Saturday, 5 November 2022

অন্য পুজো--রুচিরা মুখোপাধ্যায় দাস

অন্য পুজো--
রুচিরা মুখোপাধ্যায় দাস                                    -

              - " থাম্মা, তুমি যে বললে আজকেদ্দিনে ছব্বাইকে নতুন জামা পত্তে হয়! দুগ্গা মাও বুঝি নতুন শায়ী পয়েছে? "
- " হ্যাঁ সোনা। আজ যে মা দুর্গার বোধন! শ্রীরামচন্দ্র আজকের দিনে বানর সেনাদের নতুন বস্ত্র দিয়েছিলেন। সেই থেকেই দুর্গাপুজোয় নতুন বস্ত্রের প্রচলন।"
- " বত্র মানে কি থাম্মা? প্রলোচন না কি অ্যাত্তা বললে ছেছে! ওতার মানে কি?"
- "নাও এবার শুরু হল প্রশ্ন।"
- " ও থাম্মা! ওই দ্যাখো ! ওখানে দুতো দাদা , অ্যাত্তা ছোত্ত বুনু খালি গায়ে, ছুধু প্যান্তু পয়েছে কেন? ওদেত বুঝি গয়ম লাগছে! ওদেত মা দেখো কেমন নোংয়া ছেঁয়া শায়ি পয়েছে! ওদেত নতুন জামা কই ? আমাত্ত কত্ত নতুন জামা হল। মা, বাপিন , তুমি, দাদু , ছোনা কাকি, মামা, পিমনি ছবাই মিলে এই এত্ত জামা দিল।"
- " ওঃ মিতুন একটু চুপ কর। আমায় পুজোটা দেখতে দে সোনা ।"
-" আমাত মাথায় অ্যাত্তা বুদ্ধি এছেচে থাম্মা। দুগ্গা মা, নক্ষ্মী মা , ছরচ্বতি মা, এদেত শায়ীতা খুয়ে নেব ।"
- "ও মিতুন সোনা! এমন অলক্ষুনে কথা মুখে আনে না আজকের দিনে!"
- " তুমি তো আমাত পুও বুদ্ধিতাই ছুনলে না। আগে তো ছোনো। ওদেত শায়িতা খুলে ওই যে নোংয়া ছেঁয়া শায়ি পয়েছে ওই দাদাতার মা , ওই ছোত্ত বুনুতার মা তার পাছে দেখো আরো দুতো মা আছে ওদেত দেব।"
- "ও বৌমা! বকবক করে মাথা খাচ্ছে মিতুন। একটু সামলাও না! পুজোর মন্ত্রগুলো একটাও শুনতে পাচ্ছি না ঠিকমতো । "

ছোট্ট মিতুনের প্রশ্নে জেরবার ঠাকুমার কাছ থেকে ভুলিয়ে নিয়ে আসলো অনসূয়া। ঢাকের আওয়াজ, ধূপের গন্ধে ভরপুর ষষ্ঠী। চারিদিকে আলোর রোশনাই। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। তবুও মিতুনের বড় মন খারাপ!

কর্পোরেট চাকরির জন্য মিতুনের বাবা মা খুবই ব্যস্ত। সকাল থেকে রাত। ঠাকুমা দাদু আর বন্দনা মাসি - যে মিতুনকে দেখাশোনা করে সব সময়, এরাই তার সারাদিনের সঙ্গী। যদিও দিনের শেষে অনসূয়া তার একমাত্র ছোট্ট মেয়ের সমস্ত কথা মন দিয়ে শোনে । যথাসম্ভব তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে। খুব কৌতুহলী মেয়ে মিতুন। সব ব্যাপারে অন্য বাচ্চাদের তুলনায় কৌতুহল তার অনেক বেশি । তাই তার প্রশ্নের জেরবারে পরিবারের সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ক্লান্ত হয় না শুধু অনসূয়া! দিনের শেষে মিতুনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয় । তার সাথে গল্প করে । খেলা করে। তারপর ঘুমোতে যায়। এ তার রোজকার রুটিন। মিতুনও জানে, কেউ তার প্রশ্নের উত্তর ঠিকমতো দিতে না পারলেও মা ঠিক দেবে। তাই সারাদিন ছোট্ট মেয়েটি সূর্য ডোবার অপেক্ষায় থাকে। না, ঘড়ি দেখতে মিতুন পারে না । সে শুধু জানে তার রাতের খাওয়া শেষ হলেই তার মা বাড়িতে ফিরবে। ফ্রেশ হবে। তারপর ঘরে গিয়ে শুয়ে শুয়ে গল্প করবে। তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেবে। কৌতূহল মেটাবে। ষষ্ঠী সপ্তমী এবার শনি রবি। তাই অফিস এমনিতেই ছুটি। মাকে সে সারাদিন পেলেও প্রশ্নগুলো যেন তুলে রাখে রাতের জন্য। যেন সবার আড়ালে মায়ের সাথে নিরিবিলিতে কথা বলতে চায় সে। রাতের বেলার ওইটুকু সময় যেন শুধু দুজনের। শুধু মা মেয়ের । ষষ্ঠীর দিন সারাদিন হৈ হৈ করে, নতুন জামা পড়ে, সবাই মিলে ঠাকুর দেখে, লুচি মিষ্টি খেয়ে খুব আনন্দে কাটলো। এটা মিতুনের চতুর্থ পুজো। পুজোর সময়ই সে জন্মেছিল। তাই সে বছর থেকে বাকি দু বছর পুজোর কিছুই সে বিশেষ বোঝেনি। এবারেই যা পুজোর আনন্দটা একটু বুঝতে শিখেছে।

সপ্তমীর সকাল। পুজোর ঢাকের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো মিতুনের। দেখল মা নতুন শাড়ি পড়ে সুন্দর সেজেছে। কী সুন্দর লাগছে মাকে! ঠিক যেন মা দুর্গা!
- "মা তুমি অফিছ যাচ্ছ? "
- " না সোনা। আজ যে সপ্তমী। তাছাড়া সানডে। অফিস ছুটি। "
- "বাপিনেরও ছুতি ?"
- " হ্যাঁ সোনা। আজ সবাই আমরা একসাথে ঠাকুর দেখব। খুব ঘুরবো। অনেক মজা করব ।তবে তার আগে আমার ছোট্ট একটা কাজ আছে। তাই এখন একটু বেরোবো। তুমি কিন্তু লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে বন্দনা মাসির কাছে খেয়ে নেবে । "
- " তাতায়ী ফিব্বে তো?"
 মিতুনের কপালের চুলগুলো সরিয়ে একটা চুমু দিল অনসূয়া।  
বেশ কিছুক্ষণ পর ফিরে এল অনসূয়া। মিতুনকে নতুন জামা পড়িয়ে সাজিয়ে গুজিয়ে নিয়ে বেরোলো। গাড়িতে উঠলো। মিতুনকে পাশের সিটে বসিয়ে ড্রাইভ করে পৌঁছে গেল গন্তব্যে।
- " ঠিক এলকম কাঁচ্চা হাউস আমি ড্রয়িং কয়ী মা। পিপি ছিখিয়েছে। " 
অনুসূয়া হাসলো । বলল 
- "দেখ! কত মানুষ রাস্তায় বসে। রাস্তায় শুয়ে। রাস্তাতেই ওদের ঘর। এদের তো তাও কাঁচ্চা হাউস আছে। ওদের সেটাও নেই! "
গাড়ি থেকে নামলো অনসূয়া। গাড়ির পেছন থেকে নতুন বস্ত্র বার করে তুলে দিল মিতুনের হাতে । নতুন বস্ত্রে মিতুন সাজিয়ে দিল ব্রাত্যদের। সপ্তমীর ঢাকের আওয়াজে নেচে উঠলো কিছু ব্রাত্যের মন! মিতুনের মনেও নতুন সুর! নতুন রঙ!

এ যেন এক অন্য পুজোর গন্ধ!!

                               সমাপ্ত


                                              

No comments:

Post a Comment

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...