রাজু --
স্বপ্না মজুমদার
রাজু আর ললিত ছোটোবেলার দুই ঘনিষ্ট বন্ধু।
রাজু কৃষক পরিবারের ছেলে। ললিত গোয়াল পরিবারের ছেলে। ছোটো বেলায় গ্ৰামের পাঠশালায় দুজনে একসাথে পড়তো। একটু বড়ো হয়ে গাঁয়ের ফ্রি স্কুলে পড়তে যেতো।তবে বড়ো হওয়ার সাথে সাথে বাবার হাতে হাতে দুই বন্ধুকেই কাজ করতে হতো। গরীব ঘরের ছেলে, কাজ না করলে তো চলবে না।
তবে রাজুর পড়াশোনায় খুব আগ্ৰহ ছিল। সে কাজের ফাঁকে পড়তেই বেশি ভালোবাসতো। ললিতের পড়ার প্রতি অতো আগ্ৰহ ছিল না। তাতে ওর বাবা বেশ খুশিই ছিলেন। গোয়ালে অতো গোরুর কাজ ও লোকের বাড়ি দুধ দেওয়ার কাজে ললিত বেশ সাহায্য করতে ভালোবাসতো। পড়াশোনা করতে ললিত ভালোবাসতো না।পরবর্তীতে সে বাবার পেশাতেই বেশ মানিয়ে নিয়েছিল,এবং গ্ৰামের মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করে মোটামুটি জীবন কাটাচ্ছিল।
ওদিকে রাজুকে ওর বাবা চাষের কাজে বেশি পেতো না।রাজু খালি পড়তে চাইতো। বাবা বলতেন,,, আমরা গরীব মানুষ এতো পড়তে চাইলে হবে রে। চাষের কাজ শেখ্।এটা করেই জীবন কাটবে। রাজুর মন মানতো না।
এই নিয়ে ঘরে খুব অশান্তি হতো। একদিন অশান্তি অনেক দূর গড়ালো। তার ফল রাজু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেল। দূরে শহরের কাছ ঘেষে এক চায়ের দোকানে কাজ নিল। সারাদিন কাজ করে রাত জেগে পড়তো সে। চায়ের দোকানে আসতো এক মাস্টার মশাই। রাজু অনেক কিছু তার কাছ থেকে জানতে চাইতো। মাস্টার অলোক বাবু রাজুর আগ্ৰহ দেখে পুরোনো বই খাতা জোগাড় করে দিতেন। রাজু প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করলো।এরপর টুয়েলভ। দোকানে বেশি সময়,কাজ করতে চাইতো না রাজু।পড়তে হবে,এটাই মাথায় ঘুরতো। চায়ের দোকানের মালিক একদিন রাজুকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিল। রাজু এক মুদি দোকানে দিনের বেলা কাজ শুরু করলো। সন্ধ্যায় ওই দোকানের পিছনে আধো আলোয় বসে পড়তো। দোকানের গো,ডাউনেই ঘুমোতো।
রাজু এভাবে টুয়েলভ পাশ করে ভাবলো,,কোনো রকমে চেয়েচিন্তে এ পর্যন্ত তো হলো। এবার কি হবে?
সেদিন বসে দশটাকা দিয়ে ঝালমুড়ি কিনে পার্কে বসে আছে রাজু। ভাবছে বসে আকাশ পাতাল। ঝালমুড়ি খেয়ে কাগজের মোড়কটা ফেলতে গিয়ে দেখে রেলে লোক নিচ্ছে, টুয়েলভ পাশ। রাজু সেই মাস্টার মশাইয়ের সাথে যোগাযোগে বরাবর রেখে ছিল। তার বাড়ি মাঝে মাঝে যেতো। মাস্টার মশাই রাজুকে বড়ো ভালোবাসতো।ওর নরম পড়াকু স্বভাবের জন্য।
মাস্টার মশাই শিখিয়ে দিলেন কিভাবে আ্যপ্লাই করবে।
রাজু ক্লিনিংয়ের জব পেলো। মাস্টার মশাই বললেন,,,তুই কি এ কাজ করতে পারবি রে?সবাই পারে না। রাজু বলে,,,আমাকে যে পারতেই হবে স্যার। আমি যে আরো পড়তে চাই।
মাস্টার মশাই দু,হাত মাথায় রেখে আশীর্বাদ করলেন।
বললেন,, জীবনে অনেক বড়ো হ, বাবা।
রাজুর লড়াই চলতে থাকলো। রাজু ওপেন ইনর্ভিসিটি থেকে গ্ৰাজুয়েশন, মাস্টার্স শেষ করে। মাস্টার মশাইয়ের উপদেশে বি,এড করে একটি স্কুলে জব নেয়। রাজুর এটাই ছিল ছোটোবেলা থেকে স্বপ্ন। আজ পূর্ণ হলো।
ধীরে ধীরে কোচিং সেন্টার খোলে রাজু। বেশ পসার বেড়েছে তার। ব্যাঙ্ক লোনে একটি ফ্লাট কেনে সে। মাস্টার মশাই এবার বলেন,, রাজু একটা কথা বলি,,,রাখবি, আমার ইচ্ছেটা?আমার ছোটো মেয়েটাকে বিয়ে করবি?
রাজু বলে,,, স্যার , বিয়ের কথা এখনো ভাবিনি। আগে আমার বৃদ্ধ বাবা,মা,, তাদের খোঁজ নিতে হবে। দুই দিদির বিয়ে হয়েছে কি না ,জানতে হবে। আমার অনেক দায়িত্ব আছে স্যার। তাছাড়া আপনার মেয়ের সম্পর্কে আমি তো কখনো ভাবিনি। আমি খুব গরীবের ছেলে স্যার। আমার সাদামাটা জীবনের সাথে সবাই মানাতে পারবে না।
মাস্টার মশাই অলোক বাবু জানেন ,বোঝেন,রাজু অমূল্য হীরা। মুখে একটু হেসে বলেন,,,বেশ বেশ,তোর বাবা মায়ের সাথে এবার যোগাযোগ কর। তোর দায়িত্বকে আগে ঠিকমতো পালন কর্।এটাই করা উচিৎ।
দীর্ঘ সময়,বছর পরে রাজু বাড়ি ফেরে। বাবা,মা অবাক।
তারা জানতো, ছেলে আর কখনোই ফিরবে না।
সেই ছেলের এতো পরিবর্তন ও উন্নতির সব কাহিনী শুনে গর্বিত হন গরীব চাষী বাবা, মা। রাজু দেখে বাবা আর চাষের কাজ সালাতে পারে না জমি বিক্রি করে দুই বোনের বিয়ে দিয়েছেন। এখন গ্ৰামের পথের ধারে এটি সবজীর দোকান করেছেন। কোনো রকমে দুজনের জীবন চলে।
বাবা,মা,, বোনেদের জন্য শাড়ি,ধুতি ও অনেক রকম জিনিস এনেছিল কিনে রাজু। বাবা,মা আজ খুব খুশি।
দিদিদের বাড়িতেও গিয়ে দেখে আসে তাদের। যোগাযোগ রাখতে বলে।দেখা করে গাঁয়ের সকলের সাথে।ছোটবেলাটা যাদের সাথে কেটেছে।
ছোটোবেলার প্রিয় বন্ধুর বাড়িতে আসে,,, বন্ধুর বৌ আপ্যায়ন করে ঘরে একটি চেয়ারে বসতে দেয়।
বন্ধু ললিত সামনে আসে। বলে,,, তুই এসেছিস আমি জানি। কিন্তু তোর সামনে যেতে পারিনি। কোথায় তুই,আর কোথায় আমি।
রাজু বলে,,, ওটা জীবনের গল্প। সব শেষে বন্ধুত্বটাই দামি। তোকে কি আমি কখনো ভুলতে পারি,বল্।
ললিত বলে,,, আমার তো খুব সাধারণ জীবন। লেখা পড়া তোর মতো করলাম না। ইচ্ছেও করতো না।
রাজু বলে,,,এটা তোর পছন্দ।ওটা আমার পছন্দ। এ সব কথা থাক। তোর জন্য ছোট্ট উপহার এনেছি।
তোর ছেলে মেয়ে ক,টি?
ললিত বলে,,চার জন।
রাজু একটু হেসে বলে,,,এ ব্যাপারে তুই বেশ অনেকটা এগিয়ে। আমার বয়স বত্রিশ হয়ে গেল। এখনো কিছু শুরুই হলো না।
ঘরে ফিরে আসে রাজু। বলে মা,,, ছুটি যা নিয়ে এসেছিলাম,সে তো শেষের দিকে। এবার যে ফিরতে হবে আমায়। মায়ের চোখে জল।বাবার মন খারাপ।
রাজু বলে,,,একা ফিরে যাবো বলে তো আসিনি আমি।
তোমরাও যাবে আমার সাথে গুছিয়ে নাও যৎসামান্য।
পরশুদিন গাড়ি আসবে।
বাবা বলেন,,কি করে হবে? এই বাড়ি ঘর,দোকান সব তো আছে।
রাজু বলে,,, সব ভাবা হয়েছে বাবা। এসব দিদিদের দুজনের জন্য থাক। তোমরা আমার ওখানে চলো। তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না।
শহরে ছেলের বাড়িতে এসে সব দেখে গরীব চাষী বাবা মা,যেনো স্বপ্ন দেখেন। ভাবতেই পারেন না এতো সুখ তাদের ভাগ্যে ছিল।
সময় যেতে থাকে বেশ। মস্টার মশাই অলোক বাবু হাল ছাড়েন না , কোনো ভাবেই। অবশেষে সকলের সহমতে স্নেহের রাজুকে ছোট জামাই হিসেবে বেশ অনুষ্ঠানে ঘটা করেই গ্ৰহণ করলেন।
শুরু হলো রাজুর জীবনের আরেক অধ্যয়।।
(এমন জীবনের গল্প আমরা নানা ভাবে সমাজের বুকে দেখি, তবুও নতুন আঙ্গিকে জীবনের গল্প ফিরে ফিরে আসে।)
সমাপ্ত
পুণা,,, মহারাষ্ট্র
৩০/১০/২০২২

No comments:
Post a Comment