Thursday, 3 November 2022

নিঃস্বার্থ--আরাধনা চট্টোপাধ্যায়

 

নিঃস্বার্থ--

আরাধনা চট্টোপাধ্যায়

"এই যাঃ, আবার আজকেও আমার দোকানে ঢুকে বিস্কুট নিয়ে গেলো ওই শয়তান পাগলীটা ! এই কে আছিস, ধর্ ধর্ ,ধরতো ওটাকে!"

ভোলার চায়ের দোকানে রাতে আড্ডা দিতে আসা ছেলে গুলো আজকেও তাড়া করে প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দিলো পাগলীটা কে। গত দুমাস ধরে মাঝে মাঝেই এই দৃশ্য দেখা যায় বলাগড় স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে। পাগলীটা এখানেই থাকে। তার পাগলামি বলতে শুধু নিজের সাথে বিড়বিড় করে, মাঝে মাঝে হাসে, অনেক সময় শোনা যায় তার বুক ফাটা হাহাকার ও সেইসাথে কান্না। যেন হারিয়ে ফেলা কাউকে সে খোঁজে। আজ খিদে পেয়েছিলো খুব, জ্বালা সহ্য করতে না পেরে চুরি করেছিলো একটা বিস্কুটের প্যাকেট। তাতেই এত কান্ড!এই জ্বালায় অতিষ্ঠ ভোলা পরদিন সকালেই গেলো নতুন স্টেশন মাষ্টারের অফিসে। "যে করেই হোক এই পাগলীটাকে স্টেশন চত্বর থেকে তাড়াতেই হবে। কতদিন আর সহ্য করা যায়? এভাবে কী আর ব্যবসা টেকে!! "


     বলাগড় স্টেশন এর নতুন স্টেশন মাষ্টার আনন্দ। বছর পঁচিশ এর যুবক। দুমাস হয় এখানে বদলি হয়ে এসেছে। কলকাতার ধনী পরিবারের একমাত্র সন্তান সে। একা একা অফিস ঘরে বসে মনে পড়ছে আসার সময় মায়ের বলা কথা গুলো, " দেখ বাবু, পুরোনো সব কথা ভুলে যা, তুই আমাদের একমাত্র সম্বল, কত কষ্ট করে বড় করেছি তোকে,নিজের পায়ে দাঁড়া, রোজগার কর, পরিবারে মন দে "। সেই সাথে আরও অনেক কথাই মনে পড়ছিলো আনন্দের, ঠিক এমন সময় ভোলা এসে ঢুকলো তার অভিযোগের ঝুলি নিয়ে। সমস্ত কিছু শুনে আনন্দ বলে, "ঠিক আছে ঠিক আছে, তুমি এখন যাও, আজ থেকে আমি নিজে রাতে স্টেশন চত্বর তদারকি করবো তোমার দোকানে আর কিছু হবে না, চিন্তা নেই। "


                   সেদিন ও তার পর তিনদিন পাগলীটাকে স্টেশন চত্বরে দেখা গেলো না। ভোলার দোকানে চুরি গেল না কোন বিস্কুটের প্যাকেট। পাঁচ দিনের দিন অনেক রাত্রে হঠাৎ আনন্দ শুনতে পায় বেশ কিছুটা দূর থেকে চাপা চিৎকার ও গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে। দেরি না করে আনন্দ বেরিয়ে পড়ল আওয়াজের উৎস সন্ধানে। সাথে নিলো বড় সার্চলাইট টা। কিছু দূর গিয়ে হঠাৎ মনে পড়লেো "সামনেই একটা বেআইনি মদের ঠেক আছে, কিছু দিন আগে পুলিশ এসেছিল, জায়গা টা ভালো না , আওয়াজ টা আবার ওখান থেকে আসছে না তো!! " কোন এক অজানা আকর্ষনে আনন্দ এগিয়ে চললো সেদিকে, যেন অন্তর্যামী চান সে একবার অন্তত জয় করুক তার ভয় কে, লাভ করুক জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। 


                  সেইখানে এসে আনন্দ দেখলো কিছুটা দূরে কয়েক জন মদ্যপ যুবক ঘিরে রেখেছে একজনকে। পুরুষ না মহিলা অন্ধকারে দুর থেকে ঠিক বোঝা গেল না। সার্চলাইটের আলো ফেলে আনন্দ চিৎকার করলো এই কে? কে ওখানে! কি হচ্ছে ওখানে? আনন্দের চিৎকার শুনে আর সার্চলাইটের আলো দেখে ছেলে গুলো সবাই এদিক সেদিক পালিয়ে গেল। আনন্দ দৌড়ে এসে মাটিতে সার্চলাইটের আলো ফেললো, যা দেখলো তাতে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ততক্ষণে এইসব চিৎকার শুনে আনন্দের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে ভোলা। হঠাৎ সে বলে উঠলো, "আরে স্যার, এই তো সেই পাগলীটা! ইস্! কী অবস্থাটাই না করেছে!! "

                 এখানে শুধুমাত্র আনন্দ জানে যে মৃতদেহ টি পড়ে আছে দুনিয়ার চোখে সে পাগলী হলেও তার কাছে সে তার তিতু ওরফে তিতিক্ষা। কালনায় বাড়ি। এক বান্ধবীর সূত্র ধরে ক্লাস টেন এ পড়ার সময় সম্পর্ক গড়ে ওঠে আনন্দের সাথে। গরিব গৃহশিক্ষকের মেয়ে তিতিক্ষা অন্ধের মতো ভালোবাসতে শুরু করে আনন্দ কে। আনন্দ বরাবরই একটু পরিবার মুখো। তার মা বাবার কথাই তার কাছে শেষ কথা।। আভিজাত্য ও রক্ষনশীল মনোভাবের কারণে তিতিক্ষা কে পছন্দ করতেন না আনন্দের পরিবার। কিন্তু তিতিক্ষা বিশ্বাস করতো যে আনন্দ ঠিক সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও তাকে গ্রহণ করবে। স্বপ্ন দেখতো আনন্দের পরিবার বরণ করে ঘরে তুলছে তাকে। 

                  কিন্তু বিধির নির্মম আঘাতে আজ দুমাস হয় তাদের সম্পর্কটি আর নেই। এই আঘাত নিতে পারেনি তিতিক্ষা, তাই আজ সে স্টেশনের পাগলী। মা তো জন্ম দিয়েই চলে গেছে। বাবারও প্রান কেড়েছে হার্ট অ্যাটাক। 

                  আনন্দের সামনে পড়ে আছে তিতু। নিথর নিস্পন্দ। তিতিক্ষার লেখা শেষ চিঠিটার কথা মনে পড়ছে আনন্দের, " তুমি যদি কোনদিন আমাকে ত্যাগ করো, সত্যি বলছি আমি পাগল হয়ে যাবো। তোমাকে ছাড়া আর কারও হতে পারবো না। অপেক্ষা করবো সারাজীবন, ভগবান চাইলে দেহ থেকে প্রানটা বেরোনোর সময় তুমি আমার পাশে থাকবে। *

এমন অনেক মেরুদণ্ড হীন আনন্দই রয়েছেন আমাদের সমাজে। কিন্তু ভগবান থাকেন এই তিতিক্ষা দেরই পাশে। এমন করেই জয়ী করেন তাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। 

     সমাপ্ত                   

                           

       



No comments:

Post a Comment

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...