হঠাৎ ফোন --
সন্ধ্যা রায়
অবসরপ্রাপ্ত বিশাল বাবু ঘরে একাই থাকেন। তিনি সারাদিন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চান। ঘরের কাজে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঘুরে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। রাত হলেই ওনার মনে পড়ে, দুই ছেলে চাকরি নিয়ে বাইরে থাকে। ওরা বিয়ে শাদী করে বাইরে সুখেই আছে। সবাই বিশাল বাবুকে একা করে চলে গেছে। এমন কি স্ত্রীও তাকে মনে রাখেন নি যে কি সাত জনমের ভার নিয়ে বিয়ে করেছিল । এক জনমেই তা পুরো করতে পারেনি। ছোট ছেলের বয়স তখন মাত্র পাঁচ, স্ত্রীর জ্বর হল, হাসপাতালে গেল, আর ফিরে এলো না।
ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো, ক্রিং ক্রিং–কাকা বাবু আমি সৎপতির বন্ধু বলছি–
–কি ব্যাপার, এত রাতে ফোন করলে?
–উপায় ছিল না কাকাবাবু, খুব দরকারেই এই ফোন করেছি।
–আমি তোমাকে ভালো করে চিনতে পারছি না। –হ্যা কাকা বাবু খুব ব্যস্ত থাকতাম, কোথাও যাওয়া আসার মত সময় থাকত না। তাই আপনার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি, তবে আমার নাম তো শুনে থাকবেন।
–হয়ত বা শুনেছি, তবে অনেক বছর আগের কথা এখন আর মনে করতে পারছি না। আমি বয়সের ভারে নুব্জ। এখন আর কিছু মনে রাখতে পারি না।
–না না, কাকাবাবু, আমি হলাম শিবাজী, আমি সতপতির বন্ধু, আমার ভাই রামোজি।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, তোমাদের বাড়ি তো নাগপুরে, তুমি আর তোমার ভাই রামোজি কখনো আসতে তাই তো?
–হ্যাঁ হ্যাঁ কাকাবাবু, আমি একবার এসেছিলাম । সৎপতির সাথে পড়তাম আপনি জানতেন সেটা। আমি জানি আজকে আপনাকে যেটা বলবো সেটা আপনি জানতেন না। আমার ছোট ভাই খুব জুয়া খেলতো, মদ খেত, এমন কি রেসের মাঠে আমাদের ঘরের জমানো সব টাকা পয়সা উড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর আর যাওয়া আসা ছিল না। তখন আমি আর আমার ভাই দুজনেই কলেজে পড়তাম আমি সৎপতির সঙ্গে বম্বে পড়াশোনা করি। এক দিন বাবা আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি এসে দেখি । আমার কলেজে পড়া তো দূরের কথা । মাথার ছাদটাও যাওয়ার অবস্থা, মা-বাবা কান্নাকাটি করছেন । আমি সৎপতিকে বুঝিয়ে বললাম আমার সব কথা। আমার আর পড়াশোনা হবে না। আমাদের এমনি অবস্থার কথা শুনে সৎপতি বম্বে থেকে কলকাতা এসে গেল। আমরা ছোটবেলা থেকেই একসাথে পড়তাম আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম । ওই আমাকে বলল, তোর পড়া ছাড়লে চলবে না, আমাকে কিছু ভাবতে দে। আমরা আবার দুজনেই একসাথে বোম্বে যাব। বলে সে ঘরে চলে গেল। তখন ভাই রামোজি যে কোথায় আছে ,আমি জানি না, দুদিন ও ঘরে আসেনি। ঘরে শুয়ে আমি আকাশ পাতাল ভাবছি সকালে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। ভোরবেলা সৎপতির ডাকে ঘুম ভাঙলো। শিবাজী একটু থেমে আবার বলে উঠলো, কাকাবাবু আপনি আমার কথা শুনছেন তো ?
–হ্যাঁ শুনছি। তুমি তারপর বল ।
সৎপতি আমাকে এসে বলল, এই নে এটা রাখ । এটা সোনার দোকানে দিয়ে সব দেনা পরিশোধ করতে পারবি মনে হয়। তোদের এই বাড়িও থেকে যাবে । আমি দেখে তো চমকে গেছি । একটা আংটি ঝকঝক করছে।
শতপতি বলল, এটা আমার ঠাকুরদার ছিল । বাবাকে মরার আগে এটি দিয়ে গেছেন । আমার ঠাকুরদা বাংলাদেশের রংপুরের জমিদার প্রতাপ রঞ্জন চৌধুরী ছিলেন। সৎপতি তারপর আর দাঁড়ায়নি, চলে গেছে । সে রাতেই আমার জ্যাঠামশাইকে নিয়ে ফিরে এলো রামোজী। রামোজীর কাছ থেকে সব কথা শুনেছেন জ্যাঠা মশাই । রামোজি দুদিন পুলিশের ভয়ে জ্যাঠামোশের কাছেই ছিল। জ্যাঠামশাই নিঃসন্তান। জেঠিমা মারা গেছেন। জ্যাঠামশাই সব টাকা পয়সা দিয়ে বাবাকে সাহায্য করে ছিলেন । কিন্তু আমি আর আংটিটা ফিরিয়ে দিইনি । আমার আংটিটার প্রতি খুব লোভ হয় ছিল। আমি সেটা আমার কাছেই রেখেছিলাম । এখন আমার আর কোন প্রয়োজন নেই, তাই এখন আমি এটা ফিরিয়ে দিতে আসছি।
বিশাল বাবু শুনে বললেন, এখন এই এত রাতে কেন দেবে? তার থেকে তুমি কাল সকালে এসো।
শিবাজী বলল, না, না, কাকাবাবু, আমার আবার এক জায়গায় যাবার তাড়া আছে। তাই আমার হাতে আর সময় নেই। কথা বলতে বলতে আমি আপনার দরজার সামনে এসে পড়েছি। আপনি দরজা খুলুন।
বিশাল বাবু বিছানা থেকে উঠে হাতের মোবাইলটা রেখে দরজাটা খুলে দিতেই দেখলেন বাইরে প্রচন্ড ঝড় উঠেছে। ঝড়ের মধ্যেই একটা ছেলে তার মুখটা ঢাকা। সে ছুটে গিয়ে টেবিলের ওপর একটা ছোট বক্স রেখেল। তারপর সে আবার ছুটে বেরিয়ে গেল । যাওয়ার সময় বলল, কাকাবাবু যাই । লজ্জায় আমার আর মুখ দেখাতে পারলাম না । আমি আমার কৃতকর্মের ফল পেয়ে গেছি । আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। বলেই সে উধাও হয়ে গেল । বিশাল বাবু দরজা বন্ধ করতে করতে দেখলেন বাইরের হাওয়া ঝড় যেন হঠাৎই থেমে গেছে। উনি ভিতরে এসে আংটিটা দেখে উত্তেজনা আর সামলাতে পারলেন না । খুব খুশিতে ছেলেদেরকে ফোন করে সব বললেন । ছেলেরা শুনে খুব খুশি হল। বিশাল বাবু ভাবতে থাকলেন এটা এখন আমারও কোন দরকার নেই। বিশাল বাবু শুয়ে পড়লেন। ভোর হলে উনি উঠে তৈরি হয়ে রোজগার মত চা হাতে বাইরে বারান্দায় এসে বসলেন । কাগজ পড়ার জন্য কাগজে চোখ রাখতেই উনার চক্ষু চড়ক গাছ । প্রথম পৃষ্ঠাতেই বিরাট করে ছবি, আর ছবির নিচে বড় হরফে লেখা, দুই ভাইয়ের দুর্ঘটনায় মৃত্যু। দুর্ঘটনায় ট্রাক ও ট্যাক্সির সংঘর্ষে রামোজি ও শিবাজী দুই ভাইয়ের মৃত্যু ঘটেছে। খবরটা পড়ে বিশাল বাবু থ হয়ে গেলেন । ভাবলেন কাল রাতে তবে তার সঙ্গে কি ঘটেছিল!
সমাপ্ত
গল্পটি একনাগাড়ে পড়লাম। ভালো লাগলো। সুন্দর একটি অণুগল্প।
ReplyDelete