতেই বিরাট করে ছবি, আর ছবির নিচে বড় হরফে লেখা, দুই ভাইয়ের দুর্ঘটনায় মৃত্যু। দুর্ঘটনায় ট্রাক ও ট্যাক্সির সংঘর্ষে রামোজি ও শিবাজী দুই ভাইয়ের মৃত্যু ঘটেছে। খবরটা পড়ে বিশাল বাবু থ হয়ে গেলেন । ভাবলেন কাল রাতে তবে তার সঙ্গে কি ঘটেছিল!    
                              সমাপ্ত

Tuesday, 8 November 2022

বন্দুকের খেলা--তাপসকিরণ রায়


বন্দুকের খেলা--

তাপসকিরণ রায়

অন্ধকার হাতড়ে যাচ্ছিলাম। একটা লাঠি, একি, লাঠি না, একটা পিস্তল মত কিছু একটা হাতে ঠেকলো। ওটাকে হাতে তুলে নিলাম। আমি চমকে উঠলাম না। আঁধারে চকমকিয়ে উঠলো পিস্তলটা। ঠিক এমনি সময় লোডশেডিং ভেঙে দপ করে আলো জ্বলে উঠলো।

আমার হাতে পিস্তল দেখে স্ত্রী, অমি, হেসে উঠলো, ওকি তোমার হাতে ওটা কি ? খেলনার পিস্তল!

হতে পারে খেলনা, আমি বললাম, কিন্তু এত ভারী কেন বলো তো ?

আসলটা কি করে আসবে শুনি? স্ত্রী বলে উঠলো।

তা ঠিক, তবে তোমার ভাই কিন্তু কাল এসেছিল, আমি বলি।

ভাইয়ের নাম শুনে স্ত্রী অসন্তুষ্ট হয়ে বলল, ও পার্টি করে ঠিকই, তবে পিস্তল নিয়ে ঘোরার মত ছেলে ও না।এ নিয়ে আর আমি বিন্দুমাত্র বিতর্কে জড়াতে চাইলাম না। কিন্তু শালাবাবুকে কতটা বিশ্বাস করা যায় তা আমিই জানি।

আমি পিস্তল হাতে নিয়ে আকাশের দিকে উঁচিয়ে ধরলাম।  তারপর হঠাৎ খেলার ছলে স্ত্রীকে টার্গেট করে ট্রিগার চেপে দিলাম। ধুম, করে একটা শব্দ হল। চিৎকার দিয়ে স্ত্রীর রক্তাক্ত দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।


মা-রা কি বেশ্যা হয়? -- মৌসম সামন্ত (অসুর)


মা-রা কি বেশ্যা হয়? --

মৌসম সামন্ত (অসুর)


"মা! এই রবিবারেও তোমার কাজ! কোথায় কি চাকরি করো গো? যার জন্য প্রতিদিন এত সকালে বেরিয়ে যাও আর কতো রাতে ফেরো? আর তোমাকে এতো দুর্বল-ই বা লাগে কেন? তোমার কি হয়েছে?" মাকে একটু চেঁচিয়েই বলে উঠলাম। 

"বয়স হচ্ছে তো সোমু,তাই আর কি...! আচ্ছা আজ তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করবো...ঠিক আছে?" 

"আচ্ছা, পাড়ার লোক তোমার সাথে কথা বলে না‌ কেন? ওই বখাটে ছেলেগুলো তোমার দিকে এমন কটুক্তির দৃষ্টি নিয়ে তাকায় কেন? আমি বুঝতে পারি না..." আমি বললাম।

"ওইটা মেয়েদের সমস্যা রে, তুই বুঝবি না। আমি আসছি, এসে রাতে গল্প করে ঘুম পাড়িয়ে দেবো, আজ প্রমিস আর হ্যাঁ, কেউ ডাকলে দরজা খুলবি না শুধুমাত্র আমি ছাড়া, আমি ডাক দিলেই। ঠিক সময়ে খাবারটা খেয়ে নিস।" মা বললো।

"মা, আমি স্কুলে যাবো না? সবাই স্কুল যায়, মজা করে আর আমি...!" এই বলে আমি একটু মনমরা হয়ে গেলাম।

মা বললো- "পরের মাসেই আমি তোকে হোস্টেলে ভর্তি করে দেবো বাবু! টাকাটা পুরো পেলেই..."

এরপর মা বেরিয়ে যায়। বুঝতে পারি না মা কি কাজ করে যে, এরকম একটা অদ্ভুদ সেজে বাড়ি থেকে বেরোয়। পাড়ার লোক মাকে দেখে থুতু ফেলে, বেশ্যা বলে। এ বাবা, বেশ্যা মানেটা কি মাকে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেলাম। রাতে এলে জিজ্ঞেস করবো। নিশ্চয় চাকরির একটা দিক হবে, হয়তো কোন ভালো পোষ্ট। মা চলে গেছে সকাল ৮ টায়। এইসব ভাবতে ভাবতে সময়টা কখন যেন ১০টায় চলে এল। হঠাৎ সুব্রতদা এসে আমাদের ঠেকে এসে ব্যঙ্গ করে বলতে লাগলো- "ও মিনতি! আছো নাকি...একটা নতুন কাষ্টমার আছে, দুঘন্টায় ৪০০০ দেবে বলছে‌। তুমি কি রাজি? তবে বলো..."

আমি অবাক হয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম। সুব্রতদা আমাকে লক্ষ্য করে বলবো, "কি রে বেশ্যার ছেলে, তোর নাদুসনুদুস মা টা কই?" 

আমি বুঝতে পারলাম না যে সুব্রতদা কি বলতে চাইলো। আমি বললাম- "মা তো বেরিয়ে গেছে! কেন?"

সুব্রতদা ঠোঁট বেঁকিয়ে পাশে দাঁড়ানো লোকটার সাথে কি একটা কথা বলে আমায় বললো..."তোর মায়ের নম্বর আছে?"

আমি মায়ের নম্বরটা গড়গড় করে বলে দি। অজানা লোকটা নম্বরটা লিখে নেয়। এরপর আমি ফোন নম্বর নিলো কেন জিজ্ঞেস করাতে সুব্রতদা বলে ওঠে- "তেমন কিছু না, তোর মায়ের সাথে একটু কাজ আছে আর কি..."

আমি ভাবলাম- "কি এমন কাজ,যার জন্য ৪০০০ টাকা!"

বাবা আমার মাকে ছেড়ে চলে গেছে আজ ৬ বছর, একটা অন্য মহিলকে বিয়ে করে সংসার করছে। সেই থেকে সংসারের‌ হাল মায়ের এই চাকরি চালাচ্ছে। 

রাত বাড়লো। মা এখনো ফেরেনি। আমি জানতাম, এটাই হবে আর তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে একাই ঘুমিয়ে পড়লাম, তবে আজ সারাদিন একটা কথাই মাথায় ভাসছে, বেশ্যাটা কি! 

এরপর মা এলো। দেখলাম ব্যাগটা রেখে বাথরুমে গেলো, চুলটা যেন দেখে মনে হলো কেউ টেনে ধরেছিল, মুখটা পুরো লাল, হাত-পা লাল, ঠোঁটটা মনে হলো কেউ ছিঁড়ে চিবিয়ে দিয়েছে, সারা শরীরটা যেন কোন ক্ষুধার্ত কুকুরের ক্ষুধা নিবারণ করেছে। 

মা বেরিয়ে দেখল, আমি জেগে আছি। কোনরকম অপেক্ষা না করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম, "বেশ্যা কি?" 

মা কথার উত্তর দেয়না। ততক্ষণে মায়ের ব্যাগ খুলে প্রায় ৮০০০ টাকা আর ৭টা পেইনকিলার পেলাম আর সাথে ব্যাথার ঔষুধ। 

মা একটাই কথা বলল যেটা আমার কানে আজও বাজে এই যে- 

"আমি তোর মা, একদিন তুই বড়ো হবি, জানবি তোর মা কি কাজ করে, বেশ্যা কি সব সব...নয়তো সেদিন আমায় তুই ঘেন্নাও করবি, যা মন চায় করিস বাবা, শুধু মনে রাখিস সমাজের কাছে আমি বেশ্যা, তবে তোর কাছে আমি মা...সমাজ কি ভাবলো আমার কিছু যায় আসে না, তবে তুই ভাবলে আসে। আর বাবা, মায়ের থেকে বড়ো কাজ বা শব্দ হয়না!"

এই বলে মা কাঁদতে শুরু করে দিল।

আচ্ছা আপনারাই বলুন তো, মা-রা কি সত্যিই বেশ্যা হয়?


সমাপ্ত

সম্পর্ক -- ডঃ সুজিত কুমার বিশ্বাস

 

সম্পর্ক --

ডঃ সুজিত কুমার বিশ্বাস


-শুভ, -এই শুভ এদিকে আয় বাবা !

- হ্যাঁ বাবা বলো।

প্রমথেশ অবাক হয় বাবা ও ছেলের সংলাপ শুনে। যেন কত চেনা, কত দিনের কত পরিচিত সম্পর্ক। কিন্তু সে জানে শুভ বিকাশ বাবুর দত্তকপুত্র। যেদিন বিকাশ বাবু শুভকে  পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন সেদিন প্রমথেশ হাজির ছিল সেখানে। আজ শুভ আর বিকাশবাবু সম্পর্কের বন্ধন তাকে অবাক করে দেয়। আর প্রমথেশ বাবু তার নিজের ছেলের কথা ভাবতে থাকেন। তার ছেলে এমবিবিএস পড়তে এখন ব্যাঙ্গালোর। শুধু মাঝে মাঝে কথা হয়। দেখা হয় ভিডিয়ো কলে, সাক্ষাৎ হয় এভাবেই।কিন্তু দেখা হয় না অনেকদিন। আজ এদের দুজনের সম্পর্ক দেখে নিজেকে অবাক হতে হয় প্রমথেশ বাবুর।

 - ছেলে তো বড় হলো এবার একটা বিয়েথা তো দিতে হয়! প্রমথেশ জিজ্ঞাসা করে।

- সেটাই। আমি যে ভাবছি না, তা কিন্তু নয়। ভাবছি। কিন্তু হয়ে উঠছে না। তাছাড়া শুভও তেমন আগ্রহ দেখায় না।

শুভ ভালো ছেলে। পড়াশোনা করে। এখন বাবার প্রতিষ্ঠিত স্কুলেই  কাজ করে সে। কিন্তু কোনো মেয়ের সাথেই সে যোগাযোগ করতে পারেনি। আজকের দিনে এটা ভেবে অবাক হতে হয়।

- আসলে কি জানো প্রমথেশ! আমার কোথায় একটা ঘাটতি আছে। একটা হীনমন্যতা কাজ করে এতদিন পর। কে কীভাবে নেবে এই ভেবে? এতদিন ছোটো ছিল সমস্যা হয়নি। কিন্তু-

- কিন্তু নয়! তোমাদের বন্ধন তো ভালো। দেখি আমিই একবার চেষ্টা করে।

- দেখো।

- ভাইটাকেও তো বিয়ে দিতে পারলাম না একই কারণে।

- মানে?

- কী কারণ?

- আমার বাবা ওকে দত্তক নিয়েছিলেন। ও তো  আমার মায়ের পেটের ভাই নয়।

- এই তথ্যটা আমি এতদিনে জানতাম না।কিন্তু দুই ভাইয়ের বয়সের ব্যবধান দেখে একটা সন্দেহ যে প্রমথেশের হয়নি, তা কন্তু নয়।

- আসলে বলিনি। তাছাড়া আগেকার  অনেকেই জানে বিষয়টি।

প্রমথেশ চুপ করে থাকে।

সমাপ্ত

মেয়ের জন্মপাপ -- বহ্নিশিখা


মেয়ের জন্মপাপ  --                                                    বহ্নিশিখা

প্রতিটা মানুষের চলার পথে কাঁটার বেড়া।

ইচ্ছানুযায়ী কাজের মাঠে হয় কাদা নয় কংক্রিট। দিতির জীবনে কোনদিন তার  পরিকল্পনামতো কাজ সম্পন্ন হতে দেখেনি।

           আজও বেলা আসেনি। দিতি ভাবে সবাই জপে আল্লাহ্ আল্লাহ্। আমি জপি বেলা বেলা, যন্ত্রণা!কি সমস্যা হলো কে জানে। ফোনটাও অফ। ওর ছেলেটা হয়ত কোন সমস্যা করেছে। এর হয়েছে জ্বালা। 

কুড়ি বছর বয়সে বিয়ে।তারপরে আর এক কুড়ি পার করে দিলো জুয়ার আসর থেকে বরকে ঘরে ফেরাতে। এরমধ্যেই দুই ছেলের জন্ম দিয়ে ঝিয়ের কাজ নিয়েছে। আর কুড়ি চলে যাবে জুয়ারি বখাটে ছেলেকে জীবন চেনাতে। 

           "মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া পূর্ব জন্মের পাপের ফল" ছোটবেলা শুনেছিল দিতি। নারীবাদী দিতি কুসংস্কারে বিশ্বাসী না হলেও আজকাল কথাগুলো তাকে খুব ভাবায়।

           কি পাপ করেছিল বেলা? দু'দুটো পর্যায়ে পুরুষকে পথে আনতে রাতদিন এক করছে। হয়ত বেলার পরিশ্রম সার্থক হবে।হয়তো হবে না। ধুকে ধুকে নিঃস্ব হবে বেলার চোখের সামনেই। এই ফেরাতে না পারাই কি পাপ?

     এমন অজস্র বেলার জীবন -বিত্তভেদে ভিন্নমুখী। কে খবর রাখে তার।তবুও নারীর  পূর্ণোদ্দম সংসারে।অথচ বিশ্বসংসারে নারী এখনো উপেক্ষিত। লাঞ্ছনার শিকার। 

           ভাবতে ভাবতে নিঃসন্তান দিতির হাতে কাজ ফুরিয়ে যায়।সন্তানের মঙ্গল কামনায় এক মায়ের মনের হু হু করা কান্না তার বুকের ভিতর পৌষের শীতলতা অনুভব করে।ভুলে যায় ক্লান্তি। মাস কাবারি টাকায় বাঁধা বেলার কাজে না আসা।

              সে জানে ঈশ্বরও মানুষের মতো লোভী। নাস্তিক দিতির প্রার্থনা ঈশ্বর শুনবে না জেনেও সে বিপথে যাওয়া বেলার ছেলের জন্য প্রার্থনা করে।

সমাপ্ত 

ফিরে পেতে চাই --- শান্তা মিত্র

 

ফিরে পেতে চাই --- 

    শান্তা মিত্র 


ফিরে পেতে চাই সেই সময়কে যেই  সমযে  ছিল না কোন দলাদলি, কথায় কথায় রেষারেষিতে জড়িয়ে পড়া আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ছিল শুধুই  নিছক আনন্দের দিনগুলো আবেগ আর সরলতায় ভরা শৈশব। সেই সব  স্মৃতিতে ভর করে আজও অনেক  প্রতিভা ও শিল্পীর সৃষ্টি হয়। সেই সব সৃষ্টি ও তার শিল্পীরা আশেপাশে ছড়িয়ে রয়েছে যাদের আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। কিন্তু  আজ আমাদের আগামী প্রজন্ম স্মার্ট ফোন  নামক এক যন্ত্র তে আবদ্ধ হয়ে। আছে  তাদের পুরো পৃথিবীটাই এখন এটা হয়ে গেছে। এটা কে তারা জন্ম থেকে দেখছে আর এই ফোনকে আঁকড়ে ধরেই বড় হচ্ছে ,তাদের খাওয়া থেকে শোওয়া অবধি সবটাই শুধুই মোবাইল ফোনকে সঙ্গে নিয়ে চলে । তাদের বড় হওয়া স্বপ্ন দেখা তাদের ভবিষ্যৎ এর সবকিছুই নির্ভর করছে এই ফোন ঘিরেই। তাদের  আনন্দ করার জায়গাটাও এখন এটাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে মোবাইল ছাড়া তারা এক মুহূর্ত থাকতে পারেনা, মোবাইলের জন্য তারা সব করতে পারে। আজ এমন দিন এসেছে যে এই মোবাইলের জন্য তারা জীবনকেও শেষ করতে দ্বিধাবোধ করে না। আবার অনেকেই এর জন্য ভুল পথেও চলে যাচ্ছে। আজকাল একটা বাচ্চা জন্মেই স্মার্টফোন এ তারা খুব তাড়াতাড়ি অনেকটা স্মার্ট ও বড় হয়ে যাচ্ছে। এই ফোন নিয়েই  যেন তাদের জীবনের সমস্ত কিছু  চাওয়া পাওয়া দেনা পাওনা  সব মিটে যায়। আজ এর জন্য খেলাধুলাকে ভুলে গেছে এবং আত্মীয় পরিজন বন্ধু-বান্ধব সব কিছু থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছে আর এটাতেই তারা নিজেদেরকে খুব সুখী মনে করে। এর কারণে তাদের যে কত ক্ষতি হচ্ছে তা তো তারা বুঝতেই পারছে না। আর আমরা বাবা মা এরা বুঝেও  বুঝিনা করেই তাদের সর্বনাশের দিকেই ঠেলে দিচ্ছি প্রতিনিয়ত বাচ্ছাদেরকে। আমরা বাবা-মা রা ভুলে তো ভুলেই গেছি তাদের অন্যভাবে বড় করতে। খুব সহজ হয়ে  গেছে এই কাজ টা আমাদের কাছে এখন খালি ফোনটা ধরিয়ে দাও ব্যস কেল্লাফতে। আর এটাকে হাতে দেওয়া মানেই বাচ্চাদেরকে সমস্ত কিছু পাইয়ে দেওয়া কষ্ট করতে হয়না আর কি। খুব সহজ হয়ে গেছে এখন বাচ্চাদের বড় করাটা। এই প্রজন্মটা সমস্ত কিছু হারিয়ে ফেলেছে আমরা যেগুলো পেয়েছি তারা তার কিছুই পেলনা। আজ একটা বাচ্চার কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে  নিলে সে খুব কষ্ট পায় কাঁদে জেদ করে । আর সে যখন আরেকটু বড় হয় তখন তাদের সেই জেদ এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, অনেক বাচ্চারা অভিমানে কষ্টে সুইসাইড পর্যন্ত করে ফেলে।  তবে সকলেই সমান হয় না তাদের  মধ্যে কেউ কেউ এই মোবাইল নিয়েই  জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে আর যায় ।আর ভালো একটা ভবিষ্যৎ তৈরি  করে ফেলে।  আমরা আমাদের ছোটবেলায় কেমন ভাবে কাটিয়েছি কেমন ভাবে  মাঠে ঘাটে খেলা করেছি এর তার বাগানের ফল ফুল চুরি করেছি কত আনন্দ করেছি আবার সবকিছুর পর  বাড়িতে এসে বই নিয়ে বসেছি। লুকিয়ে সিনেমা  দেখা আড্ডা মারা গল্প করা মধ্যে যে কি মজা ছিল সেটা আমরাই জানি। এইসব কিছুর পিছনে একটা মধুর শৈশব লুকিয়ে ছিল । আর সেই বড় হওয়ার পিছনের যে আনন্দ ছিল সেসব  তারা পায় না, এগুলো ওদের কাছে অচেনা অজানাই  রয়ে গেল । কিছু বাচ্চা তো ফোন এডিক্টেড হয়ে  এক একটা  ভয়ংকর মানসিক রোগীতে পরিণত  হয়ে গেছে ।এর থেকে ওদেরকে  আমাদের কেই উদ্ধার করতে হবে।

আর এই প্রজন্মদের কে এই  অসুখ ও ধ্বংসের থেকে রক্ষা করতে হবে আগামী ভবিষ্যতের জন্য । তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে আমাদের মত বাবা মা দেরকেই ওদের একটা সুস্থ ও সুন্দর জীবন উপহার দেওয়ার জন্য । তবেই আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা সত্যিকারের বাবা-মা হতে পারব । তখনই আস্তে আস্তে পৃথিবীটা আগের মত সুন্দর ও উন্নত হবে। আর  প্রতিহিংসাপরায়নতা  মানুষে মানুষে যুদ্ধ এসব শেষ হয়ে গিয়ে আর একটা নতুন পৃথিবী গড়ে উঠবে থাকবে শুধুই  ভালোবাসা ভরা মিষ্টি জীবন। আসুন আমরা হাতে হাত ধরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই ফিরিয়ে দিই ওদের সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলাকে।

সমাপ্ত 

ভরসার দিনে -- অদিতি ঘটক


ভরসার দিনে --

অদিতি ঘটক


স্কুল থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই চড়বর করে বড় বড় ফোঁটায় হঠাৎ বৃষ্টি। ছাতাতেও এই বৃষ্টি আটকানো অসম্ভব তার মধ্যে উলোট পালোট হাওয়া। অসময়ের বৃষ্টি। রিক্তা সামনেই একটা বন্ধ দোকানের শেডের নিচে দাঁড়ালো। এলোমেলো ছাঁটে বেশ ভিজে গেছে। 

ছাতা বন্ধ করতে করতে আরো একজন এসে দাঁড়ালো। তারও জামা প্যান্ট একই রকম। হঠাৎই করেই এই তুমুল বৃষ্টিতে রাস্তা প্রায় নিমেষে ভোজ বাজির মতো ফাঁকা হয়ে গেছে। দু পাশের দোকান পাট বন্ধ। এই দুপুরেই যেন সন্ধে ঘনিয়ে এসছে। শুধু মাঝে মাঝে কালো আকাশের গায়ে বিদ্যুতের আঁকিবুকি খেলা আর কড়কড় শব্দ।

আজকের সাথে সেদিনের কত মিল। সেদিনও আজকের মতোই আকাশ কালো, সেদিনও স্কুলফেরত। হুড়মুড়িয়ে অঝোর বৃষ্টি। রিক্তা একছুটে বেণী দোলাতে দোলাতে টিনের শেডের তলায় ঢুকে পড়ে। একটা ভেজা  সাদাশার্ট, কালোপ্যান্ট, সাইকেলও ঠিক অমনি হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে যায়। দুজনের চোখে মুখে মাথায় বৃষ্টির  ফোঁটা। সদ্য আধ ফোটা বৃষ্টি স্নাত কুঁড়ির মত সৌন্দর্য ঝরে পড়ছে  যৌবনের দোরগোড়ায় দাঁড়ানো দুজনের দেহ থেকে। আড় চোখে দুজন দুজনকে দেখে। চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নেয়। একটা অজানা শিরশিরে ভালো লাগায় মন ভরে ওঠে। 

একটু পরেই জোরে বিদ্যুৎ চমকায়। তারপরই মেঘের দুন্দুভি নির্ঘোষ। রিক্তা ভয়ে শিউরে ওঠে। সাদাশার্ট সসঙ্কোচে হাত বাড়ায় কিন্তু সম্পূর্ণ প্রসারিত নয়। আঙ্গুলগুলো দ্বিধা, দ্বন্দ্বে, লজ্জায় কুঁকড়ে। 

তারপর কতবার ভিজে পথ শুকোলো  কতবার বর্ষায় উপচানো নদীর জল কমলো। কতবার বৃষ্টিস্নাত গাছ পাতা হারিয়ে রিক্ত হল।

সেদিনের মতোই আজও জোরে বিদ্যুতের চমক। মেঘের দুন্দুভি। ভয়ে শিউরে ওঠা। সেদিনও বাড়ানো হাতটা লজ্জা, দ্বিধা, দ্বন্দ্বে কুঁকড়ে ছিল। 

আজও।

তবুও গ্রন্থিহীন কোনো অদৃশ্য বন্ধন যেন হাওয়ার মতো দুজনের মাঝে বয়ে যায়। যা দেখা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।

সমাপ্ত

Monday, 7 November 2022

রাজু -- স্বপ্না মজুমদার



রাজু --
স্বপ্না মজুমদার

রাজু আর ললিত ছোটোবেলার দুই ঘনিষ্ট বন্ধু।
রাজু কৃষক পরিবারের ছেলে। ললিত গোয়াল পরিবারের ছেলে। ছোটো বেলায় গ্ৰামের পাঠশালায় দুজনে একসাথে পড়তো। একটু বড়ো হয়ে গাঁয়ের ফ্রি স্কুলে পড়তে যেতো।তবে বড়ো হওয়ার সাথে সাথে বাবার হাতে হাতে দুই বন্ধুকেই কাজ করতে হতো। গরীব ঘরের ছেলে, কাজ না করলে তো চলবে না।

তবে রাজুর পড়াশোনায় খুব আগ্ৰহ ছিল। সে কাজের ফাঁকে পড়তেই বেশি ভালোবাসতো। ললিতের পড়ার প্রতি অতো আগ্ৰহ ছিল না। তাতে ওর বাবা বেশ খুশিই ছিলেন। গোয়ালে অতো গোরুর কাজ ও লোকের বাড়ি দুধ দেওয়ার কাজে ললিত বেশ সাহায্য করতে ভালোবাসতো। পড়াশোনা করতে ললিত ভালোবাসতো না।পরবর্তীতে সে বাবার পেশাতেই বেশ মানিয়ে নিয়েছিল,এবং গ্ৰামের মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করে মোটামুটি জীবন কাটাচ্ছিল।

ওদিকে রাজুকে ওর বাবা চাষের কাজে বেশি পেতো না।রাজু খালি পড়তে চাইতো। বাবা বলতেন,,, আমরা গরীব মানুষ এতো পড়তে চাইলে হবে রে। চাষের কাজ শেখ্।এটা করেই জীবন কাটবে। রাজুর মন মানতো না।
এই নিয়ে ঘরে খুব অশান্তি হতো। একদিন অশান্তি অনেক দূর গড়ালো। তার ফল রাজু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেল। দূরে শহরের কাছ ঘেষে এক চায়ের দোকানে কাজ নিল। সারাদিন কাজ করে রাত জেগে পড়তো সে। চায়ের দোকানে আসতো এক মাস্টার মশাই। রাজু অনেক কিছু তার কাছ থেকে জানতে চাইতো। মাস্টার অলোক বাবু রাজুর আগ্ৰহ দেখে পুরোনো বই খাতা জোগাড় করে দিতেন। রাজু প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করলো।এরপর টুয়েলভ। দোকানে বেশি সময়,কাজ করতে চাইতো না রাজু।পড়তে হবে,এটাই মাথায় ঘুরতো। চায়ের দোকানের মালিক একদিন রাজুকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিল। রাজু এক মুদি দোকানে দিনের বেলা কাজ শুরু করলো। সন্ধ্যায় ওই দোকানের পিছনে আধো আলোয় বসে পড়তো। দোকানের গো,ডাউনেই ঘুমোতো।

রাজু এভাবে টুয়েলভ পাশ করে ভাবলো,,কোনো রকমে চেয়েচিন্তে এ পর্যন্ত তো হলো। এবার কি হবে? 
সেদিন বসে দশটাকা দিয়ে ঝালমুড়ি কিনে পার্কে বসে আছে রাজু। ভাবছে বসে আকাশ পাতাল। ঝালমুড়ি খেয়ে কাগজের মোড়কটা ফেলতে গিয়ে দেখে রেলে লোক নিচ্ছে, টুয়েলভ পাশ। রাজু  সেই মাস্টার মশাইয়ের সাথে যোগাযোগে বরাবর রেখে ছিল। তার বাড়ি মাঝে মাঝে যেতো। মাস্টার মশাই রাজুকে বড়ো ভালোবাসতো।ওর নরম পড়াকু স্বভাবের জন্য।
মাস্টার মশাই শিখিয়ে দিলেন কিভাবে আ্যপ্লাই করবে।
রাজু ক্লিনিংয়ের জব পেলো। মাস্টার মশাই বললেন,,,তুই কি এ কাজ করতে পারবি রে?সবাই পারে না। রাজু বলে,,,আমাকে যে পারতেই হবে স্যার। আমি যে আরো পড়তে চাই।
মাস্টার মশাই দু,হাত মাথায় রেখে আশীর্বাদ করলেন।
বললেন,, জীবনে অনেক বড়ো হ, বাবা।
রাজুর লড়াই চলতে থাকলো। রাজু ওপেন ইনর্ভিসিটি থেকে গ্ৰাজুয়েশন, মাস্টার্স শেষ করে।  মাস্টার মশাইয়ের উপদেশে বি,এড করে একটি স্কুলে জব নেয়। রাজুর এটাই ছিল ছোটোবেলা থেকে স্বপ্ন। আজ পূর্ণ হলো।

ধীরে ধীরে কোচিং সেন্টার খোলে রাজু। বেশ পসার বেড়েছে তার। ব্যাঙ্ক লোনে একটি ফ্লাট কেনে সে। মাস্টার মশাই এবার বলেন,, রাজু একটা কথা বলি,,,রাখবি, আমার ইচ্ছেটা?আমার ছোটো মেয়েটাকে বিয়ে করবি?
রাজু বলে,,,  স্যার , বিয়ের কথা এখনো ভাবিনি। আগে আমার বৃদ্ধ বাবা,মা,, তাদের খোঁজ নিতে হবে। দুই দিদির বিয়ে হয়েছে কি না ,জানতে হবে। আমার অনেক দায়িত্ব আছে স্যার। তাছাড়া আপনার মেয়ের সম্পর্কে আমি তো কখনো ভাবিনি।  আমি খুব গরীবের ছেলে স্যার। আমার সাদামাটা জীবনের সাথে সবাই মানাতে পারবে না।
মাস্টার মশাই অলোক বাবু জানেন ,বোঝেন,রাজু অমূল্য হীরা। মুখে একটু হেসে বলেন,,,বেশ বেশ,তোর বাবা  মায়ের সাথে এবার যোগাযোগ কর। তোর দায়িত্বকে আগে ঠিকমতো পালন কর্।এটাই করা উচিৎ।

দীর্ঘ সময়,বছর পরে রাজু বাড়ি ফেরে। বাবা,মা অবাক।
তারা জানতো, ছেলে আর কখনোই ফিরবে না।
সেই ছেলের এতো পরিবর্তন ও উন্নতির সব কাহিনী শুনে গর্বিত হন গরীব চাষী বাবা, মা। রাজু দেখে বাবা আর চাষের কাজ সালাতে পারে না জমি বিক্রি করে দুই বোনের বিয়ে দিয়েছেন। এখন গ্ৰামের পথের ধারে এটি সবজীর দোকান করেছেন। কোনো রকমে দুজনের জীবন চলে।
বাবা,মা,, বোনেদের জন্য শাড়ি,ধুতি ও অনেক রকম জিনিস এনেছিল কিনে রাজু। বাবা,মা আজ খুব খুশি।
দিদিদের বাড়িতেও গিয়ে দেখে আসে তাদের। যোগাযোগ রাখতে বলে।দেখা করে গাঁয়ের সকলের সাথে।ছোটবেলাটা যাদের সাথে কেটেছে।

ছোটোবেলার প্রিয় বন্ধুর বাড়িতে আসে,,, বন্ধুর বৌ আপ্যায়ন করে ঘরে একটি চেয়ারে বসতে দেয়।
বন্ধু ললিত সামনে আসে। বলে,,, তুই এসেছিস আমি জানি। কিন্তু তোর সামনে যেতে পারিনি। কোথায় তুই,আর কোথায় আমি।
রাজু বলে,,, ওটা জীবনের গল্প। সব শেষে বন্ধুত্বটাই দামি। তোকে কি আমি কখনো ভুলতে পারি,বল্।
ললিত বলে,,, আমার তো খুব সাধারণ জীবন। লেখা পড়া তোর মতো করলাম না। ইচ্ছেও করতো না।
রাজু বলে,,,এটা তোর পছন্দ।ওটা আমার পছন্দ। এ সব কথা থাক। তোর জন্য ছোট্ট উপহার এনেছি।
তোর  ছেলে মেয়ে ক,টি?
ললিত বলে,,চার জন।
রাজু একটু হেসে বলে,,,এ ব্যাপারে তুই বেশ অনেকটা এগিয়ে। আমার বয়স বত্রিশ হয়ে গেল। এখনো কিছু শুরুই হলো না।

ঘরে ফিরে আসে রাজু। বলে মা,,, ছুটি যা নিয়ে এসেছিলাম,সে তো শেষের দিকে। এবার যে ফিরতে হবে আমায়। মায়ের চোখে জল।বাবার মন খারাপ।
রাজু বলে,,,একা ফিরে যাবো বলে তো আসিনি আমি।
তোমরাও যাবে আমার সাথে গুছিয়ে নাও যৎসামান্য।
পরশুদিন গাড়ি আসবে।
বাবা বলেন,,কি করে হবে? এই বাড়ি ঘর,দোকান সব তো আছে। 
রাজু বলে,,, সব ভাবা হয়েছে বাবা। এসব দিদিদের  দুজনের জন্য থাক। তোমরা আমার ওখানে চলো। তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না।

শহরে ছেলের বাড়িতে এসে সব দেখে গরীব চাষী বাবা মা,যেনো স্বপ্ন দেখেন। ভাবতেই পারেন না এতো সুখ তাদের ভাগ্যে ছিল। 
সময় যেতে থাকে বেশ। মস্টার মশাই অলোক বাবু হাল ছাড়েন না , কোনো ভাবেই। অবশেষে সকলের সহমতে স্নেহের রাজুকে ছোট জামাই হিসেবে বেশ অনুষ্ঠানে ঘটা করেই গ্ৰহণ করলেন। 
শুরু হলো রাজুর জীবনের আরেক অধ্যয়।।

(এমন জীবনের গল্প আমরা নানা ভাবে সমাজের বুকে দেখি, তবুও নতুন আঙ্গিকে জীবনের গল্প ফিরে ফিরে আসে।)

                              সমাপ্ত 

পুণা,,, মহারাষ্ট্র
৩০/১০/২০২২

Sunday, 6 November 2022

স্ক্রীন --সমরেন্দ্র বিশ্বাস


স্ক্রীন --

সমরেন্দ্র বিশ্বাস


এই দিনগুলোয় মোবাইলের স্ক্রীনে ধরে রাখা আছে আমার যাবতীয় মুখপাতআমার কাজের যাবতীয় সংলাপআমার বলার সবটুকু কথাআমার দেখার সবটুকু চোখ

অথচ আগে এমন ছিল না। আমার সমস্ত কাজ ছড়িয়ে থাকতো মাঠে, প্রান্তরে, জনপদে। আমার সব কথা ভেসে থাকতো বাতাসে বাতাসেআমার ফুলগুলো ভালোবাসা হয়ে ফুটে উঠতো সবুজ গাছে

স্ক্রীনে বন্দী রাখা এ কেমন মোবাইল আর কমপিউটরের সভ্যতা? এ কোথায় আজ আমরা সবাই আটকে আছি!

ঘরে ফিরে আজ আমি একলা কমপিউটরের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম - আমায় ফিরিয়ে দাও আমার নিজের মুখআমার দেখার চোখ। ওহে নীলাভ আলোর বৈদ্যুতিক স্ক্রীন! ফিরিয়ে দাও আলো হাওয়া গাছ ফুল পাখি, জীবনের  মধ্যে মিশে থাকবার যাবতীয় আনন্দফিরিয়ে নাও তোমার মাদার – বোর্ডফিরিয়ে নাও স্ক্রীনে ধরে রাখা তোমাদের যাবতীয় মুখছবি

আমার চেঁচামেচি শুনে কমপিউটরটা নড়ে চড়ে উঠলো, ওর স্ক্রীনের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা দুটো হাত আমার দিকে হাত জোড় করে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলতে লাগলো – আমারও বড় ক্লান্তি লাগে, দেখো না আমার সিগন্যাল রাতদিন কেমন বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। জবরদস্তি সারা দিন আমিও কেমন শশ্রুষাবিহীন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আছি!

সমাপ্ত

সন্দেহের পরিণতি-- মহা রফিক শেখ


সন্দেহের পরিণতি--

মহা রফিক শেখ 


হৈমন্তীর সাথে রানার প্রায়ই ঝগড়া লেগেই থাকে। রোজ সন্ধ্যায় রুটিন মাফিক কিচিরমিচির। দুপুরের দিকে ফোনে হৈমন্তীর চেল্লামিল্লি। সম্পর্কে দুজনের স্বামী স্ত্রী। বিগত পাঁচ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক। তবুও কোথাও যেন একটা টানাপোড়েন।

আসলেই হৈমন্তী প্রথম থেকে সন্দেহপ্রবণ। সন্দেহ বাতিকে ভুগছে। যেকোনো বিষয়ে-  যে কোন সময়ে।

কখনো বা সীমা অতিক্রম করে হুলুস্থুল কান্ড ঘটিয়ে দেয়। এই ব্যাপার গুলো মোটামুটি পাড়ার লোকেরা জেনে গেছে।

রানা বেচারা শিক্ষিত ভদ্রলোক। বহু কষ্টে লেখাপড়া করে আজ একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করে। টার্গেট আর প্রেশারে বেচারার দম ফেলার সময় নেই। কিন্তু এরই মাঝে তার স্ত্রী হৈমন্তী "সন্দেহ সন্দেহ"  করে তাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।

অফিসে গেলে কোন মহিলা সহকর্মীর সাথে রানার নাকি প্রেম আছে। অফিসের বাইরে গেলে কোন মেয়েকে নাকি দেখে। কোন অপরিচিত মেয়েকে নিয়ে নাকি শপিং করাতে যায়। পার্কে মেয়েদের সাথে ঘুরঘুর করে। নিজের বাড়ি এলে পাড়ার কোন মেয়ের সাথে নাকি রানার প্রেম চলে-।  ইত্যাদি ইত্যাদি। এরকম হাজারো উদ্ভট অবাস্তব ভাবনার তীর রানার দিকে ছুঁড়ে দেয়। বউয়ের ভ্রান্ত সন্দেহে এবং অফিসের চাপে রানা আত্মহত্যারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বাচ্চার মুখ চেয়ে কিছু করতে পারেনি। রানা একদিন সিদ্ধান্ত নিল যে হৈমন্তীকে শহরের ভালো একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কে দেখাবেন। সেইমতো এক ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট করে হৈমন্তীকে পরের দিন  দুপুর বারোটার সময় আসতে বলল নির্দিষ্ট চেম্বারে। আর রানা অফিসের একটা জরুরী কাজ সেরে ঠিক বারোটায় ওই চেম্বারে হাজির হবে। এ রকমই কথা হল- দুজনের মধ্যে। সকাল হতেই হৈমন্তী বারোটার অনেক আগেই পৌঁছে গেল ওই চেম্বারে। বারবার ফোন করতে লাগলো রানাকে। কিন্তু কোন রিপ্লাই আসছে না।। ক্রমাগত রিং বেজেই চলছে। কোন সাড়া নেই। হৈমন্তী প্রচন্ড রেগে গেলেন এবং তার সন্দেহ বাতিকতা ক্রমশ ঝড়ের আকারে বাড়তে লাগলো। রাগে তার মুখ একেবারে লাল হয়ে গেছে। হঠাৎ চেম্বার থেকে কিছুটা দূরে প্রচুর মানুষের জটলা এবং চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ কানে আসতে লাগলো। পাশের একটা লোককে হৈমন্তী জিজ্ঞাসা করল  "কি হয়েছে ওখানে? লোকটি বলল-  একটা মারাত্মক বাইক দুর্ঘটনায় একটা লোক নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে আছে। রক্তে সারা রাস্তা ভেসে যাচ্ছে। হৈমন্তী কৌতুহলবশতঃ সেখানে গিয়ে হতবাক। তার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এতো তারই স্বামী! পাশে পড়ে থাকা ফোনটা তখনো অবিরত বেজে চলছে - হয়তো অফিসের কোন বসের। হঠাৎ সাইরেন বাঁচিয়ে একটা গাড়ি এল। না ,কোন এম্বুলেন্স নয় । শববাহ গাড়ি। চোখের নিমেষে নিথর রানাকে নিয়ে চলল - শান্তির শেষ গন্তব্যে। মহা শ্মশানে। 

হয়তো সন্দেহের অবসান এবার ঘটবে।

সমাপ্ত

Saturday, 5 November 2022

স্মৃতি শেখর মিত্রর গল্প --ঈশ্বর ভরসা



স্মৃতি শেখর মিত্রর গল্প --
ঈশ্বর ভরসা

মেয়েটার দুদিন ধরে খুব জ্বর আসছে। সহেলীর
মা সহেলীর জন্য ভীষণ চিন্তায় আছেন। ওদের
বাড়ি ঝাড়খন্ড রাজ্যে।লোদনা কোলিয়ারীতে
কোয়ার্টারে থাকেন। সময়টা এখন খুব খারাপ।
প্রায় শোনা যাচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরে এখানে ওখানে কত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।কোলিয়ারীতে একটি
স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে সেখানে অনেক কষ্টে সোহেলীকে পৌঁছানোর পর জানতে পারলেন
আজ ডাক্তারবাবু এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগী
দেখেন না। তাঁকে আরোও দুটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে
রোগী দেখার জন্য যেতে হয়।তাই ডাক্তার বাবু
ওখানকার কম্পাউন্ডার হরেন বাবুকে  জেনারেল ম্যানেজারকে দিয়ে একটি অফিস
অর্ডার করিয়েছেন যে তাঁর অনুপস্থিতিতে রোগীর
দেখাশোনা হরেন বাবু করবেন।তাই রোগীদের চিকিৎসা হরেনবাবু করেন তাঁর সাধ্য অনুসারে।
রোগীর ভিড়ও প্রচুর। রোগীদের বসার কোন
সুবন্দোবস্ত না থাকায় সহেলীর মা একটি বেঞ্চের এক কোণায় বসতে বলে নিজে রোগীর
রেজিস্ট্রেশন করতে লাইন দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করে জমা দিলেন। তখন বেলা দশটা বেজে গেছে।দু তিনটি কোলিয়ারীর জন্য একটি
অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দেয়। বেলা এগারটায় সহেলীর নাম ডাকা হলো।তাই রোগীর রোগের
গুরুত্ব অনুসারে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবহার করা হয়।
মাঝে মাঝে নেতারা ও বড় বড় অধিকারীরা
নিজেদের সুবিধার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের দুর্ব্যবহার করে থাকেন।
যাইহোক, সোহেলীকে কম্পাউন্ডার  রোগীদের জন্য ব্যবহৃত বেঞ্চের উপর শুইয়ে
ওর মায়ের কাছে জানতে চান কী কী উপসর্গ
হচ্ছে সেইমতো তার পালস্ রেট, প্রেসার ও
টেম্পারেচার ইত্যাদি চেক করে জানালেন
সহেলী খুব সম্ভব ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে।
আপনাকে আজকের মধ্যেই কেন্দ্রীয় হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য নিয়ে যেতে হবে
এবং আজকের মধ্যেই তা করতে হবে বাড়িতে
রাখা চলবে না। আমাদের কোলিয়ারীর অ্যাম্বুলেন্সে আরও কিছু রোগী ঐ হাসপাতালে
রোগ দেখাতে যাবেন আপনারা সকলে একসাথে চলে যাবেন। বেলা তিনটার সময় গাড়ি ছাড়বে
এই হাসপাতাল থেকে আপনারা সেইমতো তৈরী
হয়ে আসবেন। আমাদের এখানে এই রোগের চিকিৎসা করার মতো কোনো পরিকাঠামো নেই।
এই কার্তিক মাসের শেষাশেষি চারিধারে মশার
প্রাদুর্ভাব খুব বেশি।স্ত্রী এডিস মশার কারণে ডেঙ্গু
রোগের বাড়বাড়ন্ত। জমা জলে এরা ডিম পাড়ে।
ঐ ডিম ফুটে লার্ভা বেরিয়ে আসে এবং বড় হয়ে
মশার রূপ ধারণ করে। এখানে জানিয়ে রাখা দরকার 
এই স্ত্রী মশা দিনের আলোতেই মানুষের রক্ত
খায় এবং রক্ত খাওয়ার পর শরীরে গর্ভধারণ করে এবং ডিম পাড়ে।
সহেলীর বাবা রমেশ বাবু বর্তমানে ট্রেনিং করতে ব্যাঙ্গালোর গেছেন এবং দুসপ্তাহ ওখানে থাকতে হবে।তাই সহেলীর মা ভবতারিণী দেবীকেই সব
সিদ্ধান্ত নিতে হবে।সহেলী অনেকক্ষণ ধরে এক
জায়গায় বসে থাকায় ওর জ্বর একশো থেকে বেড়ে একশো দু ডিগ্ৰি হয়েছে। বাচ্চাদের জন্য এই রোগ বয়স্কদের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকারক।আউটডোরে ওষুধ ইত্যাদি নিয়ে
বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন মা ও মেয়ে।
জানাশোনা একজন ভদ্রলোক তাঁর মোটরসাইকেলে করে ওদের পৌঁছে দিলেন।
নিরুপায় হয়ে মোটরসাইকেলে বসেই যেতে
হলো। এবং ঐ ভদ্রলোক জানালেন আমি
আপনাদের পৌনে তিনটার সময় এসে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত পৌঁছে দেব। ঠিক বিকেলে
তিনটার সময় আরও দুজন রোগীকে নিয়ে
যাত্রা শুরু করলো।প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরে
বড় হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছাল। ভবতারিণী দেবী
কখনও ঐ হাসপাতালে ইতিপূর্বে যাননি তাই
ভীষণ সংকটে পড়লেন। কোথায় যাবেন কী
করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না।মেয়ের
জ্বর উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকল। তিনি মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকতে লাগলেন।"হে প্রভু! তুমি আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো।যার কেউ দেখার নাই তার একমাত্র তুমিই আছো প্রভু। "এভাবেই তিনি সমস্ত ব্যাপারটা ঈশ্বরের উপর ছেড়ে দিলেন।

সমাপ্ত

অন্য পুজো--রুচিরা মুখোপাধ্যায় দাস

অন্য পুজো--
রুচিরা মুখোপাধ্যায় দাস                                    -

              - " থাম্মা, তুমি যে বললে আজকেদ্দিনে ছব্বাইকে নতুন জামা পত্তে হয়! দুগ্গা মাও বুঝি নতুন শায়ী পয়েছে? "
- " হ্যাঁ সোনা। আজ যে মা দুর্গার বোধন! শ্রীরামচন্দ্র আজকের দিনে বানর সেনাদের নতুন বস্ত্র দিয়েছিলেন। সেই থেকেই দুর্গাপুজোয় নতুন বস্ত্রের প্রচলন।"
- " বত্র মানে কি থাম্মা? প্রলোচন না কি অ্যাত্তা বললে ছেছে! ওতার মানে কি?"
- "নাও এবার শুরু হল প্রশ্ন।"
- " ও থাম্মা! ওই দ্যাখো ! ওখানে দুতো দাদা , অ্যাত্তা ছোত্ত বুনু খালি গায়ে, ছুধু প্যান্তু পয়েছে কেন? ওদেত বুঝি গয়ম লাগছে! ওদেত মা দেখো কেমন নোংয়া ছেঁয়া শায়ি পয়েছে! ওদেত নতুন জামা কই ? আমাত্ত কত্ত নতুন জামা হল। মা, বাপিন , তুমি, দাদু , ছোনা কাকি, মামা, পিমনি ছবাই মিলে এই এত্ত জামা দিল।"
- " ওঃ মিতুন একটু চুপ কর। আমায় পুজোটা দেখতে দে সোনা ।"
-" আমাত মাথায় অ্যাত্তা বুদ্ধি এছেচে থাম্মা। দুগ্গা মা, নক্ষ্মী মা , ছরচ্বতি মা, এদেত শায়ীতা খুয়ে নেব ।"
- "ও মিতুন সোনা! এমন অলক্ষুনে কথা মুখে আনে না আজকের দিনে!"
- " তুমি তো আমাত পুও বুদ্ধিতাই ছুনলে না। আগে তো ছোনো। ওদেত শায়িতা খুলে ওই যে নোংয়া ছেঁয়া শায়ি পয়েছে ওই দাদাতার মা , ওই ছোত্ত বুনুতার মা তার পাছে দেখো আরো দুতো মা আছে ওদেত দেব।"
- "ও বৌমা! বকবক করে মাথা খাচ্ছে মিতুন। একটু সামলাও না! পুজোর মন্ত্রগুলো একটাও শুনতে পাচ্ছি না ঠিকমতো । "

ছোট্ট মিতুনের প্রশ্নে জেরবার ঠাকুমার কাছ থেকে ভুলিয়ে নিয়ে আসলো অনসূয়া। ঢাকের আওয়াজ, ধূপের গন্ধে ভরপুর ষষ্ঠী। চারিদিকে আলোর রোশনাই। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। তবুও মিতুনের বড় মন খারাপ!

কর্পোরেট চাকরির জন্য মিতুনের বাবা মা খুবই ব্যস্ত। সকাল থেকে রাত। ঠাকুমা দাদু আর বন্দনা মাসি - যে মিতুনকে দেখাশোনা করে সব সময়, এরাই তার সারাদিনের সঙ্গী। যদিও দিনের শেষে অনসূয়া তার একমাত্র ছোট্ট মেয়ের সমস্ত কথা মন দিয়ে শোনে । যথাসম্ভব তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে। খুব কৌতুহলী মেয়ে মিতুন। সব ব্যাপারে অন্য বাচ্চাদের তুলনায় কৌতুহল তার অনেক বেশি । তাই তার প্রশ্নের জেরবারে পরিবারের সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ক্লান্ত হয় না শুধু অনসূয়া! দিনের শেষে মিতুনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয় । তার সাথে গল্প করে । খেলা করে। তারপর ঘুমোতে যায়। এ তার রোজকার রুটিন। মিতুনও জানে, কেউ তার প্রশ্নের উত্তর ঠিকমতো দিতে না পারলেও মা ঠিক দেবে। তাই সারাদিন ছোট্ট মেয়েটি সূর্য ডোবার অপেক্ষায় থাকে। না, ঘড়ি দেখতে মিতুন পারে না । সে শুধু জানে তার রাতের খাওয়া শেষ হলেই তার মা বাড়িতে ফিরবে। ফ্রেশ হবে। তারপর ঘরে গিয়ে শুয়ে শুয়ে গল্প করবে। তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেবে। কৌতূহল মেটাবে। ষষ্ঠী সপ্তমী এবার শনি রবি। তাই অফিস এমনিতেই ছুটি। মাকে সে সারাদিন পেলেও প্রশ্নগুলো যেন তুলে রাখে রাতের জন্য। যেন সবার আড়ালে মায়ের সাথে নিরিবিলিতে কথা বলতে চায় সে। রাতের বেলার ওইটুকু সময় যেন শুধু দুজনের। শুধু মা মেয়ের । ষষ্ঠীর দিন সারাদিন হৈ হৈ করে, নতুন জামা পড়ে, সবাই মিলে ঠাকুর দেখে, লুচি মিষ্টি খেয়ে খুব আনন্দে কাটলো। এটা মিতুনের চতুর্থ পুজো। পুজোর সময়ই সে জন্মেছিল। তাই সে বছর থেকে বাকি দু বছর পুজোর কিছুই সে বিশেষ বোঝেনি। এবারেই যা পুজোর আনন্দটা একটু বুঝতে শিখেছে।

সপ্তমীর সকাল। পুজোর ঢাকের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো মিতুনের। দেখল মা নতুন শাড়ি পড়ে সুন্দর সেজেছে। কী সুন্দর লাগছে মাকে! ঠিক যেন মা দুর্গা!
- "মা তুমি অফিছ যাচ্ছ? "
- " না সোনা। আজ যে সপ্তমী। তাছাড়া সানডে। অফিস ছুটি। "
- "বাপিনেরও ছুতি ?"
- " হ্যাঁ সোনা। আজ সবাই আমরা একসাথে ঠাকুর দেখব। খুব ঘুরবো। অনেক মজা করব ।তবে তার আগে আমার ছোট্ট একটা কাজ আছে। তাই এখন একটু বেরোবো। তুমি কিন্তু লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে বন্দনা মাসির কাছে খেয়ে নেবে । "
- " তাতায়ী ফিব্বে তো?"
 মিতুনের কপালের চুলগুলো সরিয়ে একটা চুমু দিল অনসূয়া।  
বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এল অনসূয়া। মিতুনকে নতুন জামা পড়িয়ে সাজিয়ে গুজিয়ে নিয়ে বেরোলো। গাড়িতে উঠলো। মিতুনকে পাশের সিটে বসিয়ে ড্রাইভ করে পৌঁছে গেল গন্তব্যে।
- " ঠিক এলকম কাঁচ্চা হাউস আমি ড্রয়িং কয়ী মা। পিপি ছিখিয়েছে। " 
অনুসূয়া হাসলো । বলল 
- "দেখ! কত মানুষ রাস্তায় বসে। রাস্তায় শুয়ে। রাস্তাতেই ওদের ঘর। এদের তো তাও কাঁচ্চা হাউস আছে। ওদের সেটাও নেই! "
গাড়ি থেকে নামলো অনসূয়া। গাড়ির পেছন থেকে নতুন বস্ত্র বার করে তুলে দিল মিতুনের হাতে । নতুন বস্ত্রে মিতুন সাজিয়ে দিল ব্রাত্যদের। সপ্তমীর ঢাকের আওয়াজে নেচে উঠলো কিছু ব্রাত্যের মন! মিতুনের মনেও নতুন সুর! নতুন রঙ!

এ যেন এক অন্য পুজোর গন্ধ!!

                               সমাপ্ত


                                              

বামনডাঙ্গা হল্ট--অর্ঘ্য শুর রায়

বামনডাঙ্গা হল্ট--
অর্ঘ্য শুর রায়

পাট ক্ষেতের বুক চিরে ছোটো হল্ট স্টেশনটা। বামনডাঙ্গা হল্ট।সকাল সন্ধ্যে মিলে পঞ্চাশ জন যাত্রীও ওঠানামা করেনা। তাও সারারাত টিকিট কাউন্টার খুলে রাখতে হয়।গ্রামবাসী আর রাজনীতির দাবি।অগত্যা সারা স্টেশনকে পাহারা দিতে হয় পাঁচজন রেল কর্মচারীকে।স্টেশন মাস্টার,একজন গেটম্যান,একজন ডিউটি করে টিকিট ঘর এ ।আর একজন রেল পুলিশ।দুটো ঘর।একটা টিকিট ঘর,আর একটা ঘর লাগোয়া স্টেশন মাস্টারের ঘর।ঘরের মধ্যেই খাটিয়া,রাতে শোয়ার জন্য। সবাই একসঙ্গে রাত কাটায়।সন্ধ্যে ৮:১৩ এর পর কোনো ট্রেন থামে না ।কিন্তু তাও টিকিট ঘর সারারাত খোলা থাকে।আবার সকাল ৪:১০ এ ডাউন মেইল ট্রেন আছে।স্টেশন থেকে নেমে গ্রামে যাওয়ার দুটো পথ।একটা বেশ কয়েক বছর আগে ঝামা ফেলে রাখা পথ। ওই পথে সারাদিনে চারটা অটো আর একটা বাস চলে।স্টেশন  রাস্তার একপাশে একটা মিষ্টি, একটা ছোটো মুদি দোকান আর একটা ভাতের হোটেল।সন্ধ্যে ছয়টা হলেই বন্ধ।লোকজন বিকালের পর প্রায় কেউ থাকেই না।

আর একটা রাস্তা আছে বটে কিন্তু সেটা প্ল্যাটফর্মের একদম মাথায়।ঢালু মাটির।তিন/চার ফুট চওড়া।রাস্তা না বলে জমির আল বলা ভালো।এটা ধরে জমির মাঝ বরাবর বেশ কিছুটা হেঁটে গ্রামে ওঠা যায়।সময় বেশ কিছুটা কম লাগে এই রাস্তায় গেলে। কাঁচা রাস্তাটা একটা পুরনো বটতলায় গিয়ে মিশেছে। বটতলার পর বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা।পাশেই একটা মজা দীঘি।এই জায়গাটা গ্রামের শ্মশান।একপাশে  চালা ঘরে একটি শ্মশান কালি মূর্তি।বিশেষ বিশেষ দিনে পূজা হয়।এদিক ওদিক ছড়ানো আধপোড়া চেলা কাঠ। মন্দির লাগোয়া ভাঙ্গা ইটের অস্থায়ী পাটাতনে কাঠ দিয়ে মরা পুড়ানোর ব্যাবস্থা আছে।চারিদিকে আধপোড়া পঁচা মাংসের গন্ধ  ম ম করছে।দিনের বেলায় শেয়ালের উৎপাত।সন্ধ্যা হতেই এদের ডাকে গা ছম ছম করে।তাই রাতে গ্রামের লোক কেউ মারা গেলেও শ্মশান পোড়াতে আনেনা। মরা বাসি করে পরেরদিন নিয়ে আসে।এর পাস দিয়ে রাস্তাটা গিয়ে গ্রামের মূল রাস্তায় মিশেছে।সন্ধের পর কেউ এই পথ বিশেষ মাড়ায়না।এখানে অনেকদূর পর্যন্ত কোনো লোকালয় নেই।চারিদিকে শুধুই পাট,ধান আর আখের জমি।একদিকে আবার বেশ কিছুটা অনাবাদি পতিত জমি।এই পতিত জমিতে আগাছায় ভরে গিয়ে ঘন জঙ্গল হয়ে গেছে।

আজ বেশ গুমোট গরম।আকাশটা মেঘলা করে আছে।চাঁদের আলো মেঘে ঢেকে গেছে।একদম হওয়া নেই।স্টেশন, বা গ্রাম কোথাও বৈদ্যুতিক আলো নেই। আজ লোকজন নেই বললেই চলে।হিতেনবাবু এতক্ষন টিকিট কাউন্টার এ ছিল।এরপর প্রায় চার ঘণ্টা পর থ্রু ট্রেন আছে।তাই ভাবলো একটু বড়ো রাস্তার ধারে দোকান বন্ধ হবার আগে একটা মিষ্টি খেয়ে আসবে। কিছুক্ষন পর দোকানগুলো সব বন্ধ হয়ে যাবে।পল্টুর দোকানের মিষ্টিটা বেশ ভালো লাগে।দুটো মিষ্টি নিয়েও আসবে,রাতে রুটির সাথে হয়ে যাবে।ঘরে হ্যাজাক আর হ্যারিকেন জ্বলে সন্ধ্যেবেলায়।স্টেশন থেকে বেরিয়েই ঘুটঘুটে অন্ধকার।লাস্ট অটো চলে গেছে।অন্যান্য দোকান গুলো বন্ধ হচ্ছে।

হিতেনবাবু হাকলেন "পল্টু  দুটো রসগোল্লা দে তো"।

দোকানে টিমটিম করে একটা মোমবাতি জ্বলছে।দোকানের ভিতরে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা।দোকানের সামনে একটা পায়া ভাঙ্গা কাঠের বেঞ্চ।ওটাতেই হীতেনবাবু বসলো।

"এই হতভাগা হ্যারিকেনটা একটু বাড়িয়ে দেয়।লোক তো বুঝবেই না দোকানে আছিস।"

না বাবু,এখনই বন্ধ করবো,তাই আর কি!মিনমিনে স্বরে পল্টু উত্তর দিলো।

তোদের এখানে একশ বছরেও উন্নতি হবেনা।সন্ধ্যে হলেই দোকান বন্ধ করে দিস কেনো?বিরক্ত ভরা গলায় হীতেন বাবু বলে উঠলো।

 একগাল হেসে পল্টু দুটো রসগোল্লা দিলো।

এই যা! মোমবাতিটা পুরো নিভল।চারপাশ ঘন নিকষ কালো।কিছুই দেখা যাচ্ছেনা।অন্য দোকান গুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

"এই পল্টু,পল্টু।কিছু একটা কর।দেখতেই পারছিনা।খাবো কী?" হিতেনবাবু চিৎকার করে উঠলো।

দোকানের ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলোনা।

তাড়াহুড়োয় হিতেনবাবু টর্চ টাও নিয়ে আসেনি।মহা মুস্কিল পড়ে গেলো।

দুসস! নিকুচি করেছে রসগোল্লার।হীতেনবাবু বেরিয়ে পড়লো।এক পা এগোতে গিয়ে অন্ধকারে হোচট খেয়ে পড়লেন।

উফফ! মাথায় খুব লাগলো,গ্রানাইট পাথর মনেহয়।আর কিছু মনে নেই।

অনেক পরে জ্ঞান ফিরলো।এখন হিতেনবাবু টিকিট ঘরে খাটিয়াতে সোয়া।গেটম্যান,পুলিশ,আর স্টেশন মাস্টার ঘিরে দাড়িয়ে চোখে জল দিচ্ছে।মাথায় আর পা এ খুব যন্ত্রণা। ঠোঁটেও খুব লেগেছে।রক্ত জমাট বেঁধে ঠোঁট ফুলে গেছে।

ওরা সবাই মিলে হিতেনবাবুকে ধরাধরি করে নিয়ে এসেছে বলল।মাথাটা ঝিম ঝিম করছে।স্টেশন মাস্টার মনেহয় রেল ডাক্তারকে ফোন করে ওষুধ শুনল।তারপর ঘরের ফার্স্ট এইড থেকে ওষুধ দিয়ে হিতেনবাবুকে চিকিৎসা করলো।

"আজ আর ডিউটি করতে হবেনা।সারারাত রেস্ট নিন।আমি করে দিচ্ছি।কাল সদর থেকে ফার্স্ট ট্রেন এ ডাক্তারবাবু আসবেন আপনাকে দেখতে,আমি কথা বলেছি।"মাস্টারবাবু জোরে বলে উঠলো।

 তারপর চিৎকার করে"এই তোমরা সবাই এখানেই থেকো ওনার সাথে"বলতে বলতে স্টেশন মাস্টার বললো ঘর ছাড়লেন।

সকাল সাতটায় ডাক্তার অবদেশ কুমার এসে গেলো।অনেকদিন ধরেই সদরে পোস্টিং আছেন।আর দুই বছর পর রিটায়ারমেন্ট ।বেশ ভালো ওষুধ দেয়। হিতেনবাবুর মাথা এখনও বেশ ঝিমঝিম করছে।আজ একটু ভালো আছেন।কিন্তু গা হাতের ব্যাথা গুলো খুব আছে।

ডাক্তারবাবু ভালো করে ওনাকে দেখলেন।তারপর সবার সাথে দূরে গিয়ে বেশকিছুক্ষন কথা বললেন ফিসফিস করে।এরপর একগাল হেসে বললেন," কি টিকিটবাবু!!  খুব ভয় পেয়েছিলেন কাল!কিছু ভয় নেই।ভালো হয়ে যাবেন।কিন্তু মশাই! হাথ এ মিষ্টি কেনো? আপনাকে তো মিষ্টি খেতে বারণ করেছিলাম! কাল সারারাত পল্টু পল্টু করে চিৎকার করছিলেন কেনো? পল্টুর মিষ্টি ভুলতে পারছেন না ? তাই বলে শ্মশানে পল্টুকে খুঁজতে যাবেন!"

হিতেনবাবু তিড়িং করে উঠে বসলেন।বলে কি ডাক্তার!শ্মশান!!! সে তো মিষ্টির দোকানে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিল।পল্টুর দোকান তো অনেকদিন বন্ধ হয়ে গেছে।যাচ্ছিল বিদ্যুতের মিষ্টির দোকানে।

পল্টুর বডি তো,হিতেনবাবুই প্রথম রেল লাইনে দেখেছিল গত মাসের আগের মাসে।সুইসাইড কেস ছিল।এই ডাক্তার পোস্টমর্টেম করে।কিন্তু কিভাবে বিদ্যুতের মিষ্টির দোকানের দিকে না গিয়ে  শ্মশানে চলে গেলো,হিতেনবাবু ভাবতেই পারছেনা।

কিন্তু হিতেনবাবুর এখনও স্পষ্ট মনেআছে কাল রাতে পল্টুর সাথে কি কি কথা বলেছে! 

সবকিছু কেমন যেনো তালগোল পাকিয়ে গেলো। হিতেনবাবু তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে ফেলল।

সমাপ্ত


সময়ের গুরুত্ব--অনুভা সরকার

সময়ের গুরুত্ব--
অনুভা সরকার

রমেশ বাবুর দুটো মেয়ে,এক ছেলে l আর স্ত্রীকে নিয়ে মোট পাঁচ জন মানুষ l তাদের জীবন ভীষণ সাদাসিধে তাতেই তার গিন্নি খুশি, খালি একটা দুঃখ মাঝে মধ্যে হয় তার l কোন শখ সে পূরণ করতে পারে না l এমন কি রমেশ বাবু তার হাতে কোন টাকাও দেয় না হাত খরচ বাবদ, যদিও কোন সময় কোন প্রয়োজনে দু চার টাকা ঠাকুরের কলা কেনার জন্য নেয় তাও রমেশ বাবু রেগে যায় l ওনার বক্তব্য এখন সব উড়িয়ে দিলে ছেলে মেয়েকে ভালো করে পড়াবে কি করে..?পরে যদি ছেলে মেয়ে না দেখে তখন কি হবে..? এই ভাবেই দিন যাচ্ছিলো, ছেলে মেয়েদের আক্ষেপ বন্ধু, বান্ধব ভালো জামা কাপড় পরে তাদের জোটে না l তবে রমেশ বাবুর ইনকাম মোটেই খারাপ নয়,তিনি চাকরির টাকা দিয়ে জমি কিনেছেন l গুরু,ছাগল সব আছে তার ঘরে কিন্তু থাকেন গরিবের মত যেন কিছুই নেই ওনার এবং ফ্যামিলিকেও সেই ভাবেই রাখেন l ছেলে মেয়েরা বাবার উপর খুব রাগ অন্য ছেলে মেয়েদের মত কিছুই করতে পারে না  বলে, বাবাকে খালি দোষারোপ করে l পাশের বাড়ির বিশ্বাস বাবু দীঘা ঘুরতে যাবেন, রমেশ বাবুকে বললেন চলেন একসাথে ঘুরে আসি l রমেশ বাবু মুখের উপর বললেন, "নানা এতো টাকা কোথায়..? "বিশ্বাস বাবু বলে,"কি বলেন মশাই..? আমার চেয়ে মায়না বেশী পান l জমি, জায়গা সব করেছেন,বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন তো, কবে আর ঘুরবেন..? তখন ঘুরতে চাইলেও পারবেন না l" কে কার কথা শোনে , ওনার স্ত্রী আড়াল থেকে সব শুনছেন,বিশ্বাস বাবু যাওয়ার পর ওনাকে বলছেন, "আচ্ছা জীবনে তুমি আমায় কি দিয়েছো..? কিছুই তো ভোগ করতে পেলাম না,বয়েস বেড়েই চলেছে l এমন যে নয় তোমার কিছু নেই কিন্তু এতো কিপ্টে মানুষ আমি জীবনেও দেখিনি l সব করেছো সাথ দিয়েছি কিন্তু একটু তো আমার চাহিদা থাকবে.!" রমেশ বাবু হেসে কুটিপাটি বলে, "আরে -আরে গিন্নি তোমার নামে কত লক্ষ টাকার জমি আছে জানো...? আমি মরলে আমার পেনশন আছে l " গিন্নি তখন হাসছে আর বলছে, "আচ্ছা আমি যদি আগে চলে যাই তখন এ সব দিয়ে কি হবে..? তুমি থাকো তোমার টাকা নিয়ে l" বলে গিন্নি রান্না ঘরে চলে গেলো l দুপুরের সবাই খাওয়া সারলো যে যার ঘরে গেলো l রমেশ বাবু নিজের কাজে বের হয়ে গেলো l হঠাৎ ওনার গিন্নির হার্ট এট্যাক করলো, কাউকে সামনে পাইনি l না ফেরার দেশে চলে গেলো l ছেলে মেয়েরা যখন টের পেয়েছে সব শেষ l রমেশ বাবু যখন খবর পেয়ে এলেন হাউ- হাউ করে কাঁদতে লাগলেন আর নিজের কপাল নিজেই চাপড়াতে লাগলেন ভবিষ্যত দেখতে গিয়ে বর্তমানকে বিসর্জন দিয়েছেন ভেবে l আর আফসোস তো আছেই সাথে!

সমাপ্ত

প্রেরণা বড়াল(লিলি)--আমার বোনাই



প্রেরণা বড়াল(লিলি)
--আমার বোনাই 
--------------------
'আরে ওঠো ওঠো তোমরা দুজন আগে ওঠো দেখি।সিট দেখে ভাল করে বসে যাও। আমি জিনিস পত্র  নিয়ে আসছি।চিন্তা করো না" বলল আমার বোনাই। আমারা হাওড়া থেকে গড়িয়া যাব। কারে ঘন্টা খানেক লাগলেও বাসে তো ঘন্টা দেড়েক বা তার বেশিও লাগতে পারে।আর যা ভিড় হয় সে খবর তো সকলের জানা। তাই আমরা ঝটপট উঠে পড়ি এবং ভাল জায়গা দেখে বসে পড়ি। পরে বোনাই ও মালপত্রগুলো ঠিকঠাক মত রেখে এসে বসে যায়। 
কিছুদূর যেতেই আমরা লক্ষ করি এক ব্যক্তি ক্রমাগত আমার বোন কে ফলো করছে।আমরা বড় অস্বস্তি বোধ করি।বোন তো রেগে আগুন হচ্ছিল। শেষমেষ বোনাইকে বললাম। বোনাই শুনে হেসে দিল। বলল এতে রাগের কি আছে।আমার নার্গিস কোন হুর পরি থেকে কিছু কম আছে কি।সত্যিই একথা একদম ঠিক। আমার বোন অপূর্ব সুন্দরী।পাস থেকে হেটে যাওয়া মহিলারাও একবার না তাকিয়ে পারে না।
বোনাই হাসতে হাসতেই বলল নার্গিস সুন্দর করে একটা পান বানাও দেখি। আমার বোন পানের কৌটোটা বের করে পান বানাল আমাকে একটা দিয়ে যখন বোনাইকে দিতে গেল,তখন বোনাই ওই হা করে তাকিয়ে থাকা লোকটিকে ইশারা করে ওকেই দিতে বলল পানের খিলিটা। বোনটা না -নুকার- করার পরে যখন খিলিটা লোকটিকে দিতে গেল তখন উনি না -না করে মানা করতে লাগলেন।ঠিক সেই সময় আমার বোনাই বলল "নিয়ে নিন মিয়া।আমার বেগম যে -কোন -কাজ, যত্ন সহকারেই করে।খেয়ে দেখুন ভাল লাগবে  আপনার।" দেখলাম লোকটির মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কাঁপা হাতে পানের খিলিটা নিয়ে নিল।তার কিছুক্ষণ পর আমরা গড়িয়াতে নেমে যাই। আর তার পর-আমার বোন দুকথা শোনাতে লাগলো বোনাইকে।তখন বোনাই বলল," দূর পাগলি,ওনার অবস্থাটা আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম। জানো, এই পানটির স্বাদ  মিয়া সারা জীবন  মনে রাখবে।" এমনই মানুষ আমার বোনাই। 
সমাপ্ত

তারিণীখুড়ো ও কলম-চরিত মানস ! --শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।



ফ‍্যান ফিকশন--
তারিণীখুড়ো ও কলম-চরিত মানস !
--শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।

আজ দিনটা সকাল থেকেই বেশ মেঘলা করে আছে। কাল সারারাত বৃষ্টি হওয়ায় বেশ শীত শীত ভাবটাও বসার ঘরে রয়ে গেছে। নেহাত আজ রোববার বলে ইস্কুল যাওয়াটা নেই। নইলে এই আবহাওয়াতেও বই পত্র নিয়ে সেজে গুজে ইউনিফর্ম চড়িয়ে ঠিক বের হতে হত।

আমরা বলতে ন্যাপলা, ভুলু, চটপটি আর সুনন্দ  মিলে বাধ‍্য হয়ে চটপটির নতুন  স্ক্র‍্যাবেল গেমটাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করছি আর  ঠিক সেই সময় দেখি তারিণী খুড়োর আবির্ভাব। এই বদ্ধ পরিবেশে যে ব‍্যাপারটা যে একটা ' ইয়ে ' যাকে বলে ' ফেবুউউলাআআস্' সেটা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।
......
হাতের ছাতাটা নামিয়ে রাখতে রাখতে খুড়ো বললেন, " কদিন যা বাদলা! একেবারে ঘরবন্দী হয়ে পড়েছিলাম! আজ বৃষ্টিটা একটু ধরতেই পালিয়ে এসিচি!নে একটা চিনি ছাড়া চা আনতে বল্ তো দেখি! " এই বলে খুড়ো আয়েশ করে তক্তপোশের ওপর বসে চোখ নাচিয়ে  বললেন -
" কি রে!  বুধবার তো ন‍্যাপলার জন্মদিন ছিল! ছোকরা  আমাকে ডেকেছিল বটে কিন্তু একটা জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায়..."!

ওনার   কথাটা শেষ হলনা, তার আগেই ন‍্যাপলা ঘরে ঢুকেই খুড়োকে দেখতে পেয়ে একগাল হাসি হেসে বলল, ' কি খুড়ো! সেদিন এলেন না যে বড়?আপনার  শরীর টরীর ঠিক আছে তো?...এই দেখুন বড়মামা লন্ডন থেকে এই শেফার্স কলমটা পাঠিয়েছেন! তাই ওটাই বুকে এঁটে কদিন হল ঘুরছি! "
......
কলমটা সত‍্যিই দেখতে সুন্দর। সোনালী মেটালের ওপর  দারুণ লতাপাতার কাজ করা আছে। খুড়ো অনেকক্ষণ ধরে দেখে টেখে বলল, "  এসব কলম বেশ  বাহারের বটে! আবার নিবের লেখাও ভাল! তবে  এককালে এসব নিয়ে এই শর্মারও একটা কলেক্টরস্ গুমর ছিল বৈকি! তাই  এটাকে  দেখতে দেখতে  বছর  চল্লিশের আগে একটা ঘটনা মনে পড়ল! অবিশ‍্যি তোরা যদি এখন শুনতে চাস্ তবেই না হয়..!"

খুড়োর এই এক সমস‍্যা। গল্পের লোভ দেখিয়ে সুট্ করে থেমে যান। কাজেই ভেতরবাড়ি থেকে ভজুয়াকে চা এর জন‍্য তাগাদা দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কি বা করণীয় থাকবে!
......
চা এল। খুড়ো চোখ বুজে চুমুক দিয়ে মুচকি হেসে একটা এক্সপোর্ট কোয়ালিটির বিড়ি ধরিয়ে ঠ‍্যাং দোলাতে দোলাতে বললেন, " শেক্সপিয়র সাহেবের কথাটা জানা আছে তো? হোরেশিও'র নাম করে উনি যে'কথাটা বলে গেছেন সেটা আজও একই রকম সত‍্যি। সব ঘটনার প্রচলিত ব‍্যাখ‍্যা আবার হয় না কি! "

ন‍্যাপলা ফোড়ন কাটল,  " আবার সেই ভূত টূত নাকি! এবার তাহলে  বেশ  একটু সিরিয়াস টাইপের হলে জমত না?"

খুড়ো কায়দা করে মুখটা বেঁকিয়ে বললেন, " শোন! আমি মোটেও গপ্পো বানিয়ে বলিনা! হ‍্যাঁ! তবে গপ্পের খাতিরে একটু আধটু যেটা একটু মেশাতে হয়  সেটাকে 'আর্ট' বলে বুঝলি! তাই বলে   তুই ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা বা মেরী শেলীর লেখা  ফ্র‍্যাঙ্কেস্টাইনের গপ্পে কি প্রোবাবিলিটি বা ক‍্যালকুলাস জাতীয় অংকের ফর্মূলা খুঁজবি ? তাছাড়া ওই রকম একটা গপ্পো একটা লিখে দেখাক দেখি আজকালকার কোন বোদ্ধা! হুঁঃ! "
.....
ব‍্যাপারটা বিগড়ে যাচ্ছে দেখে আমরা ওদের কাজিয়া বাধ‍্য হয়ে থামাতেই খুড়োর মুডটা কতকটা চা এর গুণে শুধরে  যেতেই উনি বলা শুরু করলেন।

" তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে থেমেছে। চারদিকে প্রচুর দেশী-বিদেশী ভাল জিনিসের মেলা। সেইসময় আমারও বয়স কম আর তোরা জানিসই যে আমি সর্বদা নতুন কোন ধান্দায় ঘুরতে ভালবাসি, তবে সেটা সেন্ট পার্সেন্ট সৎ পথেই সেটা আর নতুন করে আজ আর বলছি না। তখন আমি কলকাতার নামী নীলাম ঘর 'ম‍্যাকফার্সন ব্রাদার্স এন্ড অকশন' এর দোকানের ম‍্যানেজার। মোটের ওপর চল্লিশ টাকা মাইনে আর তার সাথে পুরনো জিনিসের সাহচর্য  (এটাই অবিশ‍্যি আসল! ) এইসব নিয়ে বেশ আছি।

আমার কাজ ছিল অকশনে তোলবার আগে জিনিসটা যাচাই করা আর মালিকের সাথে দাম নিয়ে বোঝাপড়া করে নেওয়া। সেজন‍্য আমাদের নীলামঘরে না উঠলেও কিছু কিছু পুরনো দিনের জিনিসের একটু আধটু দর্শন  আর সাহচর্য‍্য দুইই পেতাম।
......
এক বুধবারের সন্ধ‍‍্যেবেলা সবে দোকান বন্ধ করছি, এমন সময় এক বৃদ্ধ  রহমৎ খাঁ দোকানে এল। রহমৎ এর আগেও আমাদের অনেক  ভাল ঝাড়লন্ঠন বা পিয়ানো  গছিয়েছে বলে আমি ও  দিনের শেষমুহুর্তে এলেও খুব একটা বিরক্ত হলাম না।

বরং সামনের গুমটি থেকে দু ভাঁড় গরম  চা আনাতেই বুড়ো কেমন ছলছল চোখে চেয়ে রইল। আমি বললাম, ' কি হল ভায়া! শরীর খারাপ নাকি? কিছু বলবে? কোন খবর আছে?'

সে তখন  বলল যে ওর পেটে একটা টিউমার হয়েছে। তাই ডাক্তার বলেছে যে ওর আয়ু আর বেশিদিন নেই! ওদের আবার কোন ছেলেপুলে নেই। তাই বুড়ো মারা গেলে ওর বিবি আতান্তরে পড়বে। তাই আজ ও এসেছে কুড়ি টাকা চাইতে। যে' কদিন ও বাঁচবে তারমধ‍্যে অন্তত একশোটা টাকা ও বেচারা বিবির জন‍্য বাঁচিয়ে রাখতে পারলে মৃত‍্যুর পরে দোজখে গেলেও ইবলিশের হাতে আর  মুগুরের গুঁতো খেতে হবে না।
.......
শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল! হঠাৎ দেখি বুড়ো একটা কাপড়ের পুঁটলি খুলে দারুণ মিনে করা একটা সোনালী রঙের সাবেক ঢং এর  কলম বের করে আমার টেবিলে নিয়ে রাখল। বলল আমি যেন এটার বিনিময়ে যেন ওকে কুড়ি কি পঁচিশটা টাকা যদি ওকে এখন দিই!

কলমটা সত‍্যিই বেশ  বাহারের। গায়ে মালিকের নাম লেখা আছে  হার্পার না হ‍্যারিসন্ কি যেন একটা খোদাই করা ! বোঝাই যায় যে কালের প্রকোপে সেটার আজ এই দশা হলেও ওটা যে জাত কলম সেটা অস্বীকার করবে কার বাপের সাধ‍্যি!

আমি বললুম,  " কিন্তু মিঞা!  আজ তো ক‍্যাশিয়ার ক‍্যাশ  বাক্স গুছিয়ে চলে গেছে! তাছাড়া আমিও দোকানটা বন্ধ করতেই যাচ্ছিলাম। তুমি বরং কাল সকালে এস। তখন দোকানের মালকিন  জেনিফার মেমসাহেবও থাকবেন, তুমি তখন  না হয় দাম দস্তুর যা করবে করে নিও। তাছাড়া এতো  যাকে বলে জাত কলম একেবারে। দাম নেহাত কম পাবে কি?
....
বুড়ো দেখি তাও খানিক  শুকনো মুখে বসে রইল। শেষে আমার হাতটা ধরে বললে, " সাহাব আপনি ইমানদার লোক। এতদিন জিনিস কেনা বেচা করছি আপনার সাথে। আপনি আমার টাকা মারবেন না! তাই এটা আপনি বরং আজ নিজের কাছে রেখে দিন। কাল বা পরশু যেদিন আবার এদিকে আসব হয় সেদিন হয় টাকা বা কলম যেটা ফেরৎ দেবেন নিয়ে নেব। আজ বরং  ঘরে যাই। শরীরটা ভাল ঠেকছে না। এমন দামী জিনিস নিয়ে রাস্তায় ঘোরাটা সুবিধার নয়। তাছাড়া রাস্তায় আমেরিকান টমী'রা আজকাল বড় খানাতল্লাশি করে। আজ তাহলে আসি বাবু!
.....
বুড়ো চলে যাওয়ার পর আমিও দোকানটার ঝাঁপ বন্ধ করে বাড়ি ফিরে রাতে শুয়ে পড়েছি হঠাৎ প্রথমে শুনি একটা খুট্ শব্দ আর তারপর খসখস্ করে কাগজে লেখার শব্দ। চমকে উঠে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিতেই দেখলাম এক অদৃশ‍্য লেখক কোত্থেকে এসে টেবিলের ওপরে রাখা লালচে একটা ডায়েরির পাতায় চোস্ত ইংরেজীতে  কি সব যেন আপন তালে  লিখে চলেছে। যেটা দিয়ে  লিখছে সেটা একেবারে একটা নতুন হার্পার কলম! আর যেখানে লিখছে সে একশো বছরের বেশী পুরনো এক তাড়া কাগজের ওপর যা লালচে রং এর হলেও পুরনো নয়। আমি চমকে উঠে লেখাটা পড়তে শুরু করলাম।দেখি মুক্তোর মত হাতের লেখাটি যে কার সেটা অবিশ‍্যি প্রথমে বুঝিনি। সে যাই হোক! ভাল ভাষার বাঁধুনিতে এখন কলমটা লিখছে যে লেখকটি এই সামারের পর ইন্ডিয়া ছাড়তে চলেছে। প্রবল গরমে আর মশা-মাছি আর জলের কষ্ঠতে সে অতিষ্ঠ। আর তাছাড়া নেটিভদের  নিজেদের নানা টানাপোড়েন আর ষড়যন্ত্র দেখে সে বড় অবাক। কদিন আগেই নন্দকুমার বলে একজন জমিদারকে ফাঁসি চড়িয়েছেন বড়লাট হেস্টিংস।তার হাতের তুরুপের তাসটিকে দিয়েই যে পুরো কাজটা করানো হয়েছে সেটা অনেক পরে হলেও লেখকটি বুঝতে পেরেছে। যে এসব লিখছে সে নিজেও একজন আইনের ছাত্র সেকথাও সে  লিখতে ভোলেনি। সে আরও লিখছে যে পলাশীর যুদ্ধের নাটকটা একেবারে জঘন‍্য রুচির।
ক্ষমতালিপ্সু ক্লাইভ পিছনে থেকে আস্তে আস্তে নিজের কূটনীতিক বুদ্ধি খাটিয়ে এখানে ইংরেজদের আরেকটা কলোনী বানাতে চাইছে। আর যাইহোক এখানে ধান, গম আর নীল, পাট, তুলো নেহাত খারাপ ফলেনা। এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলেতে রানী এলিজাবেথকে যে আগামীদিনের সাম্রাজ্য বাড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছে, বড়লাট হেস্টিংস এখন সেটাকে সফল করতে বদ্ধ পরিকর।
....
আমি তো উত্তেজনায় যাকে বলে পুরো থ মেরে গেছি। এই কলমটা তাহলে কোম্পানির শাসনের গোড়ার দিকে কোন হোমরা চোমরা লোকের? আর তার বিদেহী আত্মা কয়েক শতাব্দীর পর এখনও তাদের করে আসা সব  অন‍্যায়ের কথা তাহলে ভোলেনি?

দেখলাম কলমটা এবারে লিখছে যে মিথ‍্যে তছরুপের অভিযোগ এনে পুরো ব‍্যাপারটা ঘটিয়েছে  লেখকটির মনিব নিজে।

খিদিরপুরের কাছে কুলিবাজার অঞ্চল, অর্থাৎ আজ যেখানে হেস্টিংস নামের এলাকা তখন সেই জায়গা ছিল লোকালয় বর্জিত। সেই নিরুপদ্রুত রাজপথেই সকলের সামনে ব‍্যাপারটা ঘটে। এলাকাটা  সেদিন ছিল লোকে লোকারণ্য। এর আগে এরকম ফাঁসি অনেকেই দেখেনি। যদিও ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে ফাঁসি দেওয়া হত রাস্তার ধারে গাছের উপর থেকে। প্রত্যেকে যাতে অপরাধীর অন্তিম পরিণতি প্রত্যক্ষ করে তাই এই ব্যবস্থা ছিল।

তাই সেদিনও  নন্দকুমারের ফাঁসিও হয়েছিল প্রকাশ্যে। কিন্তু তার জন্য একটা আস্ত কূপ খোঁড়া হয়েছিল। এ যে হাইকোর্টের রায়ে ফাঁসি। সাধারণ জমিদারি মামলা তো নয়। তাই এমন ঘটনার সাক্ষী থাকতে ভিড় ভেঙে পড়েছিল। যদিও সে মামলা শুরু হয়েছিল ১৭৭৫ সালের ১২ মে।

শোনা যায় নিজের সপক্ষে যাবতীয় যুক্তি নন্দকুমার পেশ করেছিলেন। কিন্তু বিচারপতি  তাঁর কোনো কথাতেই কর্ণপাত করেননি। হেস্টিংস  সাহেবের বিশেষ বন্ধু সেই বিচারকটি শুধু ভেবেছিলেন, কী কী প্রকারে নন্দকুমারকে শাস্তি দেওয়া যায়। ফলে অবশেষে ১৬ জুন ফাঁসির রায় বেরোল এবং ৫ আগস্ট ফাঁসির দিন স্থির করা হল। তবে এর পরেও নাকি মামলা গড়িয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। কারণ  ইংল্যান্ডের আইনে জালিয়াতির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও ভারতের হিন্দু আইন বা মুসলমান আইনে তা নয়, বরং তৎকালীন আইন অনুযায়ী কোনো ব্রাহ্মণকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেত না। কিন্তু এইসব প্রশ্ন যখন ওঠে তখন পুনরায় বিচার করার আর কোনো সুযোগই নেই। মহারাজা নন্দকুমার অনেকদিন আগেই ফাঁসির দড়ি গলায় পরে নিয়েছেন।
....
সে সমস্ত কথাই লেখক পরে জেনেছে বলে যেন এতদিন পরেও তার মনিবের আচরণের জন‍্য তার নিজের  অপরাধবোধ যেন আরও বেশী।

যদিও দেশে ফিরবে বলে ভেবেও  সে এক রাত্রে  আর থাকতে না পেরে গলার  নলি কেটে আত্মহত‍্যা করেছে আর তার গডের কাছে প্রার্থনা যে তাকে ও তার মনিবের সঙ্গদোষজনিত পাপের বোঝা থেকে যেন মুক্ত করেন।
....
আমি তো উত্তেজনায় যাকে বলে একদম ইয়ে হয়ে আছি। চোখের সামনে একটু একটু করে যেন বায়োস্কোপের পর্দা উঠে চলেছে। কবেকার সেই কোম্পানি আমলের দলিল, আজ যেন যাদুবলে আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে আমারই চোখের সামনে!

তবে যখন লেখক নিজের নাম সই করলেন তখন আমি তো যাকে বলে একদম স্পেলবাউন্ড! হাতের লেখাটা যে একদম পাকা সেটা আগেই বলেছি, দেখলাম লেখকের নাম এবারে যত্ন নিয়ে লেখা হল, 'রিচার্ডসন ফ্রেডরিক ইমপে'!

ছোকরা স্বয়ং এলিজা ইমপে যিনি এই বিচার প্রহসনের নায়ক তথা বিচারক তারই খুড়তুত ভাই। সে আইন পড়তে এসেছিল কেমব‍্রিজে তারপর দাদা'র সাথে ভারতে চলে আসে আইন ব‍্যবসা জমানোর সাথে স্বয়ং বিচারপতির পার্সনাল এ‍্যসিসটেন্ট হয়ে। তাহলেই বোঝ! সে বিদেহী হয়েও  যা যা এখন লিখে দেখাচ্ছে তা কতটা সত‍্যি!
.....
এবারে দেখলাম কলমটা তার চলা বন্ধ করল আর কাগজের বান্ডিলটা যেন উবে গিয়ে একঝলক ঠান্ডা হাওয়া খানিক এসে আমার পুবের ঘরটাকে যেন কাঁপিয়ে দিয়ে গেল, সাথে বাতিটাও যে নিভে গেল সেটাও আশাকরি তোরা বুঝতে পারছিস!

সারারাত আর  ঘুম এল না। যেন একটা ঘোরের মধ‍্যে থেকে বাকী রাতটা জেগেই কাটিয়ে দিলাম।
.....
পল্টু এবারে খুড়োকে জিজ্ঞাসা করল, " তা খুড়ো! ওই পেন টার কি হল? "

খুড়ো আবার একটা বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে বলল,
" গপ্পের মাঝে অযথা  ফোড়ন কাটা টা যে ক্রিমিনাল অফেন্স সেটাও কি তোরা ভুলে গেছিস? "

শোন তাহলে, " আশ্চর্যের ব‍্যাপার এই যে কলমটা সকাল থেকে বাড়ি থেকে একদম উধাও! অনেক খুঁজেও যখন পেলাম না  তখন ঠিক করলাম বুড়ো এলে ওকে কুড়িটা টাকা আমাকে নিজে থেকেই দিয়ে দিতে হবে। সে গরীব মানুষ, অভাবের তাড়নায়  আমাকে ভরসা করে আছে যে কলমটার বদলে যদি কিছু টাকার বন্দোবস্ত করা যায়!

যাইহোক এরপর দিন সাতেক সেই বুড়ো বা কলমের নো-পাত্তা!

আট দিনের মাথায়  কলুটোলার বোসেদের বাড়ি থেকে একটা হিগিনস্ কোম্পানির গ্র‍্যান্ড পিয়ানো নিয়ে সবে দোকানে ফিরছি দেখি একজন মুসলমাল বুড়ি মহিলা বোরখা-টোরখা গায়ে আমার টেবিলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। বললে, সে আমার নাম তার বরের কাছে শুনেছে আর তার বর এখানে অনেক জিনিস কেনা বেচা আগে করেছে বলে দোকানের নামটাও সে জানে।  আমার কেমন যেন সন্দেহ হতে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'তোমার খসমের কি নাম? "

এর উত্তরে বুড়ি যা বলল সেটা তোদের আরব‍্য উপন‍্যাসের চেয়ে কিছু কম নয়। তার স্বামীর নাম হল রহমৎ। দিন পনের  আগে সে  বুড়ো হার্টফেল করে মারা গেছে আর মারা যাবার আগে বুড়িকে বলে গেছে যে আমাদের দোকানে এসে একটা জিনিস আমার হাতে দিলে কুড়ি কি পঁচিশ টাকার একটা বন্দোবস্ত হবে। আমার তো সেটা শুনে মাথা গুলিয়ে গেল। বুড়ো তো তাহলে দিন সাতেক আগে আমার কাছে এল! সেটা তাহলে  কি করে সম্ভব?
....
এবার যা যা হল সেটা শুনে তোরা ব‍্যোমকে যাবি। দেখি বুড়ি এবারে তার  কম্পিত হাতে একটা মোড়ক খুলে পুরনো অথচ বাহারের একটা হার্পার কোম্পানির একটা ফাউন্টেন পেন আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল।

এতো  অবিকল সেই কলম যেটা মৃত‍্যুর পরে তার পুরনো মালিকের বিদেহী আত্মার মিডিয়ম হয়ে তার জীবনের একটি অনুশোচনার কাহিনি আমার সামনে খসখস করে লিখে দেখিয়ে হঠাৎ করে সে রাত্রে উধাও হয়ে গেছিল। আর সেটা অবিশ‍্যি আমায় এর আগে একবারই  দেখা দিয়েছিল দিন পনের আগে হার্টফেল করে  মৃত এন্টিক সাপ্লায়ার রহমৎ খাঁ এর বিদেহী আত্মার হাত ধরেই।

সমাপ্ত

ক্ষুধা --সুনীল কর্মকার

ক্ষুধা --
সুনীল কর্মকার 

আবার লকডাউন।আবার একুশ দিন সব বন্ধ। পেট তো মানেনা। এলোকেশী র ছটফটানি ধরে যায়।পেটের জ্বালা বড়ো জ্বালা ।এ কিছুই মানেনা।সেই কবে কন্টোলে দু্কেজি চাল দিয়েছিল।ওতে ক'দিন চলবে?গাঁ বেড়িয়ে তবুও চলছিল--সিটাও বন্ধ।ঐ হারামজাদা সিবিকদের দেখলে তার সারা শরীর রিরি করে ওঠে।দু দিন বেরিয়েছিল,মাঝ রাস্তা থেকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।ওদের কী? মাস গেলে মাইনে ঢুকছে।কে খেলো না খেলো ওদের বয়ে ই  গ্যালো।এদিকে বিদেশ বিভুঁয়ে পড়ে আছে ছেলে গুনো।ওর জন্যি চিন্তা।খপর এয়েছে  উদের কাজকাম সব বন্ধ।ট্যাকা পয়সা যা ছেলো বসে খেলে ক'দিন চলবে?ঘরেও ফেরা হছেনা।গাড়িও চলেনা । লোকমুখে শুনছে ওদিকের হাল খুউব খারাব।পটাপট মরছে।কত্তোবার বারণ করেছিল এলোকেশী যেতে , তা কতা শুনলেই না। যতো সব  সাঙ্গাৎ জুটেছে।আমোদ --আমোদ।ইবার ছেলে জব্দ।মাঝেমধ্যে ছেলের খপর পেতে ছোটে গণশার মায়ের কাছে।গণশার মা যখন তখন ফোনে কথা ক ইতে পারে।একসাথে থাকে বলেই রক্ষে।কাল সাঁঝ থেকে মন খারাপ। গনেশ ফোন করেনি ক'দিন।গনশার মায়ের তার মতোই দশা।ছেলেগুলানের কী   দশা কে জানে?
এলোকেশী পেটের জোগাড়ে  চুপচাপ সকালেই  দুকোশ হেঁটে বুধগাঁর দিকে গিয়েছিল।গাঁটা ভালো।চাষীবাসীর গাঁ।সাদা মন।একবেলা ঘুরতে পারলে ঝোলা ভরে যায়।খাও কেনে বসে বসে ক'দিন।ঝোলা নিয়ে পাঁচ বার দম নিতে হয়।আজ গাঁ ঘুরতে বেশ বেলা।চোত--বোশেখের দিন।মাথার উপর সূয্যি তড়বড়িয়ে উঠেছে।গরম বাতাস দেহি টাকে পুড়িন দিছে।দুয়োর লাগা সব ঘরেই।ডাকলে রা দেয়না।কেউ খোলে তো দেখেই মুখ বেঁকিয়ে  দুটো কথা শুনিয়ে ধরাস করে কপাট লাগিয়ে দেয়।এমন তো ছেলোনা কুনোদিন ।কী যে এলো দ্যাশে? রোদে গরমে নাজেহাল হয়ে গাঁ ছেড়ে ধরম তলার বটের ছায়ায় এসে দম নেয় এলোকেশী।কাপড়ে মুখটা মোছে।ঝোলাটা তুলে আন্দাজ মাপে।মুখটায় বিরক্তি।মনে মনেই বলে কুছুই হলোনা।
            বিজলী ও ফিরছে।বদমাসটা লুকিনে এয়েছে। পাশাপাশি ঘর। ছোটবেলায় বেধবা হয়ে গাঁয়েই থাকে । ছেলেপিলে নাই।কমবয়সে ঝাঁকালো দেহিটা নিয়ে কী দেমাক ।গরবে পা পড়তো না । কতো নাগর এলো --গ্যালো।আর ইখন?কেউ পোছেনা ।শ্যাষের দিনের ল্যাগে ভাবতে হয় ।এলোকেশী বিজলীর উদ্দেশ্যে বলে- এই তুর কাজ?আসবি  জানলে খপর খান দিলে আমি তুর ভাত কেড়ে খেতাম?
--লা --লা মাসি তু উল্টো বুঝিস ।আমি ভাবলুম তুর ব্যাটার পয়সা --ডাকলে যদি মানে লাগে।তু তো সবদিন যাসনা  -তাই--এলোকেশী অভিমান নিয়ে বলে --হুঁ তাই তো বলবি।ব্যাটা দ্যাখছিস।উযি কী করচে কুনো খপর রেখেছিস?
--বিজলী মাসীর কাছাকাছি হয়ে বলে --কে কার খপর রাখে বল।আমার যি কী হছে সে আমিই জানি বলে ঘরের দিকে পা ফেলতেই এলোকেশী  বলে "অতো দেমাক দেখাস না লো।আমি যাবো না নিকি?
-- না না তা লয়,শুনলুম গাঁ য়ে কারা চাল ,মুড়ি দিছে।আগে জানলে কে আসতো মরতে?কুছুই তো পেলুম না।তু রয়ে বসে আয় বাপু--আমি চললুম।উরা কী আমার লেগে বসে থাকবে?আমার ই গরজ -- বলে হাঁ টতে লাগে ।খবরটা শুনে ঝোলাটা তুলে এলোকেশীও জীবনের বিকুলিতে বিজলীর পেছন ধরে।ওকে পারবে কেনে।গতর খান এখনো তো তেমনিই।বিজলী কিছুক্ষণেই এলোকেশী র চোখের আড়ালে হারিয়ে গেল।
            রাস্তা যেন আজ শেষ হতে চায়না।পড়ি মরি করে এলোকেশী সোজা না গিয়ে মাঠের আলধরে হাঁ টতে থাকে।সোজা উঠল গিয়ে বাঁধের পাড়ে। বাঁ ধ পেরোলেই গাঁ।গাঁ ঢুকতেই গোঁসাই থান।ওখানে গিয়ে দম নিল। কেেউ নেই।গেরস্তপাড়া ছেড়ে
মেটে পাড়াতে ওঠে।মেম্বর সুদেবের ঘরের দরজায় গিয়ে সুদেবের নাম ধরে ডাকে।ভিতর থেকে জবাব আসে --ঘরে নাই।ওখান থেকে আদিবাসীপাড়ার দিকে এগোতে থাকে।আর হাঁ টতে পারছেনা ।হাপিয়ে উঠেছে ।বিধ্বস্ত শরীর টা আর সাথ দিচ্ছেনা।ক্ষুধা--তৃষ্ণায় একশা হয়ে গেছে।কোথাও কারোর দেখা না পেয়ে ঘরের দিকে ফেরে।হাঁটতে হাঁটতে শরীর টা কেমন করে উঠতেই চোখ দুটিতে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা।  অন্ধকার চারদিক ।সামলাতে নাপেরে বসে পড়ে।বসে থাকতে থাকতে দেহখান গড়িয়ে পড়ে ধূলোয়।মৃত্তিকার পাঁজর ভেদ করেএফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে অগ্মির ফলা ।এলোকেশীর শরীর নিয়ে চলছে রুদ্রের তাণ্ডব নৃত্য।এলোকেশী চেতন জগতের বহু ঊর্ধে চলে গেছে।
      অনেকপরে অপরাহ্নের ম্রিয়মান আলোয় সংজ্ঞাহীন অবস্থায়  অচেনা কাউকে পড়ে থাকতে দেখে কৌতূহলী মানুষের চোখ ঘোরাফেরা করে।আড়ালে আবডালে আলোচনা  চলে।কাছে যাবার সাহস হয়না।জীবিত না মৃত কারো বোঝার ক্ষমতা নেই।হৃদস্পন্দন বোঝা যায়না।উবুড় হয়ে থাকায় চেনা যায়না।এগাঁয়ের না অন্য কোথা থেকে এখানে মরতে এসেছে কে জানে?সবার সামাল সামাল অবস্থা।নানা রকম আলোচনা চলে,করোনার ভয়বহতা  বিষয়ে সর্বশেষ আপডেট,সরকারের সাফল্য ব্যর্থতা বিষয়ে ছোটখাটো বক্তৃতাও শুরু হয়ে গেছে।চীনের বদমাইশি বিষয়ে সবাই একমত হলেও রোগ নিয়ন্ত্রণে ওরা যে কতো তৎপর  আর আমাদের দেশ কতো যে পিছিয়ে তা নিয়ে বিতর্ক চলতে চলতে কখন নীরবে গুটি গুটি পায়ে সন্ধ্যা রাণী নেমে এসেছে চরাচর জুড়ে ।
এলোকেশী তখনো পড়ে।আধ ময়লা তেনা কাপড় আর পাশে পড়ে থাকা ঝোলাটা দেখে অনুমান ভিখারীই হবে।হয়তো এ গাঁয়ে এসেছিল ভিক্ষার সন্ধানে।মৃত না জীবিত কেউ জানল না,জানার আগ্ৰহ দেখালো না।
       কেউ থানাতে খবর দেওয়ায় পুলিশ লাশের সন্ধানে যখন গাঁ য়ে ঢুকল তখন বেশ রাত।বৈশাখের মেঘ ঘন হয়ে আসায় মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক তার সঙ্গে গুরু গুরু গর্জনের সঙ্গে বৃষ্টি ধারায় কিছুটা হলেও শীতল বাতাসে গরমের হাসফাস অবস্থা কেটে যাচ্ছে।গাড়ির শব্দে কৌতূহলী মানুষের  ভিড় বেড়েছে। পুলিশ অতি সতর্কতায় লাশটিকে উঠানোর চেষ্টা করতেই এলোকেশী নড়ে ওঠে।অতি কষ্টে গলা থেকে বেরিয়ে আসে কয়েকটা শব্দ--বাবারা আমাকে দুটো ভাত দাও কেনে।খু --ব ক্ষি--দে --।সারাদি-ন ঘুরে --ঘু-রে আঃ --আঃ দু--টো ভা--ত --
ওদের কাছে ভাত ছিলনা --ছিল  করোনার 
লাশের খবর।

সমাপ্ত
             

বাঞ্ছারাম ও ননীর মা--শংকর ব্রহ্ম



বাঞ্ছারাম ও ননীর মা--
শংকর ব্রহ্ম
-----------------------------------

         সান্ধ্য ভ্রমণ সেরে ক্লান্ত হয়ে চায়ের দোকানে ঢুকে বেঞ্চিতে বসতে বসতে বললাম, "একটু জল খাওয়া তো বাবা বাঞ্ছারাম। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে!"
           বাঞ্ছারাম এক গ্লাস জল এনে দিয়ে বলল, "লিজিয়ে, খাইয়ে! জল খাইয়ে!"
          গ্লাসটা ওর হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে দেখলাম, ওর চোখে মুখি ফিচকে হাসি । দেখে অবাক হয়ে জানতে চাইল, “ব্যপার কি? হাসির কি হল আবার?”
        “বাঙালী লোগ খানা ভি খাতা হ্যায়, পানি ভি খাতা হ্যায়!” বলেই ব্যাটা ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে লাগলো।
          ননীর মা ঠিক ঐ সময় ননীকে কোচিং ক্লাসে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল। আমাকে সে বেশ ভক্তি শ্রদ্ধা করে। তাই, আমার সঙ্গে বাঞ্ছারামের ছ্যবলামী করা দেখে পিত্তি জ্বলে গেল তার। সে বলল, “কেন রে মুখপোড়া! বাঙালীরাই খালি জল খাতা হায়? খোট্টারা নেই খাতা - জল ছাড়াই বেঁচে থাকতা হায়!”
          বাঞ্ছারাম তাকে বুঝিয়ে বলল, “পানি খায়া নেহি যাতা, পিয়া যাতা হ্যায়!”
“অ, তাই বুঝি! তা খাওয়া আর পিয়ার মধ্যে তফাৎ কেয়া হায় ভাই? বুঝাকে বোল দেও!”
        তফাৎ যে আসলে কি সেটা সে বেচারাও জানতো না, তাই উত্তর খুঁজে না পেয়ে কিছুক্ষণ তোতলাতে তোতলাতে শেষে বলল, “খানেকা মৎলব চাবা চাবাকে খানা। পীনে কি চিজ্ চাবায়া নেহি খাতা!”
           ননীর মা তা শুনে বলল, “বুঝলাম। না চিবিয়ে গিলে খাওয়াকে পিনা বলে। তা ভাই ট্যাবলেট, মানে দাওয়াইও তো জলের সাথে গিলকে খাতা হায়। তুমলোগ দাওয়াই খাতা হায় না পিতা হায়?”
           কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে, মাথা মাথা চুলকে বাঞ্ছারাম বলল, “দাওয়াই লেতা হ্যায়!”
           এবার ননীর মায়ের হাসি চাপার পালা। বলল, “বাঃ, প্রথমে খাতা হায়, তারপর পিতা হায়, শেষে কিনা লেতা হায়। হায় হায় হায়, আর কত রঙ্গ দেখায় গা ভাইয়া? ...... আচ্ছা, ঘি, মাখন, এগুলো তো’ চিবাতা নেহি, তাহলে এগুলো কি খাতা না পিতা, নাকি লেতা?”
              বাঞ্ছারাম নার্ভাস হয়ে মনে মনে হিসেব করে বলল, “চিবাতা নেহি! ইসকা মাতলাব পিতা হ্যায়!”
           ননীর মা দু হাতের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, “ তুম ঘণ্টা জানতা হায়, সামঝা? এগুলো সবই খাতা হায়। ঐ গানটা শুনা নেহি , ‘ম্যায় নেহি মাখন খায়ো’। তুম শুনা নেহি এ গানা?”
            বাঞ্ছারাম হার স্বীকার করে নিয়ে ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “জী!”
        “সুতরাং হাম জল চিবাকে খায়গা না গিলকে খায়গা, সেটা হামারা মর্জি। তুমহারা আপত্তি করনে কা কোন হক নেহি হ্যায়, সামঝা!”
           " জী সামঝা " বলে বাঞ্চারাম হার স্বীকার করে নিয়ে, মুখ কালো করে দোকানের ভিতর ঢুকে পড়ল।
             ননীর মাও ননীকে কোচিং ক্লাসে পৌঁছে দিতে চলে গেল।
              আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। জল খেয়ে নিয়ে, এককাপ চায়ের অর্ডার দিলাম।

-----------------------------------------------------

Friday, 4 November 2022

পাকচক্র--জয়িতা ভট্টাচার্য


পা
কচক্র--
জয়িতা ভট্টাচার্য 

পর্ণা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে হাঁটছে।রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাত, মিনিবাস ট্যাক্সি আর উবের,অফিস ফেরত এবং হকার সব পেরিয়ে একমনে হাঁটছে।মাথার মধ্যে তুফান চলছে।কান দিয়ে গরম হল্কা আর মাঝে মাঝেই চোখ মুছে নিচ্ছে সে। তিন রাত ঘুম নেই ,খাওয়া নেই,তবু পুরো দিন অফিসে।ফাইলের পর ফাইল,কর্পোরেট সংস্থার কোম্পানি সেক্রেটারি সে।দম ফেলার সময় নেই।তবু, মাথার ভেতর ঘূণপোকা। মানুষ প্রেমে পড়লে ভিখারি।কোনো ডিগ্রি কোনো স্মার্টনেস কাজে লাগে না।নিজের ওপর ঘৃণা হচ্ছে তার।কেন সে এইভাবে নিজের দিন নষ্ট করছে।অংশু।তার প্রেমিক।গত পাঁচ বছর তার সঙ্গে সম্পর্ক।কখনও আদরে পাগল করে দেয় আর মাঝে মাঝে যেন চিনতেই পারে না।অংশু তার স্বামী নয়।তার স্বামী অমিতেশ।মরে গেছে সে।মরে গেছে কথাটাই যুতসই।বিয়ের তিনবছর পর শরীরি আহ্লাদ ভেঙে খাট থেকে মাটিতে পা রেখে দেখেছিল একটি মাতাল ও চরিত্রহীন লোক।মদ জুয়া রেস হেন নেশা নেই সে করে না।বিবাহসূত্রে পাওয়া বনেদি বংশ ,একটি ছেলে আর কিছু লৌকিকতা ভারবাহী গাধার মতো টেনে নিয়ে চলেছে।হাজার একটা সমস্যার মধ্যে একদিন আচমকাই অংশু জীবনে।তার ছায়া তার আনন্দ। একটু বেশি আদিখ্যেতা করে ফেলেছে পর্ণা।রাগে দুঃখে হতাশায় পর্ণা গাড়িতে ওঠে।অনেক সন্ধ্যা অবধি বসে আছে স্থির হয়ে সে।একদৃষ্টে দেখছে জল।কমপ্লেক্সের পেছনের পুল,বাগান,বড় বড় গাছ।একটা ডাল ভেঙে জলে ফেলে দেয়।আকাশে ফুটফুটে সদ্য মামা হয়ে যাওয়া চাঁদ।পেরেছে পর্ণা।পারতে তাকে হবেই।আর নয় এই অবমাননা। 
জলে ভেসে ভেসে ভাঙা ডাল চলে যাচ্ছে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই।পর্ণা হাল্কা নিঃশ্বাস ফেলে।
লিফ্টের দরজা খুলে ঘরে এসে চালিয়ে দেয় এসিটা।
ফোনের সুরেলা গলা শুনে হাল্কা চালে তুলে নেয় মোবাইল। 
ফোন নয় ওয়াটস্যাপ। 
চা বসাও তাড়াতাড়ি।পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঢুকছি পার্ক করে।
কোথায় যেন কারা ঝাড়লন্ঠন জ্বেলে দিচ্ছে।
দরজা খুলবে না আর পর্ণা অংশুকে কিছুতেই। 
পাখির ডাক,দরজাটা মেলে ধরছে ডানা পর্ণা আনলক করে।

সাবিত্রী দাসের গল্প--যে গল্প লেখা হয়নি ও আহ্বান



সাবিত্রী দাসের গল্প--

যে গল্প লেখা হয়নি ও আহ্বান

    কেয়া বলেছিল সমীর কে-'আমাদের দুজনকে নিয়ে একটা গল্প লেখ না! সে গল্প সমীর আজও লিখতে পারেনি, আসলে  তা লেখার ক্ষমতাই  আজ আর নেই। তখন ছিল,  অসাধারণ লেখার ক্ষমতা ছিল  তার ! সত্যি কথা বলতে কী সেদিন ছিল না সময় ।  সদ্যবিবাহিত সমীর কেয়ার স্পর্শে, গন্ধে, দিশাহারা  দিন কাটাচ্ছিল।দিনরাত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল তাদের । ভেসে যাচ্ছিল ভালোলাগায়,  ভালোবাসায়। ভেবেছিল ভালোবাসার সৌরভটুকু বুকের  মধ্যে  ভরে নেবে, তারপর!  লিখবে তাদের উন্মাদনার গল্প, উদ্দাম ভালোবাসার গল্প।  তা রয়েছে বৈকি! আজও সেই সৌরভ রয়েছে বুকের ভেতর ।  সেই সুখ-স্মৃতি গুলি  মণিমুক্তার  মতো আজও রয়ে গেছে  বুকের ভেতরে, একান্ত  সংগোপনে।
     জীবন  থেকেই  গল্প জন্ম নেয়। জীবনের চলার  পথে  প্রতিটি বাঁকে বাঁকে কতই না রোমাঞ্চকর  অভিজ্ঞতা! তা সেই অভিজ্ঞতা গুলো যে আলোর রোশনাই হয়ে  আলোয় আলোয় ভরিয়ে  দেবে, ভাসিয়ে  নিয়ে  যাবে সুখের  সাগরে  কিংবা  গল্পের  মতো  মিলনাত্মক হয়ে উঠবে তা তো  আর  সবসময় হতে পারে না । হলোও না, চারবছর  সংসার  করার পর কেয়া যখন মেণ্টাল  অ্যাসাইলামে চলে গেল , সেই জীবন  জীবন হয়ে উঠতে  পারলো না, সে গল্পও আর দানা বাঁধতে পারলো না কিছুতেই ! কেমন যেন ছড়িয়ে গেল।নিঃসঙ্গ জীবনে কেয়ার একাকীত্ব টুকুই  কাল হয়েছিল তাদের  জীবনে।সন্তানের জন্যও আকুলতা কম ছিল না! সমীর  কাজের চাপেও বটে কিংবা যে কারণেই হোক, ঠিক সেভাবে কেয়াকে বোঝার চেষ্টাও করেনি কোনোদিন।  একটা ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে দিয়ে পার হচ্ছিল কেয়া। একদিকে একঘেঁয়ে দাম্পত্যের দায়বদ্ধতা, কেয়ার একাকীত্ব আর সমীরের নির্বিকল্প ঔদাসীন্যই কেয়াকে অনিবার্য পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছিল ক্রমশ। তাই কেয়া অ্যাসাইলামে যাওয়ার পর সমীর যখন উপলব্ধি করতে পারলো ছিটকে পড়লো, পড়লো মুখ থুবড়ে । যন্ত্রনা বিদ্ধ পশুর মতো কাতরাতে কাতরাতে সেই রক্তচোঁয়ানো ব্যথা   কোনোমতে বুকে  সয়ে নেওয়া গেলেও লিখতে বসলেই চুইয়ে পড়া রক্তে বার বার খাতার পাতা  গেছে  ভিজে, আর প্রত্যেক বার  নূতন করে  রক্তাক্ত   হয়েছে হৃদয় ! বাষ্পাকুল দুচোখের দৃষ্টি হয়েছে ব্যাহত।  তাই  শত  চেষ্টাতেও সে গল্প  আর কোনোদিনও লেখা হয়ে উঠল না সমীরের।


আহ্বান 
   

তখন ফাল্গুন মাস, বসন্তে ডালে ডালে আগুন জ্বেলে রাঙাপলাশ হাসছিল,শিমূল ফোঁটা ফোঁটা বুকের রক্ত দিয়ে ফুল ফুটিয়েছিল। আমের মঞ্জরী তার গন্ধ মাখিয়ে দিয়েছিল বাতাসে।বাতাস তখন উতলা হয়ে এসে কানে কানে ফিস ফিস করে বলেছিল-"আমি এসে গেছি।" বাতাসের সেই ফিসফিস,ভ্রমরের গুঞ্জরণ, কৃষ্ণচূড়ার  অশ্রুত মর্মরধ্বনি বুকের গভীরে এসে শুনিয়ে গিয়েছিল প্রেমের মর্মগাথা ! অব্যক্ত প্রেমের বার্তা অযুত তরঙ্গে আছড়ে পড়েছিল বুকের ভেতর।  তবুও মন  ছিল নিরাসক্ত ।   বিয়ের পর সংসারে মন বসাতে পারেনি তখনো ।পারবে কী করে! বুকের  ভেতর  সেই আহ্বান! ভোলে কি করে! অস্থির  হয়ে ওঠে  তার মন । কেউ একজন তো একটানা ডেকেই চলেছে সেই কবে থেকে! স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে এসেছে শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে। সমুদ্রের দিকে  চেয়ে চেয়ে দেখে আর মুগ্ধ হয়। বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন বলে ওঠে- 'শেষমেশ এলে তাহলে!'
কিছুতেই বুঝতে পারে না এমন কেন হচ্ছে! 
হোটেলে ফিরে পরিচ্ছন্ন হয়ে জগন্নাথের মন্দিরে ঢুকতেই  অপার্থিব একটা শিহরণ  ছড়িয়ে পড়ে  শরীরে। নির্নিমেষে চেয়ে থাকে জগন্নাথের মূর্তির দিকে। বুকের  ভেতর  হাহাকার জেগে ওঠে  তুলির,  দুচোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। ভিজিয়ে দিয়েছে বুকের আচ্ছাদন। তুলি বোঝে এতদিন কে ডাকছিল তাকে! 
       রাতে স্বপ্ন দেখে আলোয় আলোময় এক দেবতনু,তাকে বলছে- 
 'আজ বসন্তে এসেছো !  অপরিচয়ের আঁধার যে কাটলো না এখনো ,ভোর হবে কি করে!' 
তুলি বলে -'বারে, সব দায় বুঝি আমার !'
সেই দেবতনু বলে-  
'দেখো একদিন   সহস্র  শৃঙ্খল দিয়ে গাঁথা সব প্রাচীর যাবে ভেঙ্গে । রাঙা পলাশের আগুনে ডানায় ভর করে তোমার কাছে ঠিক পৌঁছে যাবে আমার অব্যক্ত প্রেম।সময় হয়ে এসেছে। '
 ঘুম ভেঙেছে তুলির, বড়ো প্রসন্ন মন নিয়ে  ঘুম ভেঙেছে আজ প্রথমবার।

         **********

অখন্ড অবসর গল্প---রানী সেন

অখন্ড অবসর  গল্প---  
রানী সেন 

        নবকমল বাবুর চাকুরী থেকে অবসরের দিন আজ।অফিস অ্যাকাউন্টান্ট ছিলেন তিনি। বিদায় সম্বর্ধনার জন্য অফিস শেষে সবাই জড়ো হয়েছে অফিসের সভা ঘরে। এখন শুধু বড় মেজো সেজো ছোট আধিকারিকদের আসার অপেক্ষা। ওনারা এলেন তারপর সহকর্মীরা একে একে প্রত‍্যেকেই নবকমল বাবু সম্বন্ধে খুব ভালো ভালো প্রশংসনীয় বাক‍্যের বন‍্যা বইয়ে দিতে লাগলো। নবকমল বাবুর মনে মনে খুব হাসি পাচ্ছে যারা এতদিন তার আড়ালে নিন্দা সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিয়েছে তারাই আজ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তবে নিজের কাজের দিক থেকে উনি একশো শতাংশ সৎ, এটুকুই নিজের সান্ত্বনা।কি অফিস কি নিজের জীবন কখনওই তিনি অন‍্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেন নি।অফিস অন্ত প্রাণ ছিল তার। চাকুরী জীবনে তিনি কোনো ছুটি নেননি। এমনকি ছুটির দিনেও অফিসে এসে কাজ করেছেন। সময়ের অভাবে বাড়ির কাজের দিকে কখনোই নজর দেননি এজন্য গৃহিণীর অভিযোগের অন্ত নেই। সম্বর্ধনা শেষে ঢাউস ফুলের তোড়া মিষ্টির বাক্স আরো অনেক কিছু উপহার নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। 
 এখন আর অফিসের তাড়া নেই।আগামীকাল নতুন বছর শুরু। ওনার জীবনটাও আগামীকাল থেকে নতুন ভাবে শুরু হবে। প্রয়োজন মতো গৃহিণীর সাথে কাজে হাত লাগাবেন। এখন থেকে তার অখন্ড অবসর।

কৌস্তুভ দে সরকার--শোভাযাত্রা



শোভাযাত্রা--
কৌস্তুভ দে সরকার

শোভাযাত্রা শুরু। সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম হাতে ডিএসএলআর নিয়ে। আমার কাজ হল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ভিড়ের হুল্লোড়ের নাচগানের ছবি তোলা।
প্রতিটি লরিতে ডিজে । কে কাকে টেক্কা দেবে সাউন্ডে ঝাঁঝে ঝাঁকিয়ে দেওয়ায়। গাড়ি এগোচ্ছে স্লো মোশনে কচ্ছপের মত। 
হাঁটতে অনভ্যস্ত কিছু বাচ্চা ও মহিলারা বসেছে ট্রাকে। সবার পিছনে বেচারি ঢাকি একাই। তার সাথে এদিন সঙ্গ দেবার কেউ নাই।
প্রশেসনকে যে বা যারা গাইড করছে তারা পাজামা পাঞ্জাবিতে বেশ চোস্ত  সেজে কেতাদুরস্ত ভাবের হলেও মুখে একটু অন্যরকম কেমন যেন গন্ধ টের পাওয়া গেল। দু-একজন সামনে এগিয়ে এসে করমর্দন যে করলেন। তারা খুব শৃঙ্খলা পরায়ণ যেন আজকে সবাই । তাদের মধ্যেই পাড়ার সেরা দাদা গোছের একজন প্রায় গৌর নিতাই সেজে নাচের আসরে কেমন টালমাটাল। ভাবটা এরকম যেন তাকে ছাড়া পূজোই হত না এবার। আর পূজোয় এত চাপ পড়েছিল, এত ধকল গেল তার উপর দিয়ে যে সেই লোড সইতে সইতে আজ সে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত একপ্রকার। ওদিকে পাড়ার মহিলারা দেদারে নাচছে, উল্লাল্লা! উল্লাল্লা!
দু-দশ টাকাকে কোনো আমল না দিয়ে আজকে দেদারে মানুষ এটা সেটা কিনে খাচ্ছে। দেখলাম ভিড়ের মধ্য থেকে ম্যাজিক শো-এর মত যেন নাচিয়েদের গায়ে বৃষ্টির জল পড়ল। প্রথমে ভেবেছিলাম পুজোর শান্তিজল বা গঙ্গাজল হবে। তারপর সত্যিটা দেখে চক্ষু চড়কগাছ। নাচের উত্তেজনার মাঝেই কেউ কেউ বোতলে জল খেয়ে সে জলেরই বাকি অংশ ছিটিয়ে দিচ্ছে সবার উপরে। হটি এবং নটিদের বেশ ভালোই লাগছে তাতে। কারোর কপালে ফেট্টি, কারো হাতে রিবন। জিন্সের প্যান্ট, গেঞ্জি, জামার বোতাম কোমরের দিকে খুলে নাভির ওপরে বাঁধা। কিছুটা গরম থেকে স্বস্তি মিলছে।
মোড়ের মাথায় এসে দেখি, মোড়ের ভিড়ে নিজেদেরকে আরো হাইলাইট করে তুলতে গাড়ি প্রায় দাঁড়িয়েই পড়লো কিছু সময়। সেই ফাঁকে ইমিটেশনের মতো কিছু ছেলেমেয়েকে সামান্য জিরিয়ে নিতে দেখা যাচ্ছে। অনেকেরই টলোমলো পা, দেহমনে ব্যালেন্সের ভীষণ অভাব, কপালে দেওয়া দুর্গার সিঁদুরের টিকা গলে ঘামে ভিজে চোখ লাল মুখ লাল। এরই মধ্যে রাস্তার পাশের দোকানের দিকে ছুটে কেউ রাজনিবাস, কেউ খৈনি, বিড়ি, সিগারেট কিনে আনছে ছেলেদের দল। প্যাকেট ছিঁড়তে ছিঁড়তে মুখে পুরে নিতে নিতে শশব্যাস্ততায় ঢুকে যাচ্ছে ভিড়ের ভিতর। তারপর বিলিয়ে দিচ্ছে একে ওকে। ইতিমধ্যেই কোনো কোনো ভিড় থেকে হঠাৎ থানা-পুলিশ গন্ডগোলের খবর ভেসে এল। সবার সেদিকে অবশ্য ভ্রূক্ষেপ নেই, যার যার তারা তারা সামলে নেবে গোছের। আজকের দিনের জন্য উচ্ছাসে ভাটা পড়ুক কেউ একমুহূর্তও চায় না। 
ডিজে একটু থেমে আবার নতুন গান শুরু হতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে নাচছে সবাই । নাচিয়েদের মধ্যে বয়স্ক বুড়োর সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে, তবে বয়স্কা মহিলা কিছু দেখলাম কেমন দমকে দমকে চকিত চমকে নেচে উঠছেন। তারা অনেকেই প্রায় চল্লিশোর্ধ গৃহবধূ হবেন। অনেকে সদ্য বিবাহিত, অনেকে সস্ত্রীক বাচ্চা নিয়েও। অনেকের দুহাত তোলাই থাকছে শূন্যে, অনেকের দুহাত সামনে। যাদের দুহাত পেছনে, তারা মনে হয় বক্ষের ইশারায় সুধী দর্শকদের আকৃষ্ট করছেন। সস্তায় মানে বিনে পয়সায় এত নাচ দেখার আনন্দ নিল ষোলো থেকে সত্তর, আশি থেকে আট সকলেই। নাচের ভেতর স্বপ্ন, নাচের ভেতর উদ্দামতা, যৌবন, জ্বালা, যন্ত্রণা, দুঃখ, কষ্ট, স্নেহ, ভালোবাসা, দয়া, মায়া, ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য, ধর্ম, বিজ্ঞান, সংসার, সভ্যতা, আচার, ব্যবহার সব ঝরে পড়ছে একসাথে। যেন এটাকেই ঐতিহ্য করে নিতে চায় বাঙালি। প্রতিমার ভিড়ের ডিজের নাচের বেশকিছু ছবি ভিডিও তুললাম। তারপর ভিড় এড়িয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াতেই দেখি ছেলে ফোন করে ডাকছে, অনেক রাত হয়েছে, বাড়ি এসো। 
বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকে শোভাযাত্রার ভিডিওগুলি ল্যাপটপে নিয়ে দেখা শুরু করতেই ছেলে এসে বলে, বাবা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? মাকে সঙ্গে না নিয়েই ফিরে এলে? 
অমনি চমকে দু-পা পিছিয়ে বললাম, সেকি, তোর মা তো আমাকে বলে বাইরে যায় নি! আর এখনো ফেরেনি?
তারপর স্ক্রিনে চলে আসা ভিডিওর দিকে তাকিয়ে ছেলে বলে, "ওই তো মা। তুমি তো মায়ের নাচের ছবিও তুলেছ। আচ্ছা বাবা, সত্যি করে বলোতো, কোনো নেশাবস্তু না খেলে মা কি ঐভাবে অতটা রাস্তা নেচে নেচে যেতে পারতো?"
ছেলের প্রশ্ন শুনে আমি থ।

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...