Saturday, 5 November 2022

বামনডাঙ্গা হল্ট--অর্ঘ্য শুর রায়

বামনডাঙ্গা হল্ট--
অর্ঘ্য শুর রায়

পাট ক্ষেতের বুক চিরে ছোটো হল্ট স্টেশনটা। বামনডাঙ্গা হল্ট।সকাল সন্ধ্যে মিলে পঞ্চাশ জন যাত্রীও ওঠানামা করেনা। তাও সারারাত টিকিট কাউন্টার খুলে রাখতে হয়।গ্রামবাসী আর রাজনীতির দাবি।অগত্যা সারা স্টেশনকে পাহারা দিতে হয় পাঁচজন রেল কর্মচারীকে।স্টেশন মাস্টার,একজন গেটম্যান,একজন ডিউটি করে টিকিট ঘর এ ।আর একজন রেল পুলিশ।দুটো ঘর।একটা টিকিট ঘর,আর একটা ঘর লাগোয়া স্টেশন মাস্টারের ঘর।ঘরের মধ্যেই খাটিয়া,রাতে শোয়ার জন্য। সবাই একসঙ্গে রাত কাটায়।সন্ধ্যে ৮:১৩ এর পর কোনো ট্রেন থামে না ।কিন্তু তাও টিকিট ঘর সারারাত খোলা থাকে।আবার সকাল ৪:১০ এ ডাউন মেইল ট্রেন আছে।স্টেশন থেকে নেমে গ্রামে যাওয়ার দুটো পথ।একটা বেশ কয়েক বছর আগে ঝামা ফেলে রাখা পথ। ওই পথে সারাদিনে চারটা অটো আর একটা বাস চলে।স্টেশন  রাস্তার একপাশে একটা মিষ্টি, একটা ছোটো মুদি দোকান আর একটা ভাতের হোটেল।সন্ধ্যে ছয়টা হলেই বন্ধ।লোকজন বিকালের পর প্রায় কেউ থাকেই না।

আর একটা রাস্তা আছে বটে কিন্তু সেটা প্ল্যাটফর্মের একদম মাথায়।ঢালু মাটির।তিন/চার ফুট চওড়া।রাস্তা না বলে জমির আল বলা ভালো।এটা ধরে জমির মাঝ বরাবর বেশ কিছুটা হেঁটে গ্রামে ওঠা যায়।সময় বেশ কিছুটা কম লাগে এই রাস্তায় গেলে। কাঁচা রাস্তাটা একটা পুরনো বটতলায় গিয়ে মিশেছে। বটতলার পর বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা।পাশেই একটা মজা দীঘি।এই জায়গাটা গ্রামের শ্মশান।একপাশে  চালা ঘরে একটি শ্মশান কালি মূর্তি।বিশেষ বিশেষ দিনে পূজা হয়।এদিক ওদিক ছড়ানো আধপোড়া চেলা কাঠ। মন্দির লাগোয়া ভাঙ্গা ইটের অস্থায়ী পাটাতনে কাঠ দিয়ে মরা পুড়ানোর ব্যাবস্থা আছে।চারিদিকে আধপোড়া পঁচা মাংসের গন্ধ  ম ম করছে।দিনের বেলায় শেয়ালের উৎপাত।সন্ধ্যা হতেই এদের ডাকে গা ছম ছম করে।তাই রাতে গ্রামের লোক কেউ মারা গেলেও শ্মশান পোড়াতে আনেনা। মরা বাসি করে পরেরদিন নিয়ে আসে।এর পাস দিয়ে রাস্তাটা গিয়ে গ্রামের মূল রাস্তায় মিশেছে।সন্ধের পর কেউ এই পথ বিশেষ মাড়ায়না।এখানে অনেকদূর পর্যন্ত কোনো লোকালয় নেই।চারিদিকে শুধুই পাট,ধান আর আখের জমি।একদিকে আবার বেশ কিছুটা অনাবাদি পতিত জমি।এই পতিত জমিতে আগাছায় ভরে গিয়ে ঘন জঙ্গল হয়ে গেছে।

আজ বেশ গুমোট গরম।আকাশটা মেঘলা করে আছে।চাঁদের আলো মেঘে ঢেকে গেছে।একদম হওয়া নেই।স্টেশন, বা গ্রাম কোথাও বৈদ্যুতিক আলো নেই। আজ লোকজন নেই বললেই চলে।হিতেনবাবু এতক্ষন টিকিট কাউন্টার এ ছিল।এরপর প্রায় চার ঘণ্টা পর থ্রু ট্রেন আছে।তাই ভাবলো একটু বড়ো রাস্তার ধারে দোকান বন্ধ হবার আগে একটা মিষ্টি খেয়ে আসবে। কিছুক্ষন পর দোকানগুলো সব বন্ধ হয়ে যাবে।পল্টুর দোকানের মিষ্টিটা বেশ ভালো লাগে।দুটো মিষ্টি নিয়েও আসবে,রাতে রুটির সাথে হয়ে যাবে।ঘরে হ্যাজাক আর হ্যারিকেন জ্বলে সন্ধ্যেবেলায়।স্টেশন থেকে বেরিয়েই ঘুটঘুটে অন্ধকার।লাস্ট অটো চলে গেছে।অন্যান্য দোকান গুলো বন্ধ হচ্ছে।

হিতেনবাবু হাকলেন "পল্টু  দুটো রসগোল্লা দে তো"।

দোকানে টিমটিম করে একটা মোমবাতি জ্বলছে।দোকানের ভিতরে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা।দোকানের সামনে একটা পায়া ভাঙ্গা কাঠের বেঞ্চ।ওটাতেই হীতেনবাবু বসলো।

"এই হতভাগা হ্যারিকেনটা একটু বাড়িয়ে দেয়।লোক তো বুঝবেই না দোকানে আছিস।"

না বাবু,এখনই বন্ধ করবো,তাই আর কি!মিনমিনে স্বরে পল্টু উত্তর দিলো।

তোদের এখানে একশ বছরেও উন্নতি হবেনা।সন্ধ্যে হলেই দোকান বন্ধ করে দিস কেনো?বিরক্ত ভরা গলায় হীতেন বাবু বলে উঠলো।

 একগাল হেসে পল্টু দুটো রসগোল্লা দিলো।

এই যা! মোমবাতিটা পুরো নিভল।চারপাশ ঘন নিকষ কালো।কিছুই দেখা যাচ্ছেনা।অন্য দোকান গুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

"এই পল্টু,পল্টু।কিছু একটা কর।দেখতেই পারছিনা।খাবো কী?" হিতেনবাবু চিৎকার করে উঠলো।

দোকানের ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলোনা।

তাড়াহুড়োয় হিতেনবাবু টর্চ টাও নিয়ে আসেনি।মহা মুস্কিল পড়ে গেলো।

দুসস! নিকুচি করেছে রসগোল্লার।হীতেনবাবু বেরিয়ে পড়লো।এক পা এগোতে গিয়ে অন্ধকারে হোচট খেয়ে পড়লেন।

উফফ! মাথায় খুব লাগলো,গ্রানাইট পাথর মনেহয়।আর কিছু মনে নেই।

অনেক পরে জ্ঞান ফিরলো।এখন হিতেনবাবু টিকিট ঘরে খাটিয়াতে সোয়া।গেটম্যান,পুলিশ,আর স্টেশন মাস্টার ঘিরে দাড়িয়ে চোখে জল দিচ্ছে।মাথায় আর পা এ খুব যন্ত্রণা। ঠোঁটেও খুব লেগেছে।রক্ত জমাট বেঁধে ঠোঁট ফুলে গেছে।

ওরা সবাই মিলে হিতেনবাবুকে ধরাধরি করে নিয়ে এসেছে বলল।মাথাটা ঝিম ঝিম করছে।স্টেশন মাস্টার মনেহয় রেল ডাক্তারকে ফোন করে ওষুধ শুনল।তারপর ঘরের ফার্স্ট এইড থেকে ওষুধ দিয়ে হিতেনবাবুকে চিকিৎসা করলো।

"আজ আর ডিউটি করতে হবেনা।সারারাত রেস্ট নিন।আমি করে দিচ্ছি।কাল সদর থেকে ফার্স্ট ট্রেন এ ডাক্তারবাবু আসবেন আপনাকে দেখতে,আমি কথা বলেছি।"মাস্টারবাবু জোরে বলে উঠলো।

 তারপর চিৎকার করে"এই তোমরা সবাই এখানেই থেকো ওনার সাথে"বলতে বলতে স্টেশন মাস্টার বললো ঘর ছাড়লেন।

সকাল সাতটায় ডাক্তার অবদেশ কুমার এসে গেলো।অনেকদিন ধরেই সদরে পোস্টিং আছেন।আর দুই বছর পর রিটায়ারমেন্ট ।বেশ ভালো ওষুধ দেয়। হিতেনবাবুর মাথা এখনও বেশ ঝিমঝিম করছে।আজ একটু ভালো আছেন।কিন্তু গা হাতের ব্যাথা গুলো খুব আছে।

ডাক্তারবাবু ভালো করে ওনাকে দেখলেন।তারপর সবার সাথে দূরে গিয়ে বেশকিছুক্ষন কথা বললেন ফিসফিস করে।এরপর একগাল হেসে বললেন," কি টিকিটবাবু!!  খুব ভয় পেয়েছিলেন কাল!কিছু ভয় নেই।ভালো হয়ে যাবেন।কিন্তু মশাই! হাথ এ মিষ্টি কেনো? আপনাকে তো মিষ্টি খেতে বারণ করেছিলাম! কাল সারারাত পল্টু পল্টু করে চিৎকার করছিলেন কেনো? পল্টুর মিষ্টি ভুলতে পারছেন না ? তাই বলে শ্মশানে পল্টুকে খুঁজতে যাবেন!"

হিতেনবাবু তিড়িং করে উঠে বসলেন।বলে কি ডাক্তার!শ্মশান!!! সে তো মিষ্টির দোকানে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিল।পল্টুর দোকান তো অনেকদিন বন্ধ হয়ে গেছে।যাচ্ছিল বিদ্যুতের মিষ্টির দোকানে।

পল্টুর বডি তো,হিতেনবাবুই প্রথম রেল লাইনে দেখেছিল গত মাসের আগের মাসে।সুইসাইড কেস ছিল।এই ডাক্তার পোস্টমর্টেম করে।কিন্তু কিভাবে বিদ্যুতের মিষ্টির দোকানের দিকে না গিয়ে  শ্মশানে চলে গেলো,হিতেনবাবু ভাবতেই পারছেনা।

কিন্তু হিতেনবাবুর এখনও স্পষ্ট মনেআছে কাল রাতে পল্টুর সাথে কি কি কথা বলেছে! 

সবকিছু কেমন যেনো তালগোল পাকিয়ে গেলো। হিতেনবাবু তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে ফেলল।

সমাপ্ত


No comments:

Post a Comment

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...