Friday, 4 November 2022

জড়োয়ার ঝুমকো--কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক)

জড়োয়ার ঝুমকো--
কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক)        

              পপি নিঃশব্দে  শাশুড়ির ঘরে ঢুকেই  দরজাটা আটকে দিল।  বাড়ি ফাঁকা। সবাই তুলতুলির বিয়ের বাজার করতে গেছে। 

               কিছুদিন আগেই শাশুড়ি গত হয়েছেন। উনার ঘরটা  ফাঁকাই পড়ে থাকে। এমনিতেই ব্যক্তিত্বময়ী শাশুড়ির ঘরে  বৌমারা  ঢোকেই  না কোন প্রয়োজন ছাড়া। 

            আজ  জীবনে  পঞ্চমবার উনার ঘরে প্রবেশ করতেই বুকটা ধড়াস করে উঠল।  শরীর বেয়ে এই শীতেও দরদর করে নামছে নোনা ঘাম। পালঙ্কের পাশে বহু যুগের সাক্ষী ভারী  সিন্দুকটা সেদিনের মতন আজও বিশ্বাসভঙ্গের জন্যে পপির দিকে ঘৃণাভরে তাকিয়ে বিদ্রূপ করছে।

              ঘড়িতে  পাঁচটার ঘন্টা বাজল। পপি  চেয়ারটা পালঙ্কের উপর রেখে তাতে  উঠেই শ্বশুর মশাইয়ের দাদুর  ছবির পিছনের  কুলুঙ্গিতে হাত রাখল। একটা কিছুতে স্পর্শ হতেই শরীরে যেন হাজার ভোল্টের শিহরণ! কুলঙ্গিটা পোকা মাকড়,  মাকড়সার জালে পূর্ণ। ফটোর আড়ালে  বহুদিন কেউ ওর  খোঁজ  না রাখলেও পপির নজরে ছিল।

              প্রাপ্ত জিনিসটা কোমরে লুকিয়ে ছলছল চোখে শাশুড়িমার ছবির সামনে দাঁড়াতেই পপির  ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল,"মা,  আমায় ক্ষমা করবেন। আসলে বড়বৌমার কোন  দোষ ছিল না.........."

               কথা শেষ হয়না। গলা বুজে আসল শ্রাদ্ধের দিনের মতন। সেদিনও সবটা স্বীকার করতে পারেনি। একটা অপরাধবোধ.....তাই.....

                 ***********   *************

              আঠাশটা শীত পার হয়েছে। 

              আজ তুলুতলির  ছেলে উদ্দামের বৌভাত। বৌমা সানভির হাতে জড়োয়ার ঝুমকোজোড়া দিয়েই সজল নয়নে বলল,"বৌমা, এগুলোর অমর্যাদা  করোনা। এর ভিতরে অনেকের হৃৎস্পন্দন, চোখের নোনা শিশির, ভালবাসা    লুকিয়ে আছে।"

           "মা, ভীষণ দামী এই ঝুমকোগুলো......"

           "হ্যাঁ রে সানু, এখন থেকে এগুলো  তোর সম্পদ......"

              বাড়ির সব আলো নিভতেই  তুলতুলির বহু বছর আগে ওর বৌভাতে  মেজকামণির  কথাগুলো মনে পড়ছে। 

             মেজকামণির ভাইয়ের ব্যবসার টালমাটাল অবস্থা। ব্যবসা দাঁড়  করাতে টাকার ভীষণ দরকার।  ভাইকে বাঁচাতে ভাসুর, স্বামীর দ্বারস্থ হয়েও টাকার সংস্থান হলনা। শেষে সিন্দুক থেকে ঝুমকোজোড়া চুরি করে, বন্ধক দিয়ে সেই টাকা ভাইকে......।
                     সব ঠিকঠাক হলেও দোষী  হয়েছিলেন তুলতুলির মা বড়বৌমা। পৌষের রাত। উনার শালটা বাইরেই ছিল। সেটাতে মুখ ঢেকেই পপি সিন্দুকের......

               অন্ধকারে শাশুড়ির  ভারী, চওড়া   শালটা দেখেই চিনে ফেলেছিলেন। বুদ্ধিমতী,  তাই চেপে গিয়েছিলেন। আমৃত্যু বড়বৌমাকেই  চোর হিসেবে  জানলেন। সেটা একমাত্র  পপিই বুঝেছিল। 

            ভাইয়ের দেনা মিটতেই পাপিয়া ঠিক করেছিল ঝুমকোজোড়া ফিরিয়ে এনে  সিন্দুকেই রাখবে। সাহস হয়নি,  তাই অগত্যা কুলুঙ্গিতেই.....

             সেদিন বৌভাতের রাতে পাপিয়া তুলতুলির হাতে ষঝুমকোজোড়া তুলে দিয়ে সব স্বীকার করেছিল। তুলতুলিও ক্ষমা করেছিল তার আদরের মেজকামণিকে।

            তুলতুলির বাবার পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠদের  কেউই বেঁচে নেই।

              সদ্য শাশুড়ি তুলতুলির চোখে মাঘ শিশিরের চন্দন। 

              নোনাপানিতে ঝুমকোজোড়া ঝলমল করছে।

No comments:

Post a Comment

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...