Friday, 4 November 2022

উজ্জয়িনী--অঞ্জলি দেনন্দী, মম

উজ্জয়িনী--
অঞ্জলি দেনন্দী, মম

দিল্লী থেকে বেড়াতে গেছি উজ্জয়িনী, মধ্যপ্রদেশে। ট্রেন থেকে নেমে আগে থেকে ঠিক করে রাখা রেল রিটায়ার রুমে ঢুকলাম। স্নান সেরে পায়ে হেঁটে পৌঁছলাম বাবা মহাকাল দেবের মন্দিরে। অনেক দূর থেকে দর্শন ও পূজো করলাম। কাছে যেতে পারলাম না, অনেক টাকা লাগে যে। এরপর একটি গাড়ি ভাড়া করে লোকাল ট্যুর করলাম। নবগ্রহ মন্দির। যন্তর মন্তর। আরো অনেক মন্দির ও জায়গায় ঘুরলাম। ইতিহাসের বিক্রমাদিত্য ও নবরত্ন সভায় পৌঁছে গেলাম। বিকালে যখন রেল স্টেশনে এসে আমাদের রুমের সামনের বারান্দা থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে আছি, তখন দেখলাম অগণিত টিয়া পাখি, গলা ছেড়ে চেঁচামেচি করছে। সারাদিনের জমানো কথা উজাড় করছে ওরা। আমি অবাক হলাম। এতো মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরে মনটা খুব আনন্দে ভরে উঠলো। এরপর পোহা খেলাম। পরের দিন ফের দিল্লীতে ফিরলাম। ওখানে অনেক ছবি তুলেছিলাম। এখানে এসে সব ফেসবুকে পোস্ট করলাম। অনেক ভিডিও করেছিলাম। সেগুলি যে কতবার দেখেছি আর আবার ওখানে মনে মনে মনে পৌঁছে গেছি। জয় বাবা মহাকালেশ্বর!

জড়োয়ার ঝুমকো--কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক)

জড়োয়ার ঝুমকো--
কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক)        

              পপি নিঃশব্দে  শাশুড়ির ঘরে ঢুকেই  দরজাটা আটকে দিল।  বাড়ি ফাঁকা। সবাই তুলতুলির বিয়ের বাজার করতে গেছে। 

               কিছুদিন আগেই শাশুড়ি গত হয়েছেন। উনার ঘরটা  ফাঁকাই পড়ে থাকে। এমনিতেই ব্যক্তিত্বময়ী শাশুড়ির ঘরে  বৌমারা  ঢোকেই  না কোন প্রয়োজন ছাড়া। 

            আজ  জীবনে  পঞ্চমবার উনার ঘরে প্রবেশ করতেই বুকটা ধড়াস করে উঠল।  শরীর বেয়ে এই শীতেও দরদর করে নামছে নোনা ঘাম। পালঙ্কের পাশে বহু যুগের সাক্ষী ভারী  সিন্দুকটা সেদিনের মতন আজও বিশ্বাসভঙ্গের জন্যে পপির দিকে ঘৃণাভরে তাকিয়ে বিদ্রূপ করছে।

              ঘড়িতে  পাঁচটার ঘন্টা বাজল। পপি  চেয়ারটা পালঙ্কের উপর রেখে তাতে  উঠেই শ্বশুর মশাইয়ের দাদুর  ছবির পিছনের  কুলুঙ্গিতে হাত রাখল। একটা কিছুতে স্পর্শ হতেই শরীরে যেন হাজার ভোল্টের শিহরণ! কুলঙ্গিটা পোকা মাকড়,  মাকড়সার জালে পূর্ণ। ফটোর আড়ালে  বহুদিন কেউ ওর  খোঁজ  না রাখলেও পপির নজরে ছিল।

              প্রাপ্ত জিনিসটা কোমরে লুকিয়ে ছলছল চোখে শাশুড়িমার ছবির সামনে দাঁড়াতেই পপির  ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল,"মা,  আমায় ক্ষমা করবেন। আসলে বড়বৌমার কোন  দোষ ছিল না.........."

               কথা শেষ হয়না। গলা বুজে আসল শ্রাদ্ধের দিনের মতন। সেদিনও সবটা স্বীকার করতে পারেনি। একটা অপরাধবোধ.....তাই.....

                 ***********   *************

              আঠাশটা শীত পার হয়েছে। 

              আজ তুলুতলির  ছেলে উদ্দামের বৌভাত। বৌমা সানভির হাতে জড়োয়ার ঝুমকোজোড়া দিয়েই সজল নয়নে বলল,"বৌমা, এগুলোর অমর্যাদা  করোনা। এর ভিতরে অনেকের হৃৎস্পন্দন, চোখের নোনা শিশির, ভালবাসা    লুকিয়ে আছে।"

           "মা, ভীষণ দামী এই ঝুমকোগুলো......"

           "হ্যাঁ রে সানু, এখন থেকে এগুলো  তোর সম্পদ......"

              বাড়ির সব আলো নিভতেই  তুলতুলির বহু বছর আগে ওর বৌভাতে  মেজকামণির  কথাগুলো মনে পড়ছে। 

             মেজকামণির ভাইয়ের ব্যবসার টালমাটাল অবস্থা। ব্যবসা দাঁড়  করাতে টাকার ভীষণ দরকার।  ভাইকে বাঁচাতে ভাসুর, স্বামীর দ্বারস্থ হয়েও টাকার সংস্থান হলনা। শেষে সিন্দুক থেকে ঝুমকোজোড়া চুরি করে, বন্ধক দিয়ে সেই টাকা ভাইকে......।
                     সব ঠিকঠাক হলেও দোষী  হয়েছিলেন তুলতুলির মা বড়বৌমা। পৌষের রাত। উনার শালটা বাইরেই ছিল। সেটাতে মুখ ঢেকেই পপি সিন্দুকের......

               অন্ধকারে শাশুড়ির  ভারী, চওড়া   শালটা দেখেই চিনে ফেলেছিলেন। বুদ্ধিমতী,  তাই চেপে গিয়েছিলেন। আমৃত্যু বড়বৌমাকেই  চোর হিসেবে  জানলেন। সেটা একমাত্র  পপিই বুঝেছিল। 

            ভাইয়ের দেনা মিটতেই পাপিয়া ঠিক করেছিল ঝুমকোজোড়া ফিরিয়ে এনে  সিন্দুকেই রাখবে। সাহস হয়নি,  তাই অগত্যা কুলুঙ্গিতেই.....

             সেদিন বৌভাতের রাতে পাপিয়া তুলতুলির হাতে ষঝুমকোজোড়া তুলে দিয়ে সব স্বীকার করেছিল। তুলতুলিও ক্ষমা করেছিল তার আদরের মেজকামণিকে।

            তুলতুলির বাবার পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠদের  কেউই বেঁচে নেই।

              সদ্য শাশুড়ি তুলতুলির চোখে মাঘ শিশিরের চন্দন। 

              নোনাপানিতে ঝুমকোজোড়া ঝলমল করছে।

দিন যাপন--রবিরাম হালদার

দিন যাপন
রবিরাম হালদার
.......
একটি মহিলা প্রত্যেক দিন ভোরে উঠে,পরিবারের সমস্ত কাজ সেরে,সকাল হবার আগে কেল্লার মাছের বাজারে হাজির হয়৷তারপর কোমরে কাপড় জড়িয়ে,মাছ কিনে নিয়ে ঝুড়িতে করে মাথায় নিয়ে গ্রামের এ পাড়ায় ও পাড়ায় পায়ে হেঁটে হেঁটে বিক্রি করে৷ কোনদিন বেলা ১২টা-কোনদিন ১টা ২টা এমনকি ৩টা পর্যন্ত মাছ বিক্রি করে৷ ঝুড়ি মাথায় নিয়ে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হাক দেয় মাছ নেবে—মাছ নেবে—বলে৷ডাক শুনে কেউ মাছ নেবার কথা বললে তার বাড়ির উঠোনে গিয়ে ঝুড়িটা নামিয়ে,পাল্লাতে মাছ মেপে দিয়ে পয়সা নিয়ে আবার মাথাতে ঝুড়ি তুলে মাছ নেবে—মাছ নেবে— বলতে বলতে চলে যায়৷
                 মাছবিক্রি শেষ করে বাড়িতে গিয়ে,মাথায় একটু তেল দিয়ে দৌড়ে পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান সেরে,তাড়াতাড়ি করে উনুনে হাঁড়ি চড়ায়৷বাচ্ছাটা ভাত খাবার জন্য তখন ছটফট করে৷বলে মা পাশের বাড়ির বাপিদের খাওয়া হয়ে গেছে,আর তুমি চাল চাপাচ্ছো৷মা বলে—এই তো চাপিয়ে দিয়েছি এখুনি হয়ে যাবে৷তুই এই জল টা খেয়ে নে বাবা৷ বলে জল খেতে দেয় ৷তারপর রান্না হলে অসুস্থ স্বামী আর ছেলেকে খাইয়ে যেটুকু থাকে নিজে খেয়ে একটু বিশ্রাম করে৷আবার সন্ধ্যার আগে মধ্যবিত্তের বাড়ি ফাই ফরমাশ খাটে কটা টাকার জন্য৷এইভাবে সারাটা জীবন হাড়ভাঙা পরিশ্রম ক'রে দিন যাপন করে মেয়েটি৷একবিংশ শতকে মহিলাদের জীবন যাপনে সংগ্রাম দেখে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে৷
              একদিন বেলা ১১ টার সময় মেয়েটি আমার বাড়িতে আসে,বলে মাছ নেবে বাবু৷এই মাছগলো বিক্রি না হলে আমার হাঁড়ি চড়বেনা উনুনে৷আমি বললাম ঠিক আছে যতটা মাছ আছে আমাকে দাও৷মাছ মেপে দিয়ে পয়সা নিয়ে চলে যাবার সময় আমি জিজ্ঞাসা করি তুমি প্রত্যেকদিন কিভাবে পারো?মেয়েটি বলে না পারলে উপায় নেই,তার স্বামী অসুস্থ,ছেলেটার বই খাতা কলম ,এলাক পোশাক ডাক্তার বদ্দি ওষুধ সবই তো এর উপর৷পঞ্চায়েত বাবুরা যাদের আছে তাদের দেয় আমাদের দেখতে পায়না৷বলতে বলতে চলে গেল৷আমি অবাক হ'য়ে কথা গুলো শুনি,ভাবি এই আমাদের মহান দেশের মায়েদের অবস্থা৷একশ্রেণি অট্রালিকায় খাবার বাসি করে ফেলে দেয়,আর একশ্রেণি সেই খাবার কুকুরে মানুষে ভাগ করে খায়৷
            এই আমাদের স্বাধীন দেশ,আর এই আমাদের স্বাধীনতা৷যে মাকে ছেলের স্কুলে নিয়ে যাবার কথা,সেই মা সন্তান-স্বামীর জন্য খাবার জোগাড় করতে মাছ বিক্রি করছে৷ছিন্ন মলিন বসনে গ্রাম গ্রামান্তরে পায়ে হাঁটছে,শুধু পেটের তাগিদে৷আমার দেখা একটি মহিলার দিন যাপন লিপি রেখে গেলাম আপনাদের কাছে৷

Thursday, 3 November 2022

নিঃস্বার্থ--আরাধনা চট্টোপাধ্যায়

 

নিঃস্বার্থ--

আরাধনা চট্টোপাধ্যায়

"এই যাঃ, আবার আজকেও আমার দোকানে ঢুকে বিস্কুট নিয়ে গেলো ওই শয়তান পাগলীটা ! এই কে আছিস, ধর্ ধর্ ,ধরতো ওটাকে!"

ভোলার চায়ের দোকানে রাতে আড্ডা দিতে আসা ছেলে গুলো আজকেও তাড়া করে প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দিলো পাগলীটা কে। গত দুমাস ধরে মাঝে মাঝেই এই দৃশ্য দেখা যায় বলাগড় স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে। পাগলীটা এখানেই থাকে। তার পাগলামি বলতে শুধু নিজের সাথে বিড়বিড় করে, মাঝে মাঝে হাসে, অনেক সময় শোনা যায় তার বুক ফাটা হাহাকার ও সেইসাথে কান্না। যেন হারিয়ে ফেলা কাউকে সে খোঁজে। আজ খিদে পেয়েছিলো খুব, জ্বালা সহ্য করতে না পেরে চুরি করেছিলো একটা বিস্কুটের প্যাকেট। তাতেই এত কান্ড!এই জ্বালায় অতিষ্ঠ ভোলা পরদিন সকালেই গেলো নতুন স্টেশন মাষ্টারের অফিসে। "যে করেই হোক এই পাগলীটাকে স্টেশন চত্বর থেকে তাড়াতেই হবে। কতদিন আর সহ্য করা যায়? এভাবে কী আর ব্যবসা টেকে!! "


     বলাগড় স্টেশন এর নতুন স্টেশন মাষ্টার আনন্দ। বছর পঁচিশ এর যুবক। দুমাস হয় এখানে বদলি হয়ে এসেছে। কলকাতার ধনী পরিবারের একমাত্র সন্তান সে। একা একা অফিস ঘরে বসে মনে পড়ছে আসার সময় মায়ের বলা কথা গুলো, " দেখ বাবু, পুরোনো সব কথা ভুলে যা, তুই আমাদের একমাত্র সম্বল, কত কষ্ট করে বড় করেছি তোকে,নিজের পায়ে দাঁড়া, রোজগার কর, পরিবারে মন দে "। সেই সাথে আরও অনেক কথাই মনে পড়ছিলো আনন্দের, ঠিক এমন সময় ভোলা এসে ঢুকলো তার অভিযোগের ঝুলি নিয়ে। সমস্ত কিছু শুনে আনন্দ বলে, "ঠিক আছে ঠিক আছে, তুমি এখন যাও, আজ থেকে আমি নিজে রাতে স্টেশন চত্বর তদারকি করবো তোমার দোকানে আর কিছু হবে না, চিন্তা নেই। "


                   সেদিন ও তার পর তিনদিন পাগলীটাকে স্টেশন চত্বরে দেখা গেলো না। ভোলার দোকানে চুরি গেল না কোন বিস্কুটের প্যাকেট। পাঁচ দিনের দিন অনেক রাত্রে হঠাৎ আনন্দ শুনতে পায় বেশ কিছুটা দূর থেকে চাপা চিৎকার ও গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে। দেরি না করে আনন্দ বেরিয়ে পড়ল আওয়াজের উৎস সন্ধানে। সাথে নিলো বড় সার্চলাইট টা। কিছু দূর গিয়ে হঠাৎ মনে পড়লেো "সামনেই একটা বেআইনি মদের ঠেক আছে, কিছু দিন আগে পুলিশ এসেছিল, জায়গা টা ভালো না , আওয়াজ টা আবার ওখান থেকে আসছে না তো!! " কোন এক অজানা আকর্ষনে আনন্দ এগিয়ে চললো সেদিকে, যেন অন্তর্যামী চান সে একবার অন্তত জয় করুক তার ভয় কে, লাভ করুক জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। 


                  সেইখানে এসে আনন্দ দেখলো কিছুটা দূরে কয়েক জন মদ্যপ যুবক ঘিরে রেখেছে একজনকে। পুরুষ না মহিলা অন্ধকারে দুর থেকে ঠিক বোঝা গেল না। সার্চলাইটের আলো ফেলে আনন্দ চিৎকার করলো এই কে? কে ওখানে! কি হচ্ছে ওখানে? আনন্দের চিৎকার শুনে আর সার্চলাইটের আলো দেখে ছেলে গুলো সবাই এদিক সেদিক পালিয়ে গেল। আনন্দ দৌড়ে এসে মাটিতে সার্চলাইটের আলো ফেললো, যা দেখলো তাতে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ততক্ষণে এইসব চিৎকার শুনে আনন্দের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে ভোলা। হঠাৎ সে বলে উঠলো, "আরে স্যার, এই তো সেই পাগলীটা! ইস্! কী অবস্থাটাই না করেছে!! "

                 এখানে শুধুমাত্র আনন্দ জানে যে মৃতদেহ টি পড়ে আছে দুনিয়ার চোখে সে পাগলী হলেও তার কাছে সে তার তিতু ওরফে তিতিক্ষা। কালনায় বাড়ি। এক বান্ধবীর সূত্র ধরে ক্লাস টেন এ পড়ার সময় সম্পর্ক গড়ে ওঠে আনন্দের সাথে। গরিব গৃহশিক্ষকের মেয়ে তিতিক্ষা অন্ধের মতো ভালোবাসতে শুরু করে আনন্দ কে। আনন্দ বরাবরই একটু পরিবার মুখো। তার মা বাবার কথাই তার কাছে শেষ কথা।। আভিজাত্য ও রক্ষনশীল মনোভাবের কারণে তিতিক্ষা কে পছন্দ করতেন না আনন্দের পরিবার। কিন্তু তিতিক্ষা বিশ্বাস করতো যে আনন্দ ঠিক সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও তাকে গ্রহণ করবে। স্বপ্ন দেখতো আনন্দের পরিবার বরণ করে ঘরে তুলছে তাকে। 

                  কিন্তু বিধির নির্মম আঘাতে আজ দুমাস হয় তাদের সম্পর্কটি আর নেই। এই আঘাত নিতে পারেনি তিতিক্ষা, তাই আজ সে স্টেশনের পাগলী। মা তো জন্ম দিয়েই চলে গেছে। বাবারও প্রান কেড়েছে হার্ট অ্যাটাক। 

                  আনন্দের সামনে পড়ে আছে তিতু। নিথর নিস্পন্দ। তিতিক্ষার লেখা শেষ চিঠিটার কথা মনে পড়ছে আনন্দের, " তুমি যদি কোনদিন আমাকে ত্যাগ করো, সত্যি বলছি আমি পাগল হয়ে যাবো। তোমাকে ছাড়া আর কারও হতে পারবো না। অপেক্ষা করবো সারাজীবন, ভগবান চাইলে দেহ থেকে প্রানটা বেরোনোর সময় তুমি আমার পাশে থাকবে। *

এমন অনেক মেরুদণ্ড হীন আনন্দই রয়েছেন আমাদের সমাজে। কিন্তু ভগবান থাকেন এই তিতিক্ষা দেরই পাশে। এমন করেই জয়ী করেন তাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। 

     সমাপ্ত                   

                           

       



ফেরা--রবীন বসু



ফেরা--

রবীন বসু


অনেক ঝগড়া মারামারি তাচ্ছিল্য কটুকথা আর  চোখের জলের পর সমীর ও রূপসার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। আদালত বলে দিল, এক বছর আপনারা সেপারেশনে থাকবেন। তারপর যদি মনে করেন সম্ভব না একসাথে থাকা, তখন অ্যালিমনি ধার্য করে পার্মানেন্ট ডিভোর্স দেবে আদালত।

শেষ দেখা আলীপুর কোর্ট চত্বরে। তারপর রূপসা বাপের বাড়ির পথ ধরেছিল। যাবার সময় একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিল অবশ্য। আর তাতেই সমীরের সমস্যা। তার মনে হল, তাড়াতাড়ি করে সে কী ভুল সিদ্ধান্ত নিল! ঘাড় ঘুরিয়ে যখন দেখছিল, ওর চোখে জল তো ছিল, তার সঙ্গে আর কী ছিল সেটা আজও বুঝে উঠতে পারেনি।

এখন এগারো মাস কেটে গেছে। না ফোন, না মেসেজ। হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাটও হয়নি। অফিসের যে মেয়েটিকে জড়িয়ে তাদের সম্পর্কের অবনতি, সেই ঈশিতা এখন বিয়ে করে হনিমুনে গেছে গোয়াতে। সমীর প্রথমে ভালোবাসা ভেবেছিল। কিন্তু না, প্রমোশনের জন্য সুপারিশ ফাইলে সই হয়ে যেতেই ঈশিতার প্রেম উধাও। ধাঁধাঁ খেয়ে গেল সে। সাথে হতাশা লজ্জা ঘিরে ধরল। 

কিন্তু সাথে সাথে একটা কৌতূহল। রূপসা কি অর্ক নামে সেই ছেলেটার সঙ্গে এখন রিলেশনে আছে! ওরা কি সেই কাফেটাতে এখনও বসে! যোগাযোগের সব মাধ্যম তো ও বন্ধ করে দিয়েছে।

ওর এক বন্ধু আছে, তার নম্বর সম্ভবত ফোনে সেভ করা আছে। একবার ফোন করবে? সার্চে গিয়ে নম্বর বের করে ফোন করতে, ওপারে এনগেজড টোন পেল। ঘূর্ণি স্রোতের মতো আবর্ত সৃষ্টি হচ্ছে মনের মধ্যে। সমীর ভাবতে চেষ্টা করল, তাদের ফল্ট কোথায়? কেন তাদের সম্পর্কের এই অবনতি? যে অপবাদ সে ঈশিতাকে দিয়েছিল, সেই একই দোষ তো সেও করেছে। পরকীয়া। সে তো ঠকেছে, ঈশিতা? 

এই সব ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরছিল। সেলফোনে আলো জ্বলে উঠল। ঈশিতার ফোন, কোথায় তুমি? তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসো। আমি ফিরে এসেছি।

সমাপ্ত



পরিসমাপ্তি--শাবলু শাহাবউদ্দিন


পরিসমাপ্তি 

শাবলু শাহাবউদ্দিন 


ইদ্রিস প্রেম করে। এ কথা কে না জানে । আবাল বৃদ্ধ সবার মুখে মুখে ফিরছে । রইজের ছেলে ইদ্রিস পূর্বপাড়ার হালিম ব্যাপারির বেটিকে খুব ভালোবাসে । তারা রাতবেরাতে ফোনে কথা বলে। দেখা করে। আরো কত কী। আমাদের সমাজ তো বিবিসি । একটা ঘটনা ঘটলে তাকে প্রচার করে জনগণ থেকে জনমতে রূপান্তরিত করা তাদের কাজ।

যাইহোক ইদ্রিসের পরিবার এই প্রেম-প্রীতি কোন মতেই মেনে নিবে না। বিশেষ করে ইদ্রিসের মা। তার এক কথা । ছেলেকে কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিবো । তবুও হালিম ব্যাপারির বেটিকে ঘরে তুলবো না । ছেলেকে অনেক বুঝ দিলো । তাতে কোন কাজ হলো না। নানির বাড়িতে পাঠিয়ে দিলো । তাতে আরো মুস্কিল হলো। রোজ রাতে নানির বাড়ি থেকে এসে প্রেমিকার সাথে দেখা করে আবার ভোর রাতে ফিরে যায় । এভাবে একদিন তো আটকিয়ে গেলো । এ কথা লোকে জানা জানি হয়ে গেলে মেয়ের বাপের সম্মান যাবে । তাই মেয়ের বাপ হালিম ব্যাপারি খুব সাবধানে ইদ্রিসের বাসায় খবর দিলো। ইদ্রিসের বড় ভাই এসে গোপনে ইদ্রিসকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেলো। লোকে বলে বাতাসেরও কান আছে । এ কথাও কয়েক দিন পরে মানুষের মুখে মুখে ফিরতে লাগলো । অবশেষে মেয়ের বাপ ছেলের বাড়িতে ঘটক পাঠালো । তাতেই ঘটলো আরো যত বিপত্তি । ইদ্রিসের মা এবার মেয়ের সন্ধান করতে লাগলো। ইদ্রিসের বিয়ে দিয়ে দিবে । 

ইদ্রিস ছুটে আসলো আমার কাছে । কাকা তুমি একটা কিছু করো।

আমি আর কী করবো? অবশেষে ইদ্রিসকে হুকুম দিলাম । বিয়ে করে ফ্যাল । বাকিটা আমি দেখবো । ভয়ের কিছুই নেই। পরিবারের কেউ যদি না মানে । তাতে কোন সমস্যা নেই। আমি আছি তোদের পাশে। 

কথাটি কেমন করে যেন চলে গেলো ইদ্রিসের মায়ের কাছে । ইদ্রিসের মা আমাকে সাইজ করার জন্য চলে গেলো কবিরাজের কাছে । কবিরাজ টাকা নিয়ে বিভিন্ন গাছের কিছু বাকল চেঁছে ধরিয়ে দিলো ইদ্রিসের মায়ের হাতে। এই গাছের বাকলে কী আর হবে? সোজাসুজি আমার কাছে চলে আসলো। ইদ্রিসের মা আমার কাছে এসে হাতে পায়ে জড়িয়ে ধরলো । আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম । আমাকে কী করতে হবে?

ইদ্রিসের মা আমাকে বললো, তেমন কিছু না । আমার হাতের এই পুঁটলিটা গোরস্থানে গিয়ে পাশাপাশি নতুন দুইটি কবরের মাঝে পুঁতে রেখে আসতে হবে। ঠিক সন্ধ্যার পরে। এমন একটা নিষ্ঠুর কাজের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে এসে পড়লো যা কোন জীবিত মানুষের পক্ষে করা কখনো সম্ভব না ।  অনেক শপথ বাক্য পাঠ করিয়ে আমাকে ঠিক সন্ধ্যার সময় পাঠিয়ে দেওয়া হলো গোরস্থানের ভিতরে । আমি যা করার তাই করলাম । গোরস্থান থেকে বাড়িতে ফিরে এসে দেখি ইদ্রিস বাড়িতে নেই। এদিকে সেদিকে খবর পাঠানো হলো। কোন খোঁজ খবর পাওয়া গেলো না । ঠিক রাত এগারোটার সময় আমার ফোনে একটা কল এলো । কাকা বিয়ে করে ফেলছি। আমি হতবাক । সবকিছুর পরিসমাপ্তি ঘটে গেলো ।

বৃদ্ধাশ্রম--সমর আচার্য্য



বৃদ্ধাশ্রম--

সমর আচার্য্য

বছর পাঁচেক হলো স্বামী পরিতোষবাবু মারা গিয়েছেন l স্বামীর মৃত্যুতে বিজয়াদেবী মুষড়ে পড়লেও আস্তে আস্তে এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছেন l স্বামী ব্যবসা করতেন l মোটামুটি সচ্ছল অবস্থা l ছেলে অতনু এবং মেয়ে ঝর্নাকে ভালো মতো লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন l আজ তারা প্রতিষ্ঠিত l

পরিতোষবাবু বেঁচে থাকতেই ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে গিয়েছেন l মেয়ে কোলকাতায় থাকে l দুজনেই চাকরি করে l খুবই ব্যস্ত l

ছেলে অতনুও সরকারি বড় পদে কাজ করে l জেলা শহরেই পোস্টিং l তার একটা চার বছরের ছেলে l বিয়ের পর থেকেই শ্বাশুড়ি বৌমাতে খুব একটা বনিবনা নেই l

নাতি বাবাই ঠাকমা অন্ত প্রাণ l বেশ চলছিল l হঠাৎ একদিন বৌমা পারমিতা বলে, আপনি কিছুদিন কলকাতায় ঝর্ণার ওখানে থেকে আসলেও তো পারেন l কথাটা বিজয়া দেবীর ভালো লাগে নি l নীরব থেকেছে l পরের দিন সকালে অতনু বলে, মা আগামী পরশু আমরা কোলকাতায় যাবো l চলো একটু বেরিয়ে আসি l মায়ের মনে খটকা লাগলেও মেয়ের বাড়ি যাওয়া যাবে এই ভেবে বেশ আনন্দ পেলেন l

ঝর্ণার ওখানে আজ প্রায় সাত আটদিন হয়ে গেল l অতনু মাকে বলে, মা তুমি কয়েকদিন এখানে থেকে যাও, আমি না হয় পরে এসে নিয়ে যাবো l

কথাটা ঝর্ণার কানে গেল l সে বললো, কিন্তু আমরা তো বাইরে বেড়াতে যাবো l অনেক আগের প্রোগ্রাম l এখন তো আর মায়ের জন্য টিকিট পাওয়া যাবে না l

অগত্যা মাকে নিয়েই ওদের ফিরতে হলো l

কয়দিন পরে বৌমা বলে, মা আপনি যদি এই ছোট ঘরটাতে থাকেন তবে আমাদের একটু সুবিধা হয় l

মা সন্ধ্যায় একটু টিভি দেখেন l একদিন ছেলে বললো, মা, যখন বাবাইকে পড়াতে আসে টিভিটা একটু বন্ধ করে রেখো, না হলে বাবাইয়ের অসুবিধা হয় l

দিনে দিনে এমন নানা অসুবিধা আর অসুবিধা বিজয়াদেবী কে অতিষ্ঠ করে তুললো l মেয়েকে ফোনে সব কথা বললো l কিন্তু সে তেমন পাত্তা দিলো না l শুধু বলে, তোমার অসুবিধার কথা বুঝতে পারছি, কিন্তু কি করবো বলো, আমাদেরও তো মাত্র দুটো ঘর l তোমাকে কোথায় রাখবো l

বড় হতাশ হলেন বিজয়াদেবী l নিজের স্বামীর তৈরী করা ঘর বাড়ি, অথচ আজ সেখানে তারই থাকার জায়গা হচ্ছে না l

এমনি করে নানান ঝুট ঝামেলা নিয়ে দিন কাটছিল l একদিন অফিস থেকে ফিরে অতনু মাকে ডেকে বলে, মা খুব সুন্দর একটা বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে l তুমি কিন্তু সেখানে থাকলেও পারো l তোমার মত অনেকে থাকে সেখানে l তোমার বয়সীদের  সঙ্গে ভালোই লাগবে l

আর এখানে আমরা কখন কোথায় যায়, তোমাকে একা থাকতে হয়, তাছাড়া বাবাই এখন বড় হচ্ছে l ওর পড়াশুনার জন্য একটা ঘর লাগে l বাবা যা রেখে গিয়েছেন তাতে বৃদ্ধাশ্রমের ডোনেশনটা হয়ে যাবে l মাসের টাকাটা না হয় আমি আর বুনু মিলে দেবো l বিজয়া দেবী আকাশ থেকে পড়লেন l কিন্তু বুঝতে পারলেন যে ওরা সব ঠিক করেই ফেলেছে l আর পীড়াপীড়ি করে কোন লাভ হবে না l

মালপত্র মোটামুটি গোছানো হয়ে গিয়েছে ওদের, এ ব্যাপারে এতটুকু ক্লান্তি বোধ করেনি l

নাতি বাবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন তিনি l ছোট্ট বাবাই কিছুই বুঝলো না l

শুধু ঠাকমার মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো l

পরেরদিন সকালে অতনু, পারমিতা, বাবাই সবাই মিলে বিজয়া দেবীকে নিয়ে শহরের অন্য প্রান্তে বৃদ্ধাশ্রমে এসে পৌছালো l মায়ের ঘরের সব কিছু ঠিকঠাক করে দিয়ে আশ্রমের লোকের সঙ্গে কথা বলে মাকে রেখে চলে আসছিলো তারা l হঠাৎ বাবাই বাবাকে জিজ্ঞাসা করলো, বাবা, বাবা ঠাকমা ফিরবে না? অতনু বললো, না বাবা আজ থেকে তোমার ঠাকমা এখানেই থাকবেন l বাবাই চিৎকার করে কেঁদে উঠলো, না না, ঠাকমাকে না নিয়ে আমি যাবো না, বলেই ছুটে গিয়ে বিজয়াদেবীকে জড়িয়ে ধরলো l বিজয়া দেবীও হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন l দাদু ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, কাঁদে না দাদু ভাই l তুমি যখন বড় হবে আমি আবার তোমার কাছে ফিরে যাবো l এখন যাও লক্ষী সোনা l বাবা মার কথা শুনে চলো, মন দিয়ে লেখা পড়া করো l বলেই বাবাইকে ছাড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন l বাবাইকে একরকম টানতে টানতেই নিয়ে এলো অতনু আর পারমিতা l কিন্তু বাবাইয়ের কান্না বৃদ্ধাশ্রমের চারপাশে শুধুই প্রতিধনিত হয়ে ফিরে এলো, আমি ঠাকমাকে ছেড়ে যা---বো--না l

ও ঠাকমা তুমি কেন আমাদের সঙ্গে যাবে না, কেন তুমি এমন করছো l ও ঠাকমা, ঠাক---মা---গো--l

                 -------------

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...