Showing posts with label সমনা রায়. Show all posts
Showing posts with label সমনা রায়. Show all posts

Wednesday, 2 November 2022

ধোঁয়ার কুণ্ডলী--সুমনা রায়


ধোঁয়ার কুণ্ডলী

সমনা রায়

বৃষ্টি রাতে একা পড়ে থাকা বেঞ্চটায় বসে চোখ থেকে চশমা খুলে নেয় শুভ্র। বাইরে কিছু আর যেন দেখবার নেই। তাকায় নিজেরই দিকে। ঘন তমসায় নিভৃত নির্জন চারিধার। আকাশ আর শুভ্র মুখোমুখি। রবিবাবুর কয়েকটা পংক্তি খুব তাড়া করছে -' সমাজ সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব।' অবাক হয়ে ভাবে কেউ এতটা বদলাতে পারে! ভাবে আজকের দিনটার কথা!শেষরাত থেকেই একটানা বৃষ্টি। অবশ্য অকালবর্ষণ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই কারণ আজ আর অফিস টাইমের ট্রাফিক ঘাঁটার নেই। আজ ট্যুর। কোভিডের জন্য দেড় বছর পর। সাংসারিক অভ্যস্ততা ঝেড়ে আজ থেকে আবার শুরু। কোয়ালিটি কন্ট্রোলের হেড শুভ্র সেন। কাজে যেমন চাপ তেমন নাম। কলিগরা অনেকেই এখন ভালো বন্ধুও। শুভ্র যদিও নিজের ঘরের কথা বা ব্যক্তিগত বিষয়গুলো অফিসে কখনোই আলাপ করতে অভ্যস্ত নয় কিন্তু অন্যরা ওর সাথে সহজেই নিজেদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কথা বলতে পারে। রমাদি, রেহান, শান্তনু, অজয়দারা অনেক ব্যক্তিগত কথা বলেন। পরামর্শও চেয়ে থাকেন। অজয়দা তো বৌদির সাথে সম্পর্কের তিক্ততা নিয়ে মাঝেমাঝেই কথা বলেন। দুঃখ করেন। অনেকের সঙ্গেই এখন যোগাযোগটা কিছুটা পারিবারিকও। শুভ্রর বাড়িতেও এসেছে কেউ কেউ । মিমির সাথেও পরিচয় আছে। মিমির রান্নায় মুগ্ধ হয়েছে অনেকেই। শুভ্রর অফিসে জনপ্রিয়তার আরও একটা কারণ আছে। অফিসে ও অনলাইন শপিংগুরু। আজকাল প্রায় সব কলিগরাই কিছু কিনতে হলে ওকে ডাকে। জামা জুতো নতুন কিছু কেনার পর পরে এসে শুভ্রকেই আগে দেখায়। অজয় বোস তো পরশু নতুন জুতো পরে সবার আগে এসে শুভ্রকে দেখালেন। অবশ্য একদিন শুভ্রই বলেছিলো ব্রাউন জুতোজোড়া কিনতে আর কার্টে রেখেও দিয়েছিল। শুভ্র খুশি হয়। 

ঘুম থেকে উঠেই এমন কান্নাভেজা দিন দেখলে মেজাজটা খারাপ হয়। শুভ্র খুব একটা বৃষ্টিবিলাসী নয়। তবে আজ খুব একটা খারাপ লাগছে না। বিকেল পাঁচটায় দিল্লির ফ্লাইট। একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই মিমি এক মগ চা নিয়ে এলো। বৃষ্টি আর ঠান্ডা হাওয়ায় গরম অনেকটাই কমে গেছে। একসময়ের গণসঙ্গীত শিল্পী গুনগুন করে 'এমন দিনে তারে বলা যায়'। জলখাবারে আজ প্রিয় সব খাবার।

"এতকিছু! কেন করতে গেলে? বাবিও তো নেই বাড়িতে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব করার কী দরকার ছিল? এই বৃষ্টিতে সুমিত্রা আসতে পারেনি নিশ্চয়!"

" কী হলো তাতে!”

"কী দরকার ছিল? তোমার ব্যথাটা আবার বাড়িয়েই ছাড়বে।"

"আরে না না। এইটুকুতেই কিচ্ছু হবে না। রোজ তো সকালে অফিসের তাড়া থাকে। সুমিত্রাও সময়মতো এসে রান্নায় হাত লাগাতে পারে না। আজ কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তাই। খেয়ে বলোনা কেমন হয়েছে?"

"দারুণ!

জানতে তো আমার ট্যুর আছে। কেন বাবিকে ওই বাড়ি যেতে দিলে?

"ইউনিট টেস্টের জন্য অনেক চাপে ছিল কদিন। ওখানে ডাব্বু আর ডোডোদের সাথে একটু মজা করে আসুক। দুটোদিন আমার কেটে যাবে।

শুভ্র মিমির দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের ব্যথাটা চেপে ঘরের সবকাজ সামলাচ্ছে তবু এতটুকু বিরক্তি নেই চোখে মুখে!

“কী এতো ভাবছো? শোনো না! তুমি তো আগে দিল্লি গেলে মাঝে মাঝে রিমিটার সাথে দেখা করে আসতে। এখন ছেড়েই দিয়েছো। এমন স্মার্ট আর সুন্দরী শ্যালিকা পেলে লোকে ঘন ঘন ট্যুর চেয়ে নিতো আর তুমি?"

খুব জোরে বিষম খায় শুভ্র। মিমি ওকে কথা বলতে বারণ করে। উঠে এসে পিঠ বুলিয়ে দেয়। অবশ্য মিমি না বললেও শুভ্র এইমুহূর্তে কোন কথাই বলতে পারতো না। রিমির প্রসঙ্গটা এই চারবছর ধরে এড়িয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করে যাচ্ছে। নিজেকে তিনজনের কাছেই অপরাধী লাগে সেই রাতের কথা মনে পড়লে। নিজের কাছে সবচেয়ে বেশি।

রিমির বর রাজর্ষি ওকে কত ভালোবাসে! ডাকে বারবার। শুভ্রই এড়িয়ে যায়। শুভ্র আজও বুঝতে পারে না কী করে সেদিন এমন হলো। রিমির ওখানে গিয়ে ফ্রেশ হলো একটু গল্প করলো। ভিডিওকলে মিমির সাথে কথাও বললো। রাজর্ষির সাথে ফোনে কথা হলো। ওর অফিসের সার্ভার  ক্রাশ করেছে। ও কিছুতেই রাতে আর বাড়ি ফিরতে পারছে না জানালো। তারপর কাবাব আর মোয়িতো খেলো। এইটুকু পরিষ্কার মনে আছে। তারপরের সবটুকু ঘোলাটে। কতোটা কাছে গিয়েছিলো? ও নিজের ইচ্ছায় এগিয়ে গেলো! এমন তো হবার কথা নয়। জীবনে কখনও তো এমন হয়নি। মিমি ছাড়া কোথাও কোনোদিন ও এমন সুখের কাছে যেতে চায়নি! আর চাইবেই বা কেন! মিমিতেই তো খুঁজে নিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সুখের আশ্রয়। তবে কি রিমি ওকে ছলে কৌশলে এমন করলো! কিন্তু কেন করবে! ও তো নিজেই বললো রাজর্ষিকে নিয়ে খুব সুখী। এই সুখের ইচ্ছাগুলো কি তবে সুযোগ পেলেই আগাছার মতো বেড়ে ওঠে এদিক ওদিক? এই জট শুভ্র আজও খুলতে পারে না।

জলখাবার খেয়ে ঘরে চলে যায়। প্যাকিং একটু বাকি। মিমির সব মেডিক্যাল রিপোর্টস গুছিয়ে নিতে হবে। স্কুলের বন্ধু তাপস তার সিনিয়র এক ডাক্তারবন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। দিল্লির। খুব বড় ডাক্তার। এমনিতে এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া সোজা নয়। কিন্তু তাপসের জন্য পেয়ে গেলো। আজ রাতেই ওখানে যাবে। উনি সব দেখে বলবেন মিমির হাঁটু রিপ্লেসমেন্ট এখনই করাতে হবে কি না। কোথায় কীভাবে করা যায় এসব পরামর্শ। মিমির ব্যথা শুভ্রকে অপরাধী করে তোলে। বাবি আর শুভ্রর অসুবিধে হবে আর অনেক টাকা খরচ হয়ে যাবে হয়তো এসব ভেবে ভেবেই মিমি অপারেশনের প্রসঙ্গটাই এড়িয়ে যায়। শুভ্র আর শুনবে না এইসব। এয়ারপোর্ট থেকেই সোজা চলে যাবে। সব ফাইনাল করে তবেই মিমিকে জানাবে।

তৈরি হয়ে উবার ডেকে নিল। মিমিকে একা রেখে যেতে খারাপ লাগছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন মায়া লাগছে। এরকম ওয়েদারে টিভিও চলে না প্রায়ই। পাওয়ারও যদি চলে যায়! ইনভার্টারের সীমিত আলোর ভরসায় একা ঘরে থাকবে। মিমিকে জড়িয়ে ধরে আলতো করে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে টেনে নেয় ট্রলিটা।

এয়ারপোর্ট পৌঁছেই দেখলো ফ্লাইট এক ঘন্টা লেট। মেজাজ একটু খারাপ হলো। এই ব্যাজার মুখ নিয়েই ঝটপট সেরে নিল সিকিউরিটি। বার বার ঘড়ি দেখছে। একটা কফি নিয়ে আসার সময় দেখলো আরও এক ঘন্টা লেট। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো দিল্লির আবহাওয়ার জন্য এই দেরি। রাত সাড়ে নয়। জানতে পারলো ফ্লাইট ক্যান্সেল। মোবাইলও চার্জ করা হলো না। সুইচ অফ করে দিল। বিরক্তি, বিগড়ানো মেজাজ আর মনখারাপ নিয়ে বাইরে এলো। আবার একটা উবারে চাপলো শুভ্র। টের পেল মেজাজ খারাপটা কমেছে একটু। ঘরে ফেরাগুলো বুঝি সব মনখারাপকে এভাবেই হারিয়ে দিয়ে যায়। দরজার কাছে এসে বেলের দিকে আঙুল তুলতেই চোখ পড়ে তার পাশটায়। কী দেখা যাচ্ছে ! চকচকে একজোড়া ব্রাউন সু। খুব চেনা। হাত থেকে ট্রলিটা যেন আলগা হয়ে গেলো। পা দুটো অবশ লাগছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। ডোরবেল চাপতে পারলো না। যেন নিজের মধ্যেই তলিয়ে যাচ্ছে। সোজা গেটের কাছে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালো। ধোঁয়ার কুণ্ডলীগুলোকে বৃষ্টি কেমন করে ভেঙে চুরমার করছে শুভ্র তা দেখছে মগ্ন হয়ে। গেটের কাছের জগিংপা র্কটায় গিয়ে বসলো।

রাত প্রায় দেড়টা। চেনা চেনা একটা গাড়ি বেরিয়ে গেলো। দ্বিধাজড়ানো পায়ে উঠে আসে শুভ্র। কোনোদিকে না তাকিয়ে ডোরবেল চেপে দিলো শুভ্রকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মিমি শুরু করে - "ফ্লাইট ক্যানসেল? মোবাইল সুইচ অফ কেন?”

শুভ্র কিছু বলার আগেই পেছন থেকে পিসতুতো ভাই অর্ক আসে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে। হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ লাগানো। শুভ্র আবার দরজা খুলে দেখে জুতোজোড়া এখনও আছে!

“তুই কী রে দাভাই? আমরা ফোন করে করে হয়রান।“

অর্ক আরো কী কী বলে যাচ্ছে শুভ্র শুনতেই পাচ্ছে না। শুধু এটুকু শুনলো – “জানিস তো মাকে এখন কমই মনে পড়ে। রাঙাবউদি আবার মনে করালো।"

শুভ্র মিমির মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে শুধু ...

সমাপ্ত

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...