Saturday, 5 November 2022

তারিণীখুড়ো ও কলম-চরিত মানস ! --শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।



ফ‍্যান ফিকশন--
তারিণীখুড়ো ও কলম-চরিত মানস !
--শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার।

আজ দিনটা সকাল থেকেই বেশ মেঘলা করে আছে। কাল সারারাত বৃষ্টি হওয়ায় বেশ শীত শীত ভাবটাও বসার ঘরে রয়ে গেছে। নেহাত আজ রোববার বলে ইস্কুল যাওয়াটা নেই। নইলে এই আবহাওয়াতেও বই পত্র নিয়ে সেজে গুজে ইউনিফর্ম চড়িয়ে ঠিক বের হতে হত।

আমরা বলতে ন্যাপলা, ভুলু, চটপটি আর সুনন্দ  মিলে বাধ‍্য হয়ে চটপটির নতুন  স্ক্র‍্যাবেল গেমটাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করছি আর  ঠিক সেই সময় দেখি তারিণী খুড়োর আবির্ভাব। এই বদ্ধ পরিবেশে যে ব‍্যাপারটা যে একটা ' ইয়ে ' যাকে বলে ' ফেবুউউলাআআস্' সেটা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।
......
হাতের ছাতাটা নামিয়ে রাখতে রাখতে খুড়ো বললেন, " কদিন যা বাদলা! একেবারে ঘরবন্দী হয়ে পড়েছিলাম! আজ বৃষ্টিটা একটু ধরতেই পালিয়ে এসিচি!নে একটা চিনি ছাড়া চা আনতে বল্ তো দেখি! " এই বলে খুড়ো আয়েশ করে তক্তপোশের ওপর বসে চোখ নাচিয়ে  বললেন -
" কি রে!  বুধবার তো ন‍্যাপলার জন্মদিন ছিল! ছোকরা  আমাকে ডেকেছিল বটে কিন্তু একটা জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায়..."!

ওনার   কথাটা শেষ হলনা, তার আগেই ন‍্যাপলা ঘরে ঢুকেই খুড়োকে দেখতে পেয়ে একগাল হাসি হেসে বলল, ' কি খুড়ো! সেদিন এলেন না যে বড়?আপনার  শরীর টরীর ঠিক আছে তো?...এই দেখুন বড়মামা লন্ডন থেকে এই শেফার্স কলমটা পাঠিয়েছেন! তাই ওটাই বুকে এঁটে কদিন হল ঘুরছি! "
......
কলমটা সত‍্যিই দেখতে সুন্দর। সোনালী মেটালের ওপর  দারুণ লতাপাতার কাজ করা আছে। খুড়ো অনেকক্ষণ ধরে দেখে টেখে বলল, "  এসব কলম বেশ  বাহারের বটে! আবার নিবের লেখাও ভাল! তবে  এককালে এসব নিয়ে এই শর্মারও একটা কলেক্টরস্ গুমর ছিল বৈকি! তাই  এটাকে  দেখতে দেখতে  বছর  চল্লিশের আগে একটা ঘটনা মনে পড়ল! অবিশ‍্যি তোরা যদি এখন শুনতে চাস্ তবেই না হয়..!"

খুড়োর এই এক সমস‍্যা। গল্পের লোভ দেখিয়ে সুট্ করে থেমে যান। কাজেই ভেতরবাড়ি থেকে ভজুয়াকে চা এর জন‍্য তাগাদা দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কি বা করণীয় থাকবে!
......
চা এল। খুড়ো চোখ বুজে চুমুক দিয়ে মুচকি হেসে একটা এক্সপোর্ট কোয়ালিটির বিড়ি ধরিয়ে ঠ‍্যাং দোলাতে দোলাতে বললেন, " শেক্সপিয়র সাহেবের কথাটা জানা আছে তো? হোরেশিও'র নাম করে উনি যে'কথাটা বলে গেছেন সেটা আজও একই রকম সত‍্যি। সব ঘটনার প্রচলিত ব‍্যাখ‍্যা আবার হয় না কি! "

ন‍্যাপলা ফোড়ন কাটল,  " আবার সেই ভূত টূত নাকি! এবার তাহলে  বেশ  একটু সিরিয়াস টাইপের হলে জমত না?"

খুড়ো কায়দা করে মুখটা বেঁকিয়ে বললেন, " শোন! আমি মোটেও গপ্পো বানিয়ে বলিনা! হ‍্যাঁ! তবে গপ্পের খাতিরে একটু আধটু যেটা একটু মেশাতে হয়  সেটাকে 'আর্ট' বলে বুঝলি! তাই বলে   তুই ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা বা মেরী শেলীর লেখা  ফ্র‍্যাঙ্কেস্টাইনের গপ্পে কি প্রোবাবিলিটি বা ক‍্যালকুলাস জাতীয় অংকের ফর্মূলা খুঁজবি ? তাছাড়া ওই রকম একটা গপ্পো একটা লিখে দেখাক দেখি আজকালকার কোন বোদ্ধা! হুঁঃ! "
.....
ব‍্যাপারটা বিগড়ে যাচ্ছে দেখে আমরা ওদের কাজিয়া বাধ‍্য হয়ে থামাতেই খুড়োর মুডটা কতকটা চা এর গুণে শুধরে  যেতেই উনি বলা শুরু করলেন।

" তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে থেমেছে। চারদিকে প্রচুর দেশী-বিদেশী ভাল জিনিসের মেলা। সেইসময় আমারও বয়স কম আর তোরা জানিসই যে আমি সর্বদা নতুন কোন ধান্দায় ঘুরতে ভালবাসি, তবে সেটা সেন্ট পার্সেন্ট সৎ পথেই সেটা আর নতুন করে আজ আর বলছি না। তখন আমি কলকাতার নামী নীলাম ঘর 'ম‍্যাকফার্সন ব্রাদার্স এন্ড অকশন' এর দোকানের ম‍্যানেজার। মোটের ওপর চল্লিশ টাকা মাইনে আর তার সাথে পুরনো জিনিসের সাহচর্য  (এটাই অবিশ‍্যি আসল! ) এইসব নিয়ে বেশ আছি।

আমার কাজ ছিল অকশনে তোলবার আগে জিনিসটা যাচাই করা আর মালিকের সাথে দাম নিয়ে বোঝাপড়া করে নেওয়া। সেজন‍্য আমাদের নীলামঘরে না উঠলেও কিছু কিছু পুরনো দিনের জিনিসের একটু আধটু দর্শন  আর সাহচর্য‍্য দুইই পেতাম।
......
এক বুধবারের সন্ধ‍‍্যেবেলা সবে দোকান বন্ধ করছি, এমন সময় এক বৃদ্ধ  রহমৎ খাঁ দোকানে এল। রহমৎ এর আগেও আমাদের অনেক  ভাল ঝাড়লন্ঠন বা পিয়ানো  গছিয়েছে বলে আমি ও  দিনের শেষমুহুর্তে এলেও খুব একটা বিরক্ত হলাম না।

বরং সামনের গুমটি থেকে দু ভাঁড় গরম  চা আনাতেই বুড়ো কেমন ছলছল চোখে চেয়ে রইল। আমি বললাম, ' কি হল ভায়া! শরীর খারাপ নাকি? কিছু বলবে? কোন খবর আছে?'

সে তখন  বলল যে ওর পেটে একটা টিউমার হয়েছে। তাই ডাক্তার বলেছে যে ওর আয়ু আর বেশিদিন নেই! ওদের আবার কোন ছেলেপুলে নেই। তাই বুড়ো মারা গেলে ওর বিবি আতান্তরে পড়বে। তাই আজ ও এসেছে কুড়ি টাকা চাইতে। যে' কদিন ও বাঁচবে তারমধ‍্যে অন্তত একশোটা টাকা ও বেচারা বিবির জন‍্য বাঁচিয়ে রাখতে পারলে মৃত‍্যুর পরে দোজখে গেলেও ইবলিশের হাতে আর  মুগুরের গুঁতো খেতে হবে না।
.......
শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল! হঠাৎ দেখি বুড়ো একটা কাপড়ের পুঁটলি খুলে দারুণ মিনে করা একটা সোনালী রঙের সাবেক ঢং এর  কলম বের করে আমার টেবিলে নিয়ে রাখল। বলল আমি যেন এটার বিনিময়ে যেন ওকে কুড়ি কি পঁচিশটা টাকা যদি ওকে এখন দিই!

কলমটা সত‍্যিই বেশ  বাহারের। গায়ে মালিকের নাম লেখা আছে  হার্পার না হ‍্যারিসন্ কি যেন একটা খোদাই করা ! বোঝাই যায় যে কালের প্রকোপে সেটার আজ এই দশা হলেও ওটা যে জাত কলম সেটা অস্বীকার করবে কার বাপের সাধ‍্যি!

আমি বললুম,  " কিন্তু মিঞা!  আজ তো ক‍্যাশিয়ার ক‍্যাশ  বাক্স গুছিয়ে চলে গেছে! তাছাড়া আমিও দোকানটা বন্ধ করতেই যাচ্ছিলাম। তুমি বরং কাল সকালে এস। তখন দোকানের মালকিন  জেনিফার মেমসাহেবও থাকবেন, তুমি তখন  না হয় দাম দস্তুর যা করবে করে নিও। তাছাড়া এতো  যাকে বলে জাত কলম একেবারে। দাম নেহাত কম পাবে কি?
....
বুড়ো দেখি তাও খানিক  শুকনো মুখে বসে রইল। শেষে আমার হাতটা ধরে বললে, " সাহাব আপনি ইমানদার লোক। এতদিন জিনিস কেনা বেচা করছি আপনার সাথে। আপনি আমার টাকা মারবেন না! তাই এটা আপনি বরং আজ নিজের কাছে রেখে দিন। কাল বা পরশু যেদিন আবার এদিকে আসব হয় সেদিন হয় টাকা বা কলম যেটা ফেরৎ দেবেন নিয়ে নেব। আজ বরং  ঘরে যাই। শরীরটা ভাল ঠেকছে না। এমন দামী জিনিস নিয়ে রাস্তায় ঘোরাটা সুবিধার নয়। তাছাড়া রাস্তায় আমেরিকান টমী'রা আজকাল বড় খানাতল্লাশি করে। আজ তাহলে আসি বাবু!
.....
বুড়ো চলে যাওয়ার পর আমিও দোকানটার ঝাঁপ বন্ধ করে বাড়ি ফিরে রাতে শুয়ে পড়েছি হঠাৎ প্রথমে শুনি একটা খুট্ শব্দ আর তারপর খসখস্ করে কাগজে লেখার শব্দ। চমকে উঠে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিতেই দেখলাম এক অদৃশ‍্য লেখক কোত্থেকে এসে টেবিলের ওপরে রাখা লালচে একটা ডায়েরির পাতায় চোস্ত ইংরেজীতে  কি সব যেন আপন তালে  লিখে চলেছে। যেটা দিয়ে  লিখছে সেটা একেবারে একটা নতুন হার্পার কলম! আর যেখানে লিখছে সে একশো বছরের বেশী পুরনো এক তাড়া কাগজের ওপর যা লালচে রং এর হলেও পুরনো নয়। আমি চমকে উঠে লেখাটা পড়তে শুরু করলাম।দেখি মুক্তোর মত হাতের লেখাটি যে কার সেটা অবিশ‍্যি প্রথমে বুঝিনি। সে যাই হোক! ভাল ভাষার বাঁধুনিতে এখন কলমটা লিখছে যে লেখকটি এই সামারের পর ইন্ডিয়া ছাড়তে চলেছে। প্রবল গরমে আর মশা-মাছি আর জলের কষ্ঠতে সে অতিষ্ঠ। আর তাছাড়া নেটিভদের  নিজেদের নানা টানাপোড়েন আর ষড়যন্ত্র দেখে সে বড় অবাক। কদিন আগেই নন্দকুমার বলে একজন জমিদারকে ফাঁসি চড়িয়েছেন বড়লাট হেস্টিংস।তার হাতের তুরুপের তাসটিকে দিয়েই যে পুরো কাজটা করানো হয়েছে সেটা অনেক পরে হলেও লেখকটি বুঝতে পেরেছে। যে এসব লিখছে সে নিজেও একজন আইনের ছাত্র সেকথাও সে  লিখতে ভোলেনি। সে আরও লিখছে যে পলাশীর যুদ্ধের নাটকটা একেবারে জঘন‍্য রুচির।
ক্ষমতালিপ্সু ক্লাইভ পিছনে থেকে আস্তে আস্তে নিজের কূটনীতিক বুদ্ধি খাটিয়ে এখানে ইংরেজদের আরেকটা কলোনী বানাতে চাইছে। আর যাইহোক এখানে ধান, গম আর নীল, পাট, তুলো নেহাত খারাপ ফলেনা। এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলেতে রানী এলিজাবেথকে যে আগামীদিনের সাম্রাজ্য বাড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছে, বড়লাট হেস্টিংস এখন সেটাকে সফল করতে বদ্ধ পরিকর।
....
আমি তো উত্তেজনায় যাকে বলে পুরো থ মেরে গেছি। এই কলমটা তাহলে কোম্পানির শাসনের গোড়ার দিকে কোন হোমরা চোমরা লোকের? আর তার বিদেহী আত্মা কয়েক শতাব্দীর পর এখনও তাদের করে আসা সব  অন‍্যায়ের কথা তাহলে ভোলেনি?

দেখলাম কলমটা এবারে লিখছে যে মিথ‍্যে তছরুপের অভিযোগ এনে পুরো ব‍্যাপারটা ঘটিয়েছে  লেখকটির মনিব নিজে।

খিদিরপুরের কাছে কুলিবাজার অঞ্চল, অর্থাৎ আজ যেখানে হেস্টিংস নামের এলাকা তখন সেই জায়গা ছিল লোকালয় বর্জিত। সেই নিরুপদ্রুত রাজপথেই সকলের সামনে ব‍্যাপারটা ঘটে। এলাকাটা  সেদিন ছিল লোকে লোকারণ্য। এর আগে এরকম ফাঁসি অনেকেই দেখেনি। যদিও ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে ফাঁসি দেওয়া হত রাস্তার ধারে গাছের উপর থেকে। প্রত্যেকে যাতে অপরাধীর অন্তিম পরিণতি প্রত্যক্ষ করে তাই এই ব্যবস্থা ছিল।

তাই সেদিনও  নন্দকুমারের ফাঁসিও হয়েছিল প্রকাশ্যে। কিন্তু তার জন্য একটা আস্ত কূপ খোঁড়া হয়েছিল। এ যে হাইকোর্টের রায়ে ফাঁসি। সাধারণ জমিদারি মামলা তো নয়। তাই এমন ঘটনার সাক্ষী থাকতে ভিড় ভেঙে পড়েছিল। যদিও সে মামলা শুরু হয়েছিল ১৭৭৫ সালের ১২ মে।

শোনা যায় নিজের সপক্ষে যাবতীয় যুক্তি নন্দকুমার পেশ করেছিলেন। কিন্তু বিচারপতি  তাঁর কোনো কথাতেই কর্ণপাত করেননি। হেস্টিংস  সাহেবের বিশেষ বন্ধু সেই বিচারকটি শুধু ভেবেছিলেন, কী কী প্রকারে নন্দকুমারকে শাস্তি দেওয়া যায়। ফলে অবশেষে ১৬ জুন ফাঁসির রায় বেরোল এবং ৫ আগস্ট ফাঁসির দিন স্থির করা হল। তবে এর পরেও নাকি মামলা গড়িয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। কারণ  ইংল্যান্ডের আইনে জালিয়াতির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও ভারতের হিন্দু আইন বা মুসলমান আইনে তা নয়, বরং তৎকালীন আইন অনুযায়ী কোনো ব্রাহ্মণকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেত না। কিন্তু এইসব প্রশ্ন যখন ওঠে তখন পুনরায় বিচার করার আর কোনো সুযোগই নেই। মহারাজা নন্দকুমার অনেকদিন আগেই ফাঁসির দড়ি গলায় পরে নিয়েছেন।
....
সে সমস্ত কথাই লেখক পরে জেনেছে বলে যেন এতদিন পরেও তার মনিবের আচরণের জন‍্য তার নিজের  অপরাধবোধ যেন আরও বেশী।

যদিও দেশে ফিরবে বলে ভেবেও  সে এক রাত্রে  আর থাকতে না পেরে গলার  নলি কেটে আত্মহত‍্যা করেছে আর তার গডের কাছে প্রার্থনা যে তাকে ও তার মনিবের সঙ্গদোষজনিত পাপের বোঝা থেকে যেন মুক্ত করেন।
....
আমি তো উত্তেজনায় যাকে বলে একদম ইয়ে হয়ে আছি। চোখের সামনে একটু একটু করে যেন বায়োস্কোপের পর্দা উঠে চলেছে। কবেকার সেই কোম্পানি আমলের দলিল, আজ যেন যাদুবলে আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে আমারই চোখের সামনে!

তবে যখন লেখক নিজের নাম সই করলেন তখন আমি তো যাকে বলে একদম স্পেলবাউন্ড! হাতের লেখাটা যে একদম পাকা সেটা আগেই বলেছি, দেখলাম লেখকের নাম এবারে যত্ন নিয়ে লেখা হল, 'রিচার্ডসন ফ্রেডরিক ইমপে'!

ছোকরা স্বয়ং এলিজা ইমপে যিনি এই বিচার প্রহসনের নায়ক তথা বিচারক তারই খুড়তুত ভাই। সে আইন পড়তে এসেছিল কেমব‍্রিজে তারপর দাদা'র সাথে ভারতে চলে আসে আইন ব‍্যবসা জমানোর সাথে স্বয়ং বিচারপতির পার্সনাল এ‍্যসিসটেন্ট হয়ে। তাহলেই বোঝ! সে বিদেহী হয়েও  যা যা এখন লিখে দেখাচ্ছে তা কতটা সত‍্যি!
.....
এবারে দেখলাম কলমটা তার চলা বন্ধ করল আর কাগজের বান্ডিলটা যেন উবে গিয়ে একঝলক ঠান্ডা হাওয়া খানিক এসে আমার পুবের ঘরটাকে যেন কাঁপিয়ে দিয়ে গেল, সাথে বাতিটাও যে নিভে গেল সেটাও আশাকরি তোরা বুঝতে পারছিস!

সারারাত আর  ঘুম এল না। যেন একটা ঘোরের মধ‍্যে থেকে বাকী রাতটা জেগেই কাটিয়ে দিলাম।
.....
পল্টু এবারে খুড়োকে জিজ্ঞাসা করল, " তা খুড়ো! ওই পেন টার কি হল? "

খুড়ো আবার একটা বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে বলল,
" গপ্পের মাঝে অযথা  ফোড়ন কাটা টা যে ক্রিমিনাল অফেন্স সেটাও কি তোরা ভুলে গেছিস? "

শোন তাহলে, " আশ্চর্যের ব‍্যাপার এই যে কলমটা সকাল থেকে বাড়ি থেকে একদম উধাও! অনেক খুঁজেও যখন পেলাম না  তখন ঠিক করলাম বুড়ো এলে ওকে কুড়িটা টাকা আমাকে নিজে থেকেই দিয়ে দিতে হবে। সে গরীব মানুষ, অভাবের তাড়নায়  আমাকে ভরসা করে আছে যে কলমটার বদলে যদি কিছু টাকার বন্দোবস্ত করা যায়!

যাইহোক এরপর দিন সাতেক সেই বুড়ো বা কলমের নো-পাত্তা!

আট দিনের মাথায়  কলুটোলার বোসেদের বাড়ি থেকে একটা হিগিনস্ কোম্পানির গ্র‍্যান্ড পিয়ানো নিয়ে সবে দোকানে ফিরছি দেখি একজন মুসলমাল বুড়ি মহিলা বোরখা-টোরখা গায়ে আমার টেবিলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। বললে, সে আমার নাম তার বরের কাছে শুনেছে আর তার বর এখানে অনেক জিনিস কেনা বেচা আগে করেছে বলে দোকানের নামটাও সে জানে।  আমার কেমন যেন সন্দেহ হতে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'তোমার খসমের কি নাম? "

এর উত্তরে বুড়ি যা বলল সেটা তোদের আরব‍্য উপন‍্যাসের চেয়ে কিছু কম নয়। তার স্বামীর নাম হল রহমৎ। দিন পনের  আগে সে  বুড়ো হার্টফেল করে মারা গেছে আর মারা যাবার আগে বুড়িকে বলে গেছে যে আমাদের দোকানে এসে একটা জিনিস আমার হাতে দিলে কুড়ি কি পঁচিশ টাকার একটা বন্দোবস্ত হবে। আমার তো সেটা শুনে মাথা গুলিয়ে গেল। বুড়ো তো তাহলে দিন সাতেক আগে আমার কাছে এল! সেটা তাহলে  কি করে সম্ভব?
....
এবার যা যা হল সেটা শুনে তোরা ব‍্যোমকে যাবি। দেখি বুড়ি এবারে তার  কম্পিত হাতে একটা মোড়ক খুলে পুরনো অথচ বাহারের একটা হার্পার কোম্পানির একটা ফাউন্টেন পেন আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল।

এতো  অবিকল সেই কলম যেটা মৃত‍্যুর পরে তার পুরনো মালিকের বিদেহী আত্মার মিডিয়ম হয়ে তার জীবনের একটি অনুশোচনার কাহিনি আমার সামনে খসখস করে লিখে দেখিয়ে হঠাৎ করে সে রাত্রে উধাও হয়ে গেছিল। আর সেটা অবিশ‍্যি আমায় এর আগে একবারই  দেখা দিয়েছিল দিন পনের আগে হার্টফেল করে  মৃত এন্টিক সাপ্লায়ার রহমৎ খাঁ এর বিদেহী আত্মার হাত ধরেই।

সমাপ্ত

ক্ষুধা --সুনীল কর্মকার

ক্ষুধা --
সুনীল কর্মকার 

আবার লকডাউন।আবার একুশ দিন সব বন্ধ। পেট তো মানেনা। এলোকেশী র ছটফটানি ধরে যায়।পেটের জ্বালা বড়ো জ্বালা ।এ কিছুই মানেনা।সেই কবে কন্টোলে দু্কেজি চাল দিয়েছিল।ওতে ক'দিন চলবে?গাঁ বেড়িয়ে তবুও চলছিল--সিটাও বন্ধ।ঐ হারামজাদা সিবিকদের দেখলে তার সারা শরীর রিরি করে ওঠে।দু দিন বেরিয়েছিল,মাঝ রাস্তা থেকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।ওদের কী? মাস গেলে মাইনে ঢুকছে।কে খেলো না খেলো ওদের বয়ে ই  গ্যালো।এদিকে বিদেশ বিভুঁয়ে পড়ে আছে ছেলে গুনো।ওর জন্যি চিন্তা।খপর এয়েছে  উদের কাজকাম সব বন্ধ।ট্যাকা পয়সা যা ছেলো বসে খেলে ক'দিন চলবে?ঘরেও ফেরা হছেনা।গাড়িও চলেনা । লোকমুখে শুনছে ওদিকের হাল খুউব খারাব।পটাপট মরছে।কত্তোবার বারণ করেছিল এলোকেশী যেতে , তা কতা শুনলেই না। যতো সব  সাঙ্গাৎ জুটেছে।আমোদ --আমোদ।ইবার ছেলে জব্দ।মাঝেমধ্যে ছেলের খপর পেতে ছোটে গণশার মায়ের কাছে।গণশার মা যখন তখন ফোনে কথা ক ইতে পারে।একসাথে থাকে বলেই রক্ষে।কাল সাঁঝ থেকে মন খারাপ। গনেশ ফোন করেনি ক'দিন।গনশার মায়ের তার মতোই দশা।ছেলেগুলানের কী   দশা কে জানে?
এলোকেশী পেটের জোগাড়ে  চুপচাপ সকালেই  দুকোশ হেঁটে বুধগাঁর দিকে গিয়েছিল।গাঁটা ভালো।চাষীবাসীর গাঁ।সাদা মন।একবেলা ঘুরতে পারলে ঝোলা ভরে যায়।খাও কেনে বসে বসে ক'দিন।ঝোলা নিয়ে পাঁচ বার দম নিতে হয়।আজ গাঁ ঘুরতে বেশ বেলা।চোত--বোশেখের দিন।মাথার উপর সূয্যি তড়বড়িয়ে উঠেছে।গরম বাতাস দেহি টাকে পুড়িন দিছে।দুয়োর লাগা সব ঘরেই।ডাকলে রা দেয়না।কেউ খোলে তো দেখেই মুখ বেঁকিয়ে  দুটো কথা শুনিয়ে ধরাস করে কপাট লাগিয়ে দেয়।এমন তো ছেলোনা কুনোদিন ।কী যে এলো দ্যাশে? রোদে গরমে নাজেহাল হয়ে গাঁ ছেড়ে ধরম তলার বটের ছায়ায় এসে দম নেয় এলোকেশী।কাপড়ে মুখটা মোছে।ঝোলাটা তুলে আন্দাজ মাপে।মুখটায় বিরক্তি।মনে মনেই বলে কুছুই হলোনা।
            বিজলী ও ফিরছে।বদমাসটা লুকিনে এয়েছে। পাশাপাশি ঘর। ছোটবেলায় বেধবা হয়ে গাঁয়েই থাকে । ছেলেপিলে নাই।কমবয়সে ঝাঁকালো দেহিটা নিয়ে কী দেমাক ।গরবে পা পড়তো না । কতো নাগর এলো --গ্যালো।আর ইখন?কেউ পোছেনা ।শ্যাষের দিনের ল্যাগে ভাবতে হয় ।এলোকেশী বিজলীর উদ্দেশ্যে বলে- এই তুর কাজ?আসবি  জানলে খপর খান দিলে আমি তুর ভাত কেড়ে খেতাম?
--লা --লা মাসি তু উল্টো বুঝিস ।আমি ভাবলুম তুর ব্যাটার পয়সা --ডাকলে যদি মানে লাগে।তু তো সবদিন যাসনা  -তাই--এলোকেশী অভিমান নিয়ে বলে --হুঁ তাই তো বলবি।ব্যাটা দ্যাখছিস।উযি কী করচে কুনো খপর রেখেছিস?
--বিজলী মাসীর কাছাকাছি হয়ে বলে --কে কার খপর রাখে বল।আমার যি কী হছে সে আমিই জানি বলে ঘরের দিকে পা ফেলতেই এলোকেশী  বলে "অতো দেমাক দেখাস না লো।আমি যাবো না নিকি?
-- না না তা লয়,শুনলুম গাঁ য়ে কারা চাল ,মুড়ি দিছে।আগে জানলে কে আসতো মরতে?কুছুই তো পেলুম না।তু রয়ে বসে আয় বাপু--আমি চললুম।উরা কী আমার লেগে বসে থাকবে?আমার ই গরজ -- বলে হাঁ টতে লাগে ।খবরটা শুনে ঝোলাটা তুলে এলোকেশীও জীবনের বিকুলিতে বিজলীর পেছন ধরে।ওকে পারবে কেনে।গতর খান এখনো তো তেমনিই।বিজলী কিছুক্ষণেই এলোকেশী র চোখের আড়ালে হারিয়ে গেল।
            রাস্তা যেন আজ শেষ হতে চায়না।পড়ি মরি করে এলোকেশী সোজা না গিয়ে মাঠের আলধরে হাঁ টতে থাকে।সোজা উঠল গিয়ে বাঁধের পাড়ে। বাঁ ধ পেরোলেই গাঁ।গাঁ ঢুকতেই গোঁসাই থান।ওখানে গিয়ে দম নিল। কেেউ নেই।গেরস্তপাড়া ছেড়ে
মেটে পাড়াতে ওঠে।মেম্বর সুদেবের ঘরের দরজায় গিয়ে সুদেবের নাম ধরে ডাকে।ভিতর থেকে জবাব আসে --ঘরে নাই।ওখান থেকে আদিবাসীপাড়ার দিকে এগোতে থাকে।আর হাঁ টতে পারছেনা ।হাপিয়ে উঠেছে ।বিধ্বস্ত শরীর টা আর সাথ দিচ্ছেনা।ক্ষুধা--তৃষ্ণায় একশা হয়ে গেছে।কোথাও কারোর দেখা না পেয়ে ঘরের দিকে ফেরে।হাঁটতে হাঁটতে শরীর টা কেমন করে উঠতেই চোখ দুটিতে আর কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা।  অন্ধকার চারদিক ।সামলাতে নাপেরে বসে পড়ে।বসে থাকতে থাকতে দেহখান গড়িয়ে পড়ে ধূলোয়।মৃত্তিকার পাঁজর ভেদ করেএফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে অগ্মির ফলা ।এলোকেশীর শরীর নিয়ে চলছে রুদ্রের তাণ্ডব নৃত্য।এলোকেশী চেতন জগতের বহু ঊর্ধে চলে গেছে।
      অনেকপরে অপরাহ্নের ম্রিয়মান আলোয় সংজ্ঞাহীন অবস্থায়  অচেনা কাউকে পড়ে থাকতে দেখে কৌতূহলী মানুষের চোখ ঘোরাফেরা করে।আড়ালে আবডালে আলোচনা  চলে।কাছে যাবার সাহস হয়না।জীবিত না মৃত কারো বোঝার ক্ষমতা নেই।হৃদস্পন্দন বোঝা যায়না।উবুড় হয়ে থাকায় চেনা যায়না।এগাঁয়ের না অন্য কোথা থেকে এখানে মরতে এসেছে কে জানে?সবার সামাল সামাল অবস্থা।নানা রকম আলোচনা চলে,করোনার ভয়বহতা  বিষয়ে সর্বশেষ আপডেট,সরকারের সাফল্য ব্যর্থতা বিষয়ে ছোটখাটো বক্তৃতাও শুরু হয়ে গেছে।চীনের বদমাইশি বিষয়ে সবাই একমত হলেও রোগ নিয়ন্ত্রণে ওরা যে কতো তৎপর  আর আমাদের দেশ কতো যে পিছিয়ে তা নিয়ে বিতর্ক চলতে চলতে কখন নীরবে গুটি গুটি পায়ে সন্ধ্যা রাণী নেমে এসেছে চরাচর জুড়ে ।
এলোকেশী তখনো পড়ে।আধ ময়লা তেনা কাপড় আর পাশে পড়ে থাকা ঝোলাটা দেখে অনুমান ভিখারীই হবে।হয়তো এ গাঁয়ে এসেছিল ভিক্ষার সন্ধানে।মৃত না জীবিত কেউ জানল না,জানার আগ্ৰহ দেখালো না।
       কেউ থানাতে খবর দেওয়ায় পুলিশ লাশের সন্ধানে যখন গাঁ য়ে ঢুকল তখন বেশ রাত।বৈশাখের মেঘ ঘন হয়ে আসায় মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক তার সঙ্গে গুরু গুরু গর্জনের সঙ্গে বৃষ্টি ধারায় কিছুটা হলেও শীতল বাতাসে গরমের হাসফাস অবস্থা কেটে যাচ্ছে।গাড়ির শব্দে কৌতূহলী মানুষের  ভিড় বেড়েছে। পুলিশ অতি সতর্কতায় লাশটিকে উঠানোর চেষ্টা করতেই এলোকেশী নড়ে ওঠে।অতি কষ্টে গলা থেকে বেরিয়ে আসে কয়েকটা শব্দ--বাবারা আমাকে দুটো ভাত দাও কেনে।খু --ব ক্ষি--দে --।সারাদি-ন ঘুরে --ঘু-রে আঃ --আঃ দু--টো ভা--ত --
ওদের কাছে ভাত ছিলনা --ছিল  করোনার 
লাশের খবর।

সমাপ্ত
             

বাঞ্ছারাম ও ননীর মা--শংকর ব্রহ্ম



বাঞ্ছারাম ও ননীর মা--
শংকর ব্রহ্ম
-----------------------------------

         সান্ধ্য ভ্রমণ সেরে ক্লান্ত হয়ে চায়ের দোকানে ঢুকে বেঞ্চিতে বসতে বসতে বললাম, "একটু জল খাওয়া তো বাবা বাঞ্ছারাম। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে!"
           বাঞ্ছারাম এক গ্লাস জল এনে দিয়ে বলল, "লিজিয়ে, খাইয়ে! জল খাইয়ে!"
          গ্লাসটা ওর হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে দেখলাম, ওর চোখে মুখি ফিচকে হাসি । দেখে অবাক হয়ে জানতে চাইল, “ব্যপার কি? হাসির কি হল আবার?”
        “বাঙালী লোগ খানা ভি খাতা হ্যায়, পানি ভি খাতা হ্যায়!” বলেই ব্যাটা ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে লাগলো।
          ননীর মা ঠিক ঐ সময় ননীকে কোচিং ক্লাসে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল। আমাকে সে বেশ ভক্তি শ্রদ্ধা করে। তাই, আমার সঙ্গে বাঞ্ছারামের ছ্যবলামী করা দেখে পিত্তি জ্বলে গেল তার। সে বলল, “কেন রে মুখপোড়া! বাঙালীরাই খালি জল খাতা হায়? খোট্টারা নেই খাতা - জল ছাড়াই বেঁচে থাকতা হায়!”
          বাঞ্ছারাম তাকে বুঝিয়ে বলল, “পানি খায়া নেহি যাতা, পিয়া যাতা হ্যায়!”
“অ, তাই বুঝি! তা খাওয়া আর পিয়ার মধ্যে তফাৎ কেয়া হায় ভাই? বুঝাকে বোল দেও!”
        তফাৎ যে আসলে কি সেটা সে বেচারাও জানতো না, তাই উত্তর খুঁজে না পেয়ে কিছুক্ষণ তোতলাতে তোতলাতে শেষে বলল, “খানেকা মৎলব চাবা চাবাকে খানা। পীনে কি চিজ্ চাবায়া নেহি খাতা!”
           ননীর মা তা শুনে বলল, “বুঝলাম। না চিবিয়ে গিলে খাওয়াকে পিনা বলে। তা ভাই ট্যাবলেট, মানে দাওয়াইও তো জলের সাথে গিলকে খাতা হায়। তুমলোগ দাওয়াই খাতা হায় না পিতা হায়?”
           কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে, মাথা মাথা চুলকে বাঞ্ছারাম বলল, “দাওয়াই লেতা হ্যায়!”
           এবার ননীর মায়ের হাসি চাপার পালা। বলল, “বাঃ, প্রথমে খাতা হায়, তারপর পিতা হায়, শেষে কিনা লেতা হায়। হায় হায় হায়, আর কত রঙ্গ দেখায় গা ভাইয়া? ...... আচ্ছা, ঘি, মাখন, এগুলো তো’ চিবাতা নেহি, তাহলে এগুলো কি খাতা না পিতা, নাকি লেতা?”
              বাঞ্ছারাম নার্ভাস হয়ে মনে মনে হিসেব করে বলল, “চিবাতা নেহি! ইসকা মাতলাব পিতা হ্যায়!”
           ননীর মা দু হাতের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, “ তুম ঘণ্টা জানতা হায়, সামঝা? এগুলো সবই খাতা হায়। ঐ গানটা শুনা নেহি , ‘ম্যায় নেহি মাখন খায়ো’। তুম শুনা নেহি এ গানা?”
            বাঞ্ছারাম হার স্বীকার করে নিয়ে ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “জী!”
        “সুতরাং হাম জল চিবাকে খায়গা না গিলকে খায়গা, সেটা হামারা মর্জি। তুমহারা আপত্তি করনে কা কোন হক নেহি হ্যায়, সামঝা!”
           " জী সামঝা " বলে বাঞ্চারাম হার স্বীকার করে নিয়ে, মুখ কালো করে দোকানের ভিতর ঢুকে পড়ল।
             ননীর মাও ননীকে কোচিং ক্লাসে পৌঁছে দিতে চলে গেল।
              আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। জল খেয়ে নিয়ে, এককাপ চায়ের অর্ডার দিলাম।

-----------------------------------------------------

Friday, 4 November 2022

পাকচক্র--জয়িতা ভট্টাচার্য


পা
কচক্র--
জয়িতা ভট্টাচার্য 

পর্ণা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে হাঁটছে।রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাত, মিনিবাস ট্যাক্সি আর উবের,অফিস ফেরত এবং হকার সব পেরিয়ে একমনে হাঁটছে।মাথার মধ্যে তুফান চলছে।কান দিয়ে গরম হল্কা আর মাঝে মাঝেই চোখ মুছে নিচ্ছে সে। তিন রাত ঘুম নেই ,খাওয়া নেই,তবু পুরো দিন অফিসে।ফাইলের পর ফাইল,কর্পোরেট সংস্থার কোম্পানি সেক্রেটারি সে।দম ফেলার সময় নেই।তবু, মাথার ভেতর ঘূণপোকা। মানুষ প্রেমে পড়লে ভিখারি।কোনো ডিগ্রি কোনো স্মার্টনেস কাজে লাগে না।নিজের ওপর ঘৃণা হচ্ছে তার।কেন সে এইভাবে নিজের দিন নষ্ট করছে।অংশু।তার প্রেমিক।গত পাঁচ বছর তার সঙ্গে সম্পর্ক।কখনও আদরে পাগল করে দেয় আর মাঝে মাঝে যেন চিনতেই পারে না।অংশু তার স্বামী নয়।তার স্বামী অমিতেশ।মরে গেছে সে।মরে গেছে কথাটাই যুতসই।বিয়ের তিনবছর পর শরীরি আহ্লাদ ভেঙে খাট থেকে মাটিতে পা রেখে দেখেছিল একটি মাতাল ও চরিত্রহীন লোক।মদ জুয়া রেস হেন নেশা নেই সে করে না।বিবাহসূত্রে পাওয়া বনেদি বংশ ,একটি ছেলে আর কিছু লৌকিকতা ভারবাহী গাধার মতো টেনে নিয়ে চলেছে।হাজার একটা সমস্যার মধ্যে একদিন আচমকাই অংশু জীবনে।তার ছায়া তার আনন্দ। একটু বেশি আদিখ্যেতা করে ফেলেছে পর্ণা।রাগে দুঃখে হতাশায় পর্ণা গাড়িতে ওঠে।অনেক সন্ধ্যা অবধি বসে আছে স্থির হয়ে সে।একদৃষ্টে দেখছে জল।কমপ্লেক্সের পেছনের পুল,বাগান,বড় বড় গাছ।একটা ডাল ভেঙে জলে ফেলে দেয়।আকাশে ফুটফুটে সদ্য মামা হয়ে যাওয়া চাঁদ।পেরেছে পর্ণা।পারতে তাকে হবেই।আর নয় এই অবমাননা। 
জলে ভেসে ভেসে ভাঙা ডাল চলে যাচ্ছে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই।পর্ণা হাল্কা নিঃশ্বাস ফেলে।
লিফ্টের দরজা খুলে ঘরে এসে চালিয়ে দেয় এসিটা।
ফোনের সুরেলা গলা শুনে হাল্কা চালে তুলে নেয় মোবাইল। 
ফোন নয় ওয়াটস্যাপ। 
চা বসাও তাড়াতাড়ি।পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঢুকছি পার্ক করে।
কোথায় যেন কারা ঝাড়লন্ঠন জ্বেলে দিচ্ছে।
দরজা খুলবে না আর পর্ণা অংশুকে কিছুতেই। 
পাখির ডাক,দরজাটা মেলে ধরছে ডানা পর্ণা আনলক করে।

সাবিত্রী দাসের গল্প--যে গল্প লেখা হয়নি ও আহ্বান



সাবিত্রী দাসের গল্প--

যে গল্প লেখা হয়নি ও আহ্বান

    কেয়া বলেছিল সমীর কে-'আমাদের দুজনকে নিয়ে একটা গল্প লেখ না! সে গল্প সমীর আজও লিখতে পারেনি, আসলে  তা লেখার ক্ষমতাই  আজ আর নেই। তখন ছিল,  অসাধারণ লেখার ক্ষমতা ছিল  তার ! সত্যি কথা বলতে কী সেদিন ছিল না সময় ।  সদ্যবিবাহিত সমীর কেয়ার স্পর্শে, গন্ধে, দিশাহারা  দিন কাটাচ্ছিল।দিনরাত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল তাদের । ভেসে যাচ্ছিল ভালোলাগায়,  ভালোবাসায়। ভেবেছিল ভালোবাসার সৌরভটুকু বুকের  মধ্যে  ভরে নেবে, তারপর!  লিখবে তাদের উন্মাদনার গল্প, উদ্দাম ভালোবাসার গল্প।  তা রয়েছে বৈকি! আজও সেই সৌরভ রয়েছে বুকের ভেতর ।  সেই সুখ-স্মৃতি গুলি  মণিমুক্তার  মতো আজও রয়ে গেছে  বুকের ভেতরে, একান্ত  সংগোপনে।
     জীবন  থেকেই  গল্প জন্ম নেয়। জীবনের চলার  পথে  প্রতিটি বাঁকে বাঁকে কতই না রোমাঞ্চকর  অভিজ্ঞতা! তা সেই অভিজ্ঞতা গুলো যে আলোর রোশনাই হয়ে  আলোয় আলোয় ভরিয়ে  দেবে, ভাসিয়ে  নিয়ে  যাবে সুখের  সাগরে  কিংবা  গল্পের  মতো  মিলনাত্মক হয়ে উঠবে তা তো  আর  সবসময় হতে পারে না । হলোও না, চারবছর  সংসার  করার পর কেয়া যখন মেণ্টাল  অ্যাসাইলামে চলে গেল , সেই জীবন  জীবন হয়ে উঠতে  পারলো না, সে গল্পও আর দানা বাঁধতে পারলো না কিছুতেই ! কেমন যেন ছড়িয়ে গেল।নিঃসঙ্গ জীবনে কেয়ার একাকীত্ব টুকুই  কাল হয়েছিল তাদের  জীবনে।সন্তানের জন্যও আকুলতা কম ছিল না! সমীর  কাজের চাপেও বটে কিংবা যে কারণেই হোক, ঠিক সেভাবে কেয়াকে বোঝার চেষ্টাও করেনি কোনোদিন।  একটা ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে দিয়ে পার হচ্ছিল কেয়া। একদিকে একঘেঁয়ে দাম্পত্যের দায়বদ্ধতা, কেয়ার একাকীত্ব আর সমীরের নির্বিকল্প ঔদাসীন্যই কেয়াকে অনিবার্য পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছিল ক্রমশ। তাই কেয়া অ্যাসাইলামে যাওয়ার পর সমীর যখন উপলব্ধি করতে পারলো ছিটকে পড়লো, পড়লো মুখ থুবড়ে । যন্ত্রনা বিদ্ধ পশুর মতো কাতরাতে কাতরাতে সেই রক্তচোঁয়ানো ব্যথা   কোনোমতে বুকে  সয়ে নেওয়া গেলেও লিখতে বসলেই চুইয়ে পড়া রক্তে বার বার খাতার পাতা  গেছে  ভিজে, আর প্রত্যেক বার  নূতন করে  রক্তাক্ত   হয়েছে হৃদয় ! বাষ্পাকুল দুচোখের দৃষ্টি হয়েছে ব্যাহত।  তাই  শত  চেষ্টাতেও সে গল্প  আর কোনোদিনও লেখা হয়ে উঠল না সমীরের।


আহ্বান 
   

তখন ফাল্গুন মাস, বসন্তে ডালে ডালে আগুন জ্বেলে রাঙাপলাশ হাসছিল,শিমূল ফোঁটা ফোঁটা বুকের রক্ত দিয়ে ফুল ফুটিয়েছিল। আমের মঞ্জরী তার গন্ধ মাখিয়ে দিয়েছিল বাতাসে।বাতাস তখন উতলা হয়ে এসে কানে কানে ফিস ফিস করে বলেছিল-"আমি এসে গেছি।" বাতাসের সেই ফিসফিস,ভ্রমরের গুঞ্জরণ, কৃষ্ণচূড়ার  অশ্রুত মর্মরধ্বনি বুকের গভীরে এসে শুনিয়ে গিয়েছিল প্রেমের মর্মগাথা ! অব্যক্ত প্রেমের বার্তা অযুত তরঙ্গে আছড়ে পড়েছিল বুকের ভেতর।  তবুও মন  ছিল নিরাসক্ত ।   বিয়ের পর সংসারে মন বসাতে পারেনি তখনো ।পারবে কী করে! বুকের  ভেতর  সেই আহ্বান! ভোলে কি করে! অস্থির  হয়ে ওঠে  তার মন । কেউ একজন তো একটানা ডেকেই চলেছে সেই কবে থেকে! স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে এসেছে শ্রীক্ষেত্র পুরীধামে। সমুদ্রের দিকে  চেয়ে চেয়ে দেখে আর মুগ্ধ হয়। বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন বলে ওঠে- 'শেষমেশ এলে তাহলে!'
কিছুতেই বুঝতে পারে না এমন কেন হচ্ছে! 
হোটেলে ফিরে পরিচ্ছন্ন হয়ে জগন্নাথের মন্দিরে ঢুকতেই  অপার্থিব একটা শিহরণ  ছড়িয়ে পড়ে  শরীরে। নির্নিমেষে চেয়ে থাকে জগন্নাথের মূর্তির দিকে। বুকের  ভেতর  হাহাকার জেগে ওঠে  তুলির,  দুচোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। ভিজিয়ে দিয়েছে বুকের আচ্ছাদন। তুলি বোঝে এতদিন কে ডাকছিল তাকে! 
       রাতে স্বপ্ন দেখে আলোয় আলোময় এক দেবতনু,তাকে বলছে- 
 'আজ বসন্তে এসেছো !  অপরিচয়ের আঁধার যে কাটলো না এখনো ,ভোর হবে কি করে!' 
তুলি বলে -'বারে, সব দায় বুঝি আমার !'
সেই দেবতনু বলে-  
'দেখো একদিন   সহস্র  শৃঙ্খল দিয়ে গাঁথা সব প্রাচীর যাবে ভেঙ্গে । রাঙা পলাশের আগুনে ডানায় ভর করে তোমার কাছে ঠিক পৌঁছে যাবে আমার অব্যক্ত প্রেম।সময় হয়ে এসেছে। '
 ঘুম ভেঙেছে তুলির, বড়ো প্রসন্ন মন নিয়ে  ঘুম ভেঙেছে আজ প্রথমবার।

         **********

অখন্ড অবসর গল্প---রানী সেন

অখন্ড অবসর  গল্প---  
রানী সেন 

        নবকমল বাবুর চাকুরী থেকে অবসরের দিন আজ।অফিস অ্যাকাউন্টান্ট ছিলেন তিনি। বিদায় সম্বর্ধনার জন্য অফিস শেষে সবাই জড়ো হয়েছে অফিসের সভা ঘরে। এখন শুধু বড় মেজো সেজো ছোট আধিকারিকদের আসার অপেক্ষা। ওনারা এলেন তারপর সহকর্মীরা একে একে প্রত‍্যেকেই নবকমল বাবু সম্বন্ধে খুব ভালো ভালো প্রশংসনীয় বাক‍্যের বন‍্যা বইয়ে দিতে লাগলো। নবকমল বাবুর মনে মনে খুব হাসি পাচ্ছে যারা এতদিন তার আড়ালে নিন্দা সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিয়েছে তারাই আজ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তবে নিজের কাজের দিক থেকে উনি একশো শতাংশ সৎ, এটুকুই নিজের সান্ত্বনা।কি অফিস কি নিজের জীবন কখনওই তিনি অন‍্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেন নি।অফিস অন্ত প্রাণ ছিল তার। চাকুরী জীবনে তিনি কোনো ছুটি নেননি। এমনকি ছুটির দিনেও অফিসে এসে কাজ করেছেন। সময়ের অভাবে বাড়ির কাজের দিকে কখনোই নজর দেননি এজন্য গৃহিণীর অভিযোগের অন্ত নেই। সম্বর্ধনা শেষে ঢাউস ফুলের তোড়া মিষ্টির বাক্স আরো অনেক কিছু উপহার নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। 
 এখন আর অফিসের তাড়া নেই।আগামীকাল নতুন বছর শুরু। ওনার জীবনটাও আগামীকাল থেকে নতুন ভাবে শুরু হবে। প্রয়োজন মতো গৃহিণীর সাথে কাজে হাত লাগাবেন। এখন থেকে তার অখন্ড অবসর।

কৌস্তুভ দে সরকার--শোভাযাত্রা



শোভাযাত্রা--
কৌস্তুভ দে সরকার

শোভাযাত্রা শুরু। সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম হাতে ডিএসএলআর নিয়ে। আমার কাজ হল রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ভিড়ের হুল্লোড়ের নাচগানের ছবি তোলা।
প্রতিটি লরিতে ডিজে । কে কাকে টেক্কা দেবে সাউন্ডে ঝাঁঝে ঝাঁকিয়ে দেওয়ায়। গাড়ি এগোচ্ছে স্লো মোশনে কচ্ছপের মত। 
হাঁটতে অনভ্যস্ত কিছু বাচ্চা ও মহিলারা বসেছে ট্রাকে। সবার পিছনে বেচারি ঢাকি একাই। তার সাথে এদিন সঙ্গ দেবার কেউ নাই।
প্রশেসনকে যে বা যারা গাইড করছে তারা পাজামা পাঞ্জাবিতে বেশ চোস্ত  সেজে কেতাদুরস্ত ভাবের হলেও মুখে একটু অন্যরকম কেমন যেন গন্ধ টের পাওয়া গেল। দু-একজন সামনে এগিয়ে এসে করমর্দন যে করলেন। তারা খুব শৃঙ্খলা পরায়ণ যেন আজকে সবাই । তাদের মধ্যেই পাড়ার সেরা দাদা গোছের একজন প্রায় গৌর নিতাই সেজে নাচের আসরে কেমন টালমাটাল। ভাবটা এরকম যেন তাকে ছাড়া পূজোই হত না এবার। আর পূজোয় এত চাপ পড়েছিল, এত ধকল গেল তার উপর দিয়ে যে সেই লোড সইতে সইতে আজ সে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত একপ্রকার। ওদিকে পাড়ার মহিলারা দেদারে নাচছে, উল্লাল্লা! উল্লাল্লা!
দু-দশ টাকাকে কোনো আমল না দিয়ে আজকে দেদারে মানুষ এটা সেটা কিনে খাচ্ছে। দেখলাম ভিড়ের মধ্য থেকে ম্যাজিক শো-এর মত যেন নাচিয়েদের গায়ে বৃষ্টির জল পড়ল। প্রথমে ভেবেছিলাম পুজোর শান্তিজল বা গঙ্গাজল হবে। তারপর সত্যিটা দেখে চক্ষু চড়কগাছ। নাচের উত্তেজনার মাঝেই কেউ কেউ বোতলে জল খেয়ে সে জলেরই বাকি অংশ ছিটিয়ে দিচ্ছে সবার উপরে। হটি এবং নটিদের বেশ ভালোই লাগছে তাতে। কারোর কপালে ফেট্টি, কারো হাতে রিবন। জিন্সের প্যান্ট, গেঞ্জি, জামার বোতাম কোমরের দিকে খুলে নাভির ওপরে বাঁধা। কিছুটা গরম থেকে স্বস্তি মিলছে।
মোড়ের মাথায় এসে দেখি, মোড়ের ভিড়ে নিজেদেরকে আরো হাইলাইট করে তুলতে গাড়ি প্রায় দাঁড়িয়েই পড়লো কিছু সময়। সেই ফাঁকে ইমিটেশনের মতো কিছু ছেলেমেয়েকে সামান্য জিরিয়ে নিতে দেখা যাচ্ছে। অনেকেরই টলোমলো পা, দেহমনে ব্যালেন্সের ভীষণ অভাব, কপালে দেওয়া দুর্গার সিঁদুরের টিকা গলে ঘামে ভিজে চোখ লাল মুখ লাল। এরই মধ্যে রাস্তার পাশের দোকানের দিকে ছুটে কেউ রাজনিবাস, কেউ খৈনি, বিড়ি, সিগারেট কিনে আনছে ছেলেদের দল। প্যাকেট ছিঁড়তে ছিঁড়তে মুখে পুরে নিতে নিতে শশব্যাস্ততায় ঢুকে যাচ্ছে ভিড়ের ভিতর। তারপর বিলিয়ে দিচ্ছে একে ওকে। ইতিমধ্যেই কোনো কোনো ভিড় থেকে হঠাৎ থানা-পুলিশ গন্ডগোলের খবর ভেসে এল। সবার সেদিকে অবশ্য ভ্রূক্ষেপ নেই, যার যার তারা তারা সামলে নেবে গোছের। আজকের দিনের জন্য উচ্ছাসে ভাটা পড়ুক কেউ একমুহূর্তও চায় না। 
ডিজে একটু থেমে আবার নতুন গান শুরু হতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে নাচছে সবাই । নাচিয়েদের মধ্যে বয়স্ক বুড়োর সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে, তবে বয়স্কা মহিলা কিছু দেখলাম কেমন দমকে দমকে চকিত চমকে নেচে উঠছেন। তারা অনেকেই প্রায় চল্লিশোর্ধ গৃহবধূ হবেন। অনেকে সদ্য বিবাহিত, অনেকে সস্ত্রীক বাচ্চা নিয়েও। অনেকের দুহাত তোলাই থাকছে শূন্যে, অনেকের দুহাত সামনে। যাদের দুহাত পেছনে, তারা মনে হয় বক্ষের ইশারায় সুধী দর্শকদের আকৃষ্ট করছেন। সস্তায় মানে বিনে পয়সায় এত নাচ দেখার আনন্দ নিল ষোলো থেকে সত্তর, আশি থেকে আট সকলেই। নাচের ভেতর স্বপ্ন, নাচের ভেতর উদ্দামতা, যৌবন, জ্বালা, যন্ত্রণা, দুঃখ, কষ্ট, স্নেহ, ভালোবাসা, দয়া, মায়া, ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য, ধর্ম, বিজ্ঞান, সংসার, সভ্যতা, আচার, ব্যবহার সব ঝরে পড়ছে একসাথে। যেন এটাকেই ঐতিহ্য করে নিতে চায় বাঙালি। প্রতিমার ভিড়ের ডিজের নাচের বেশকিছু ছবি ভিডিও তুললাম। তারপর ভিড় এড়িয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াতেই দেখি ছেলে ফোন করে ডাকছে, অনেক রাত হয়েছে, বাড়ি এসো। 
বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকে শোভাযাত্রার ভিডিওগুলি ল্যাপটপে নিয়ে দেখা শুরু করতেই ছেলে এসে বলে, বাবা, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? মাকে সঙ্গে না নিয়েই ফিরে এলে? 
অমনি চমকে দু-পা পিছিয়ে বললাম, সেকি, তোর মা তো আমাকে বলে বাইরে যায় নি! আর এখনো ফেরেনি?
তারপর স্ক্রিনে চলে আসা ভিডিওর দিকে তাকিয়ে ছেলে বলে, "ওই তো মা। তুমি তো মায়ের নাচের ছবিও তুলেছ। আচ্ছা বাবা, সত্যি করে বলোতো, কোনো নেশাবস্তু না খেলে মা কি ঐভাবে অতটা রাস্তা নেচে নেচে যেতে পারতো?"
ছেলের প্রশ্ন শুনে আমি থ।

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...