স্মৃতি শেখর মিত্রর গল্প --
ঈশ্বর ভরসা
মেয়েটার দুদিন ধরে খুব জ্বর আসছে। সহেলীর
মা সহেলীর জন্য ভীষণ চিন্তায় আছেন। ওদের
বাড়ি ঝাড়খন্ড রাজ্যে।লোদনা কোলিয়ারীতে
কোয়ার্টারে থাকেন। সময়টা এখন খুব খারাপ।
প্রায় শোনা যাচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরে এখানে ওখানে কত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।কোলিয়ারীতে একটি
স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে সেখানে অনেক কষ্টে সোহেলীকে পৌঁছানোর পর জানতে পারলেন
আজ ডাক্তারবাবু এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগী
দেখেন না। তাঁকে আরোও দুটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে
রোগী দেখার জন্য যেতে হয়।তাই ডাক্তার বাবু
ওখানকার কম্পাউন্ডার হরেন বাবুকে জেনারেল ম্যানেজারকে দিয়ে একটি অফিস
অর্ডার করিয়েছেন যে তাঁর অনুপস্থিতিতে রোগীর
দেখাশোনা হরেন বাবু করবেন।তাই রোগীদের চিকিৎসা হরেনবাবু করেন তাঁর সাধ্য অনুসারে।
রোগীর ভিড়ও প্রচুর। রোগীদের বসার কোন
সুবন্দোবস্ত না থাকায় সহেলীর মা একটি বেঞ্চের এক কোণায় বসতে বলে নিজে রোগীর
রেজিস্ট্রেশন করতে লাইন দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করে জমা দিলেন। তখন বেলা দশটা বেজে গেছে।দু তিনটি কোলিয়ারীর জন্য একটি
অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দেয়। বেলা এগারটায় সহেলীর নাম ডাকা হলো।তাই রোগীর রোগের
গুরুত্ব অনুসারে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবহার করা হয়।
মাঝে মাঝে নেতারা ও বড় বড় অধিকারীরা
নিজেদের সুবিধার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের দুর্ব্যবহার করে থাকেন।
যাইহোক, সোহেলীকে কম্পাউন্ডার রোগীদের জন্য ব্যবহৃত বেঞ্চের উপর শুইয়ে
ওর মায়ের কাছে জানতে চান কী কী উপসর্গ
হচ্ছে সেইমতো তার পালস্ রেট, প্রেসার ও
টেম্পারেচার ইত্যাদি চেক করে জানালেন
সহেলী খুব সম্ভব ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে।
আপনাকে আজকের মধ্যেই কেন্দ্রীয় হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য নিয়ে যেতে হবে
এবং আজকের মধ্যেই তা করতে হবে বাড়িতে
রাখা চলবে না। আমাদের কোলিয়ারীর অ্যাম্বুলেন্সে আরও কিছু রোগী ঐ হাসপাতালে
রোগ দেখাতে যাবেন আপনারা সকলে একসাথে চলে যাবেন। বেলা তিনটার সময় গাড়ি ছাড়বে
এই হাসপাতাল থেকে আপনারা সেইমতো তৈরী
হয়ে আসবেন। আমাদের এখানে এই রোগের চিকিৎসা করার মতো কোনো পরিকাঠামো নেই।
এই কার্তিক মাসের শেষাশেষি চারিধারে মশার
প্রাদুর্ভাব খুব বেশি।স্ত্রী এডিস মশার কারণে ডেঙ্গু
রোগের বাড়বাড়ন্ত। জমা জলে এরা ডিম পাড়ে।
ঐ ডিম ফুটে লার্ভা বেরিয়ে আসে এবং বড় হয়ে
মশার রূপ ধারণ করে। এখানে জানিয়ে রাখা দরকার
এই স্ত্রী মশা দিনের আলোতেই মানুষের রক্ত
খায় এবং রক্ত খাওয়ার পর শরীরে গর্ভধারণ করে এবং ডিম পাড়ে।
সহেলীর বাবা রমেশ বাবু বর্তমানে ট্রেনিং করতে ব্যাঙ্গালোর গেছেন এবং দুসপ্তাহ ওখানে থাকতে হবে।তাই সহেলীর মা ভবতারিণী দেবীকেই সব
সিদ্ধান্ত নিতে হবে।সহেলী অনেকক্ষণ ধরে এক
জায়গায় বসে থাকায় ওর জ্বর একশো থেকে বেড়ে একশো দু ডিগ্ৰি হয়েছে। বাচ্চাদের জন্য এই রোগ বয়স্কদের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকারক।আউটডোরে ওষুধ ইত্যাদি নিয়ে
বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন মা ও মেয়ে।
জানাশোনা একজন ভদ্রলোক তাঁর মোটরসাইকেলে করে ওদের পৌঁছে দিলেন।
নিরুপায় হয়ে মোটরসাইকেলে বসেই যেতে
হলো। এবং ঐ ভদ্রলোক জানালেন আমি
আপনাদের পৌনে তিনটার সময় এসে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত পৌঁছে দেব। ঠিক বিকেলে
তিনটার সময় আরও দুজন রোগীকে নিয়ে
যাত্রা শুরু করলো।প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরে
বড় হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছাল। ভবতারিণী দেবী
কখনও ঐ হাসপাতালে ইতিপূর্বে যাননি তাই
ভীষণ সংকটে পড়লেন। কোথায় যাবেন কী
করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না।মেয়ের
জ্বর উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকল। তিনি মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকতে লাগলেন।"হে প্রভু! তুমি আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো।যার কেউ দেখার নাই তার একমাত্র তুমিই আছো প্রভু। "এভাবেই তিনি সমস্ত ব্যাপারটা ঈশ্বরের উপর ছেড়ে দিলেন।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment