দিন যাপন
রবিরাম হালদার
.......
একটি মহিলা প্রত্যেক দিন ভোরে উঠে,পরিবারের সমস্ত কাজ সেরে,সকাল হবার আগে কেল্লার মাছের বাজারে হাজির হয়৷তারপর কোমরে কাপড় জড়িয়ে,মাছ কিনে নিয়ে ঝুড়িতে করে মাথায় নিয়ে গ্রামের এ পাড়ায় ও পাড়ায় পায়ে হেঁটে হেঁটে বিক্রি করে৷ কোনদিন বেলা ১২টা-কোনদিন ১টা ২টা এমনকি ৩টা পর্যন্ত মাছ বিক্রি করে৷ ঝুড়ি মাথায় নিয়ে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হাক দেয় মাছ নেবে—মাছ নেবে—বলে৷ডাক শুনে কেউ মাছ নেবার কথা বললে তার বাড়ির উঠোনে গিয়ে ঝুড়িটা নামিয়ে,পাল্লাতে মাছ মেপে দিয়ে পয়সা নিয়ে আবার মাথাতে ঝুড়ি তুলে মাছ নেবে—মাছ নেবে— বলতে বলতে চলে যায়৷
মাছবিক্রি শেষ করে বাড়িতে গিয়ে,মাথায় একটু তেল দিয়ে দৌড়ে পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান সেরে,তাড়াতাড়ি করে উনুনে হাঁড়ি চড়ায়৷বাচ্ছাটা ভাত খাবার জন্য তখন ছটফট করে৷বলে মা পাশের বাড়ির বাপিদের খাওয়া হয়ে গেছে,আর তুমি চাল চাপাচ্ছো৷মা বলে—এই তো চাপিয়ে দিয়েছি এখুনি হয়ে যাবে৷তুই এই জল টা খেয়ে নে বাবা৷ বলে জল খেতে দেয় ৷তারপর রান্না হলে অসুস্থ স্বামী আর ছেলেকে খাইয়ে যেটুকু থাকে নিজে খেয়ে একটু বিশ্রাম করে৷আবার সন্ধ্যার আগে মধ্যবিত্তের বাড়ি ফাই ফরমাশ খাটে কটা টাকার জন্য৷এইভাবে সারাটা জীবন হাড়ভাঙা পরিশ্রম ক'রে দিন যাপন করে মেয়েটি৷একবিংশ শতকে মহিলাদের জীবন যাপনে সংগ্রাম দেখে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে৷
একদিন বেলা ১১ টার সময় মেয়েটি আমার বাড়িতে আসে,বলে মাছ নেবে বাবু৷এই মাছগলো বিক্রি না হলে আমার হাঁড়ি চড়বেনা উনুনে৷আমি বললাম ঠিক আছে যতটা মাছ আছে আমাকে দাও৷মাছ মেপে দিয়ে পয়সা নিয়ে চলে যাবার সময় আমি জিজ্ঞাসা করি তুমি প্রত্যেকদিন কিভাবে পারো?মেয়েটি বলে না পারলে উপায় নেই,তার স্বামী অসুস্থ,ছেলেটার বই খাতা কলম ,এলাক পোশাক ডাক্তার বদ্দি ওষুধ সবই তো এর উপর৷পঞ্চায়েত বাবুরা যাদের আছে তাদের দেয় আমাদের দেখতে পায়না৷বলতে বলতে চলে গেল৷আমি অবাক হ'য়ে কথা গুলো শুনি,ভাবি এই আমাদের মহান দেশের মায়েদের অবস্থা৷একশ্রেণি অট্রালিকায় খাবার বাসি করে ফেলে দেয়,আর একশ্রেণি সেই খাবার কুকুরে মানুষে ভাগ করে খায়৷
এই আমাদের স্বাধীন দেশ,আর এই আমাদের স্বাধীনতা৷যে মাকে ছেলের স্কুলে নিয়ে যাবার কথা,সেই মা সন্তান-স্বামীর জন্য খাবার জোগাড় করতে মাছ বিক্রি করছে৷ছিন্ন মলিন বসনে গ্রাম গ্রামান্তরে পায়ে হাঁটছে,শুধু পেটের তাগিদে৷আমার দেখা একটি মহিলার দিন যাপন লিপি রেখে গেলাম আপনাদের কাছে৷
No comments:
Post a Comment