Tuesday, 8 November 2022

মা-রা কি বেশ্যা হয়? -- মৌসম সামন্ত (অসুর)


মা-রা কি বেশ্যা হয়? --

মৌসম সামন্ত (অসুর)


"মা! এই রবিবারেও তোমার কাজ! কোথায় কি চাকরি করো গো? যার জন্য প্রতিদিন এত সকালে বেরিয়ে যাও আর কতো রাতে ফেরো? আর তোমাকে এতো দুর্বল-ই বা লাগে কেন? তোমার কি হয়েছে?" মাকে একটু চেঁচিয়েই বলে উঠলাম। 

"বয়স হচ্ছে তো সোমু,তাই আর কি...! আচ্ছা আজ তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করবো...ঠিক আছে?" 

"আচ্ছা, পাড়ার লোক তোমার সাথে কথা বলে না‌ কেন? ওই বখাটে ছেলেগুলো তোমার দিকে এমন কটুক্তির দৃষ্টি নিয়ে তাকায় কেন? আমি বুঝতে পারি না..." আমি বললাম।

"ওইটা মেয়েদের সমস্যা রে, তুই বুঝবি না। আমি আসছি, এসে রাতে গল্প করে ঘুম পাড়িয়ে দেবো, আজ প্রমিস আর হ্যাঁ, কেউ ডাকলে দরজা খুলবি না শুধুমাত্র আমি ছাড়া, আমি ডাক দিলেই। ঠিক সময়ে খাবারটা খেয়ে নিস।" মা বললো।

"মা, আমি স্কুলে যাবো না? সবাই স্কুল যায়, মজা করে আর আমি...!" এই বলে আমি একটু মনমরা হয়ে গেলাম।

মা বললো- "পরের মাসেই আমি তোকে হোস্টেলে ভর্তি করে দেবো বাবু! টাকাটা পুরো পেলেই..."

এরপর মা বেরিয়ে যায়। বুঝতে পারি না মা কি কাজ করে যে, এরকম একটা অদ্ভুদ সেজে বাড়ি থেকে বেরোয়। পাড়ার লোক মাকে দেখে থুতু ফেলে, বেশ্যা বলে। এ বাবা, বেশ্যা মানেটা কি মাকে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেলাম। রাতে এলে জিজ্ঞেস করবো। নিশ্চয় চাকরির একটা দিক হবে, হয়তো কোন ভালো পোষ্ট। মা চলে গেছে সকাল ৮ টায়। এইসব ভাবতে ভাবতে সময়টা কখন যেন ১০টায় চলে এল। হঠাৎ সুব্রতদা এসে আমাদের ঠেকে এসে ব্যঙ্গ করে বলতে লাগলো- "ও মিনতি! আছো নাকি...একটা নতুন কাষ্টমার আছে, দুঘন্টায় ৪০০০ দেবে বলছে‌। তুমি কি রাজি? তবে বলো..."

আমি অবাক হয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম। সুব্রতদা আমাকে লক্ষ্য করে বলবো, "কি রে বেশ্যার ছেলে, তোর নাদুসনুদুস মা টা কই?" 

আমি বুঝতে পারলাম না যে সুব্রতদা কি বলতে চাইলো। আমি বললাম- "মা তো বেরিয়ে গেছে! কেন?"

সুব্রতদা ঠোঁট বেঁকিয়ে পাশে দাঁড়ানো লোকটার সাথে কি একটা কথা বলে আমায় বললো..."তোর মায়ের নম্বর আছে?"

আমি মায়ের নম্বরটা গড়গড় করে বলে দি। অজানা লোকটা নম্বরটা লিখে নেয়। এরপর আমি ফোন নম্বর নিলো কেন জিজ্ঞেস করাতে সুব্রতদা বলে ওঠে- "তেমন কিছু না, তোর মায়ের সাথে একটু কাজ আছে আর কি..."

আমি ভাবলাম- "কি এমন কাজ,যার জন্য ৪০০০ টাকা!"

বাবা আমার মাকে ছেড়ে চলে গেছে আজ ৬ বছর, একটা অন্য মহিলকে বিয়ে করে সংসার করছে। সেই থেকে সংসারের‌ হাল মায়ের এই চাকরি চালাচ্ছে। 

রাত বাড়লো। মা এখনো ফেরেনি। আমি জানতাম, এটাই হবে আর তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে একাই ঘুমিয়ে পড়লাম, তবে আজ সারাদিন একটা কথাই মাথায় ভাসছে, বেশ্যাটা কি! 

এরপর মা এলো। দেখলাম ব্যাগটা রেখে বাথরুমে গেলো, চুলটা যেন দেখে মনে হলো কেউ টেনে ধরেছিল, মুখটা পুরো লাল, হাত-পা লাল, ঠোঁটটা মনে হলো কেউ ছিঁড়ে চিবিয়ে দিয়েছে, সারা শরীরটা যেন কোন ক্ষুধার্ত কুকুরের ক্ষুধা নিবারণ করেছে। 

মা বেরিয়ে দেখল, আমি জেগে আছি। কোনরকম অপেক্ষা না করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম, "বেশ্যা কি?" 

মা কথার উত্তর দেয়না। ততক্ষণে মায়ের ব্যাগ খুলে প্রায় ৮০০০ টাকা আর ৭টা পেইনকিলার পেলাম আর সাথে ব্যাথার ঔষুধ। 

মা একটাই কথা বলল যেটা আমার কানে আজও বাজে এই যে- 

"আমি তোর মা, একদিন তুই বড়ো হবি, জানবি তোর মা কি কাজ করে, বেশ্যা কি সব সব...নয়তো সেদিন আমায় তুই ঘেন্নাও করবি, যা মন চায় করিস বাবা, শুধু মনে রাখিস সমাজের কাছে আমি বেশ্যা, তবে তোর কাছে আমি মা...সমাজ কি ভাবলো আমার কিছু যায় আসে না, তবে তুই ভাবলে আসে। আর বাবা, মায়ের থেকে বড়ো কাজ বা শব্দ হয়না!"

এই বলে মা কাঁদতে শুরু করে দিল।

আচ্ছা আপনারাই বলুন তো, মা-রা কি সত্যিই বেশ্যা হয়?


সমাপ্ত

1 comment:

  1. খুব ভালো লাগলো আপনার গল্পটি। অনন্য সৃজন।

    ReplyDelete

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...