ক্ষুধা --
সুনীল কর্মকার
আবার লকডাউন।আবার একুশ দিন সব বন্ধ। পেট তো মানেনা। এলোকেশী র ছটফটানি ধরে যায়।পেটের জ্বালা বড়ো জ্বালা ।এ কিছুই মানেনা।সেই কবে কন্টোলে দু্কেজি চাল দিয়েছিল।ওতে ক'দিন চলবে?গাঁ বেড়িয়ে তবুও চলছিল--সিটাও বন্ধ।ঐ হারামজাদা সিবিকদের দেখলে তার সারা শরীর রিরি করে ওঠে।দু দিন বেরিয়েছিল,মাঝ রাস্তা থেকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।ওদের কী? মাস গেলে মাইনে ঢুকছে।কে খেলো না খেলো ওদের বয়ে ই গ্যালো।এদিকে বিদেশ বিভুঁয়ে পড়ে আছে ছেলে গুনো।ওর জন্যি চিন্তা।খপর এয়েছে উদের কাজকাম সব বন্ধ।ট্যাকা পয়সা যা ছেলো বসে খেলে ক'দিন চলবে?ঘরেও ফেরা হছেনা।গাড়িও চলেনা । লোকমুখে শুনছে ওদিকের হাল খুউব খারাব।পটাপট মরছে।কত্তোবার বারণ করেছিল এলোকেশী যেতে , তা কতা শুনলেই না। যতো সব সাঙ্গাৎ জুটেছে।আমোদ --আমোদ।ইবার ছেলে জব্দ।মাঝেমধ্যে ছেলের খপর পেতে ছোটে গণশার মায়ের কাছে।গণশার মা যখন তখন ফোনে কথা ক ইতে পারে।একসাথে থাকে বলেই রক্ষে।কাল সাঁঝ থেকে মন খারাপ। গনেশ ফোন করেনি ক'দিন।গনশার মায়ের তার মতোই দশা।ছেলেগুলানের কী দশা কে জানে?
এলোকেশী পেটের জোগাড়ে চুপচাপ সকালেই দুকোশ হেঁটে বুধগাঁর দিকে গিয়েছিল।গাঁটা ভালো।চাষীবাসীর গাঁ।সাদা মন।একবেলা ঘুরতে পারলে ঝোলা ভরে যায়।খাও কেনে বসে বসে ক'দিন।ঝোলা নিয়ে পাঁচ বার দম নিতে হয়।আজ গাঁ ঘুরতে বেশ বেলা।চোত--বোশেখের দিন।মাথার উপর সূয্যি তড়বড়িয়ে উঠেছে।গরম বাতাস দেহি টাকে পুড়িন দিছে।দুয়োর লাগা সব ঘরেই।ডাকলে রা দেয়না।কেউ খোলে তো দেখেই মুখ বেঁকিয়ে দুটো কথা শুনিয়ে ধরাস করে কপাট লাগিয়ে দেয়।এমন তো ছেলোনা কুনোদিন ।কী যে এলো দ্যাশে? রোদে গরমে নাজেহাল হয়ে গাঁ ছেড়ে ধরম তলার বটের ছায়ায় এসে দম নেয় এলোকেশী।কাপড়ে মুখটা মোছে।ঝোলাটা তুলে আন্দাজ মাপে।মুখটায় বিরক্তি।মনে মনেই বলে কুছুই হলোনা।
বিজলী ও ফিরছে।বদমাসটা লুকিনে এয়েছে। পাশাপাশি ঘর। ছোটবেলায় বেধবা হয়ে গাঁয়েই থাকে । ছেলেপিলে নাই।কমবয়সে ঝাঁকালো দেহিটা নিয়ে কী দেমাক ।গরবে পা পড়তো না । কতো নাগর এলো --গ্যালো।আর ইখন?কেউ পোছেনা ।শ্যাষের দিনের ল্যাগে ভাবতে হয় ।এলোকেশী বিজলীর উদ্দেশ্যে বলে- এই তুর কাজ?আসবি জানলে খপর খান দিলে আমি তুর ভাত কেড়ে খেতাম?
--লা --লা মাসি তু উল্টো বুঝিস ।আমি ভাবলুম তুর ব্যাটার পয়সা --ডাকলে যদি মানে লাগে।তু তো সবদিন যাসনা -তাই--এলোকেশী অভিমান নিয়ে বলে --হুঁ তাই তো বলবি।ব্যাটা দ্যাখছিস।উযি কী করচে কুনো খপর রেখেছিস?
--বিজলী মাসীর কাছাকাছি হয়ে বলে --কে কার খপর রাখে বল।আমার যি কী হছে সে আমিই জানি বলে ঘরের দিকে পা ফেলতেই এলোকেশী বলে "অতো দেমাক দেখাস না লো।আমি যাবো না নিকি?
-- না না তা লয়,শুনলুম গাঁ য়ে কারা চাল ,মুড়ি দিছে।আগে জানলে কে আসতো মরতে?কুছুই তো পেলুম না।তু রয়ে বসে আয় বাপু--আমি চললুম।উরা কী আমার লেগে বসে থাকবে?আমার ই গরজ -- বলে হাঁ টতে লাগে ।খবরটা শুনে ঝোলাটা তুলে এলোকেশীও জীবনের বিকুলিতে বিজলীর পেছন ধরে।ওকে পারবে কেনে।গতর খান এখনো তো তেমনিই।বিজলী কিছুক্ষণেই এলোকেশী র চোখের আড়ালে হারিয়ে গেল।
রাস্তা যেন আজ শেষ হতে চায়না।পড়ি মরি করে এলোকেশী সোজা না গিয়ে মাঠের আলধরে হাঁ টতে থাকে।সোজা উঠল গিয়ে বাঁধের পাড়ে। বাঁ ধ পেরোলেই গাঁ।গাঁ ঢুকতেই গোঁসাই থান।ওখানে গিয়ে দম নিল। কেেউ নেই।গেরস্তপাড়া ছেড়ে
মেটে পাড়াতে ওঠে।মেম্বর সুদেবের ঘরের দরজায় গিয়ে সুদেবের নাম ধরে ডাকে।ভিতর থেকে জবাব আসে --ঘরে নাই।ওখান থেকে আদিবাসীপাড়ার দিকে এগোতে থাকে।আর হাঁ টতে পারছেনা ।হাপিয়ে উঠেছে ।বিধ্বস্ত শরীর টা আর সাথ দিচ্ছেনা।ক্ষুধা--তৃষ্ণায় একশা হয়ে গেছে।কোথাও কারোর দেখা না পেয়ে ঘরের দিকে ফেরে।হাঁটতে হাঁটতে শরীর টা কেমন করে উঠতেই চোখ দুটিতে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা। অন্ধকার চারদিক ।সামলাতে নাপেরে বসে পড়ে।বসে থাকতে থাকতে দেহখান গড়িয়ে পড়ে ধূলোয়।মৃত্তিকার পাঁজর ভেদ করেএফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে অগ্মির ফলা ।এলোকেশীর শরীর নিয়ে চলছে রুদ্রের তাণ্ডব নৃত্য।এলোকেশী চেতন জগতের বহু ঊর্ধে চলে গেছে।
অনেকপরে অপরাহ্নের ম্রিয়মান আলোয় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় অচেনা কাউকে পড়ে থাকতে দেখে কৌতূহলী মানুষের চোখ ঘোরাফেরা করে।আড়ালে আবডালে আলোচনা চলে।কাছে যাবার সাহস হয়না।জীবিত না মৃত কারো বোঝার ক্ষমতা নেই।হৃদস্পন্দন বোঝা যায়না।উবুড় হয়ে থাকায় চেনা যায়না।এগাঁয়ের না অন্য কোথা থেকে এখানে মরতে এসেছে কে জানে?সবার সামাল সামাল অবস্থা।নানা রকম আলোচনা চলে,করোনার ভয়বহতা বিষয়ে সর্বশেষ আপডেট,সরকারের সাফল্য ব্যর্থতা বিষয়ে ছোটখাটো বক্তৃতাও শুরু হয়ে গেছে।চীনের বদমাইশি বিষয়ে সবাই একমত হলেও রোগ নিয়ন্ত্রণে ওরা যে কতো তৎপর আর আমাদের দেশ কতো যে পিছিয়ে তা নিয়ে বিতর্ক চলতে চলতে কখন নীরবে গুটি গুটি পায়ে সন্ধ্যা রাণী নেমে এসেছে চরাচর জুড়ে ।
এলোকেশী তখনো পড়ে।আধ ময়লা তেনা কাপড় আর পাশে পড়ে থাকা ঝোলাটা দেখে অনুমান ভিখারীই হবে।হয়তো এ গাঁয়ে এসেছিল ভিক্ষার সন্ধানে।মৃত না জীবিত কেউ জানল না,জানার আগ্ৰহ দেখালো না।
কেউ থানাতে খবর দেওয়ায় পুলিশ লাশের সন্ধানে যখন গাঁ য়ে ঢুকল তখন বেশ রাত।বৈশাখের মেঘ ঘন হয়ে আসায় মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক তার সঙ্গে গুরু গুরু গর্জনের সঙ্গে বৃষ্টি ধারায় কিছুটা হলেও শীতল বাতাসে গরমের হাসফাস অবস্থা কেটে যাচ্ছে।গাড়ির শব্দে কৌতূহলী মানুষের ভিড় বেড়েছে। পুলিশ অতি সতর্কতায় লাশটিকে উঠানোর চেষ্টা করতেই এলোকেশী নড়ে ওঠে।অতি কষ্টে গলা থেকে বেরিয়ে আসে কয়েকটা শব্দ--বাবারা আমাকে দুটো ভাত দাও কেনে।খু --ব ক্ষি--দে --।সারাদি-ন ঘুরে --ঘু-রে আঃ --আঃ দু--টো ভা--ত --
ওদের কাছে ভাত ছিলনা --ছিল করোনার
লাশের খবর।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment