Friday, 4 November 2022

কৌস্তুভ দে সরকার--শোভাযাত্রা



শোভাযাত্রা--
কৌস্তুভ দে সরকার

শোভাযাত্রা শুরু। সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম হাতে ডিএসএলআর নিয়ে। আমার কাজ হল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ভিড়ের হুল্লোড়ের নাচগানের ছবি তোলা।
প্রতিটি লরিতে ডিজে । কে কাকে টেক্কা দেবে সাউন্ডে ঝাঁঝে ঝাঁকিয়ে দেওয়ায়। গাড়ি এগোচ্ছে স্লো মোশনে কচ্ছপের মত। 
হাঁটতে অনভ্যস্ত কিছু বাচ্চা ও মহিলারা বসেছে ট্রাকে। সবার পিছনে বেচারি ঢাকি একাই। তার সাথে এদিন সঙ্গ দেবার কেউ নাই।
প্রশেসনকে যে বা যারা গাইড করছে তারা পাজামা পাঞ্জাবিতে বেশ চোস্ত  সেজে কেতাদুরস্ত ভাবের হলেও মুখে একটু অন্যরকম কেমন যেন গন্ধ টের পাওয়া গেল। দু-একজন সামনে এগিয়ে এসে করমর্দন যে করলেন। তারা খুব শৃঙ্খলা পরায়ণ যেন আজকে সবাই । তাদের মধ্যেই পাড়ার সেরা দাদা গোছের একজন প্রায় গৌর নিতাই সেজে নাচের আসরে কেমন টালমাটাল। ভাবটা এরকম যেন তাকে ছাড়া পূজোই হত না এবার। আর পূজোয় এত চাপ পড়েছিল, এত ধকল গেল তার উপর দিয়ে যে সেই লোড সইতে সইতে আজ সে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত একপ্রকার। ওদিকে পাড়ার মহিলারা দেদারে নাচছে, উল্লাল্লা! উল্লাল্লা!
দু-দশ টাকাকে কোনো আমল না দিয়ে আজকে দেদারে মানুষ এটা সেটা কিনে খাচ্ছে। দেখলাম ভিড়ের মধ্য থেকে ম্যাজিক শো-এর মত যেন নাচিয়েদের গায়ে বৃষ্টির জল পড়ল। প্রথমে ভেবেছিলাম পুজোর শান্তিজল বা গঙ্গাজল হবে। তারপর সত্যিটা দেখে চক্ষু চড়কগাছ। নাচের উত্তেজনার মাঝেই কেউ কেউ বোতলে জল খেয়ে সে জলেরই বাকি অংশ ছিটিয়ে দিচ্ছে সবার উপরে। হটি এবং নটিদের বেশ ভালোই লাগছে তাতে। কারোর কপালে ফেট্টি, কারো হাতে রিবন। জিন্সের প্যান্ট, গেঞ্জি, জামার বোতাম কোমরের দিকে খুলে নাভির ওপরে বাঁধা। কিছুটা গরম থেকে স্বস্তি মিলছে।
মোড়ের মাথায় এসে দেখি, মোড়ের ভিড়ে নিজেদেরকে আরো হাইলাইট করে তুলতে গাড়ি প্রায় দাঁড়িয়েই পড়লো কিছু সময়। সেই ফাঁকে ইমিটেশনের মতো কিছু ছেলেমেয়েকে সামান্য জিরিয়ে নিতে দেখা যাচ্ছে। অনেকেরই টলোমলো পা, দেহমনে ব্যালেন্সের ভীষণ অভাব, কপালে দেওয়া দুর্গার সিঁদুরের টিকা গলে ঘামে ভিজে চোখ লাল মুখ লাল। এরই মধ্যে রাস্তার পাশের দোকানের দিকে ছুটে কেউ রাজনিবাস, কেউ খৈনি, বিড়ি, সিগারেট কিনে আনছে ছেলেদের দল। প্যাকেট ছিঁড়তে ছিঁড়তে মুখে পুরে নিতে নিতে শশব্যাস্ততায় ঢুকে যাচ্ছে ভিড়ের ভিতর। তারপর বিলিয়ে দিচ্ছে একে ওকে। ইতিমধ্যেই কোনো কোনো ভিড় থেকে হঠাৎ থানা-পুলিশ গন্ডগোলের খবর ভেসে এল। সবার সেদিকে অবশ্য ভ্রূক্ষেপ নেই, যার যার তারা তারা সামলে নেবে গোছের। আজকের দিনের জন্য উচ্ছাসে ভাটা পড়ুক কেউ একমুহূর্তও চায় না। 
ডিজে একটু থেমে আবার নতুন গান শুরু হতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে নাচছে সবাই । নাচিয়েদের মধ্যে বয়স্ক বুড়োর সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে, তবে বয়স্কা মহিলা কিছু দেখলাম কেমন দমকে দমকে চকিত চমকে নেচে উঠছেন। তারা অনেকেই প্রায় চল্লিশোর্ধ গৃহবধূ হবেন। অনেকে সদ্য বিবাহিত, অনেকে সস্ত্রীক বাচ্চা নিয়েও। অনেকের দুহাত তোলাই থাকছে শূন্যে, অনেকের দুহাত সামনে। যাদের দুহাত পেছনে, তারা মনে হয় বক্ষের ইশারায় সুধী দর্শকদের আকৃষ্ট করছেন। সস্তায় মানে বিনে পয়সায় এত নাচ দেখার আনন্দ নিল ষোলো থেকে সত্তর, আশি থেকে আট সকলেই। নাচের ভেতর স্বপ্ন, নাচের ভেতর উদ্দামতা, যৌবন, জ্বালা, যন্ত্রণা, দুঃখ, কষ্ট, স্নেহ, ভালোবাসা, দয়া, মায়া, ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য, ধর্ম, বিজ্ঞান, সংসার, সভ্যতা, আচার, ব্যবহার সব ঝরে পড়ছে একসাথে। যেন এটাকেই ঐতিহ্য করে নিতে চায় বাঙালি। প্রতিমার ভিড়ের ডিজের নাচের বেশকিছু ছবি ভিডিও তুললাম। তারপর ভিড় এড়িয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াতেই দেখি ছেলে ফোন করে ডাকছে, অনেক রাত হয়েছে, বাড়ি এসো। 
বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকে শোভাযাত্রার ভিডিওগুলি ল্যাপটপে নিয়ে দেখা শুরু করতেই ছেলে এসে বলে, বাবা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? মাকে সঙ্গে না নিয়েই ফিরে এলে? 
অমনি চমকে দু-পা পিছিয়ে বললাম, সেকি, তোর মা তো আমাকে বলে বাইরে যায় নি! আর এখনো ফেরেনি?
তারপর স্ক্রিনে চলে আসা ভিডিওর দিকে তাকিয়ে ছেলে বলে, "ওই তো মা। তুমি তো মায়ের নাচের ছবিও তুলেছ। আচ্ছা বাবা, সত্যি করে বলোতো, কোনো নেশাবস্তু না খেলে মা কি ঐভাবে অতটা রাস্তা নেচে নেচে যেতে পারতো?"
ছেলের প্রশ্ন শুনে আমি থ।

No comments:

Post a Comment

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...