Friday, 4 November 2022

সাবিত্রী দাসের গল্প--যে গল্প লেখা হয়নি ও আহ্বান



সাবিত্রী দাসের গল্প--

যে গল্প লেখা হয়নি ও আহ্বান

    কেয়া বলেছিল সমীর কে-'আমাদের দুজনকে নিয়ে একটা গল্প লেখ না! সে গল্প সমীর আজও লিখতে পারেনি, আসলে  তা লেখার ক্ষমতাই  আজ আর নেই। তখন ছিল,  অসাধারণ লেখার ক্ষমতা ছিল  তার ! সত্যি কথা বলতে কী সেদিন ছিল না সময় ।  সদ্যবিবাহিত সমীর কেয়ার স্পর্শে, গন্ধে, দিশাহারা  দিন কাটাচ্ছিল।দিনরাত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল তাদের । ভেসে যাচ্ছিল ভালোলাগায়,  ভালোবাসায়। ভেবেছিল ভালোবাসার সৌরভটুকু বুকের  মধ্যে  ভরে নেবে, তারপর!  লিখবে তাদের উন্মাদনার গল্প, উদ্দাম ভালোবাসার গল্প।  তা রয়েছে বৈকি! আজও সেই সৌরভ রয়েছে বুকের ভেতর ।  সেই সুখ-স্মৃতি গুলি  মণিমুক্তার  মতো আজও রয়ে গেছে  বুকের ভেতরে, একান্ত  সংগোপনে।
     জীবন  থেকেই  গল্প জন্ম নেয়। জীবনের চলার  পথে  প্রতিটি বাঁকে বাঁকে কতই না রোমাঞ্চকর  অভিজ্ঞতা! তা সেই অভিজ্ঞতা গুলো যে আলোর রোশনাই হয়ে  আলোয় আলোয় ভরিয়ে  দেবে, ভাসিয়ে  নিয়ে  যাবে সুখের  সাগরে  কিংবা  গল্পের  মতো  মিলনাত্মক হয়ে উঠবে তা তো  আর  সবসময় হতে পারে না । হলোও না, চারবছর  সংসার  করার পর কেয়া যখন মেণ্টাল  অ্যাসাইলামে চলে গেল , সেই জীবন  জীবন হয়ে উঠতে  পারলো না, সে গল্পও আর দানা বাঁধতে পারলো না কিছুতেই ! কেমন যেন ছড়িয়ে গেল।নিঃসঙ্গ জীবনে কেয়ার একাকীত্ব টুকুই  কাল হয়েছিল তাদের  জীবনে।সন্তানের জন্যও আকুলতা কম ছিল না! সমীর  কাজের চাপেও বটে কিংবা যে কারণেই হোক, ঠিক সেভাবে কেয়াকে বোঝার চেষ্টাও করেনি কোনোদিন।  একটা ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে দিয়ে পার হচ্ছিল কেয়া। একদিকে একঘেঁয়ে দাম্পত্যের দায়বদ্ধতা, কেয়ার একাকীত্ব আর সমীরের নির্বিকল্প ঔদাসীন্যই কেয়াকে অনিবার্য পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছিল ক্রমশ। তাই কেয়া অ্যাসাইলামে যাওয়ার পর সমীর যখন উপলব্ধি করতে পারলো ছিটকে পড়লো, পড়লো মুখ থুবড়ে । যন্ত্রনা বিদ্ধ পশুর মতো কাতরাতে কাতরাতে সেই রক্তচোঁয়ানো ব্যথা   কোনোমতে বুকে  সয়ে নেওয়া গেলেও লিখতে বসলেই চুইয়ে পড়া রক্তে বার বার খাতার পাতা  গেছে  ভিজে, আর প্রত্যেক বার  নূতন করে  রক্তাক্ত   হয়েছে হৃদয় ! বাষ্পাকুল দুচোখের দৃষ্টি হয়েছে ব্যাহত।  তাই  শত  চেষ্টাতেও সে গল্প  আর কোনোদিনও লেখা হয়ে উঠল না সমীরের।


আহ্বান 
   

তখন ফাল্গুন মাস, বসন্তে ডালে ডালে আগুন জ্বেলে রাঙাপলাশ হাসছিল,শিমূল ফোঁটা ফোঁটা বুকের রক্ত দিয়ে ফুল ফুটিয়েছিল। আমের মঞ্জরী তার গন্ধ মাখিয়ে দিয়েছিল বাতাসে।বাতাস তখন উতলা হয়ে এসে কানে কানে ফিস ফিস করে বলেছিল-"আমি এসে গেছি।" বাতাসের সেই ফিসফিস,ভ্রমরের গুঞ্জরণ, কৃষ্ণচূড়ার  অশ্রুত মর্মরধ্বনি বুকের গভীরে এসে শুনিয়ে গিয়েছিল প্রেমের মর্মগাথা ! অব্যক্ত প্রেমের বার্তা অযুত তরঙ্গে আছড়ে পড়েছিল বুকের ভেতর।  তবুও মন  ছিল নিরাসক্ত ।   বিয়ের পর সংসারে মন বসাতে পারেনি তখনো ।পারবে কী করে! বুকের  ভেতর  সেই আহ্বান! ভোলে কি করে! অস্থির  হয়ে ওঠে  তার মন । কেউ একজন তো একটানা ডেকেই চলেছে সেই কবে থেকে! স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে এসেছে শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে। সমুদ্রের দিকে  চেয়ে চেয়ে দেখে আর মুগ্ধ হয়। বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন বলে ওঠে- 'শেষমেশ এলে তাহলে!'
কিছুতেই বুঝতে পারে না এমন কেন হচ্ছে! 
হোটেলে ফিরে পরিচ্ছন্ন হয়ে জগন্নাথের মন্দিরে ঢুকতেই  অপার্থিব একটা শিহরণ  ছড়িয়ে পড়ে  শরীরে। নির্নিমেষে চেয়ে থাকে জগন্নাথের মূর্তির দিকে। বুকের  ভেতর  হাহাকার জেগে ওঠে  তুলির,  দুচোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। ভিজিয়ে দিয়েছে বুকের আচ্ছাদন। তুলি বোঝে এতদিন কে ডাকছিল তাকে! 
       রাতে স্বপ্ন দেখে আলোয় আলোময় এক দেবতনু,তাকে বলছে- 
 'আজ বসন্তে এসেছো !  অপরিচয়ের আঁধার যে কাটলো না এখনো ,ভোর হবে কি করে!' 
তুলি বলে -'বারে, সব দায় বুঝি আমার !'
সেই দেবতনু বলে-  
'দেখো একদিন   সহস্র  শৃঙ্খল দিয়ে গাঁথা সব প্রাচীর যাবে ভেঙ্গে । রাঙা পলাশের আগুনে ডানায় ভর করে তোমার কাছে ঠিক পৌঁছে যাবে আমার অব্যক্ত প্রেম।সময় হয়ে এসেছে। '
 ঘুম ভেঙেছে তুলির, বড়ো প্রসন্ন মন নিয়ে  ঘুম ভেঙেছে আজ প্রথমবার।

         **********

No comments:

Post a Comment

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...