বৃদ্ধাশ্রম--
সমর আচার্য্য
বছর পাঁচেক হলো স্বামী পরিতোষবাবু মারা গিয়েছেন l স্বামীর মৃত্যুতে বিজয়াদেবী মুষড়ে পড়লেও আস্তে আস্তে এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছেন l স্বামী ব্যবসা করতেন l মোটামুটি সচ্ছল অবস্থা l ছেলে অতনু এবং মেয়ে ঝর্নাকে ভালো মতো লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন l আজ তারা প্রতিষ্ঠিত l
পরিতোষবাবু বেঁচে থাকতেই ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে গিয়েছেন l মেয়ে কোলকাতায় থাকে l দুজনেই চাকরি করে l খুবই ব্যস্ত l
ছেলে অতনুও সরকারি বড় পদে কাজ করে l জেলা শহরেই পোস্টিং l তার একটা চার বছরের ছেলে l বিয়ের পর থেকেই শ্বাশুড়ি বৌমাতে খুব একটা বনিবনা নেই l
নাতি বাবাই ঠাকমা অন্ত প্রাণ l বেশ চলছিল l হঠাৎ একদিন বৌমা পারমিতা বলে, আপনি কিছুদিন কলকাতায় ঝর্ণার ওখানে থেকে আসলেও তো পারেন l কথাটা বিজয়া দেবীর ভালো লাগে নি l নীরব থেকেছে l পরের দিন সকালে অতনু বলে, মা আগামী পরশু আমরা কোলকাতায় যাবো l চলো একটু বেরিয়ে আসি l মায়ের মনে খটকা লাগলেও মেয়ের বাড়ি যাওয়া যাবে এই ভেবে বেশ আনন্দ পেলেন l
ঝর্ণার ওখানে আজ প্রায় সাত আটদিন হয়ে গেল l অতনু মাকে বলে, মা তুমি কয়েকদিন এখানে থেকে যাও, আমি না হয় পরে এসে নিয়ে যাবো l
কথাটা ঝর্ণার কানে গেল l সে বললো, কিন্তু আমরা তো বাইরে বেড়াতে যাবো l অনেক আগের প্রোগ্রাম l এখন তো আর মায়ের জন্য টিকিট পাওয়া যাবে না l
অগত্যা মাকে নিয়েই ওদের ফিরতে হলো l
কয়দিন পরে বৌমা বলে, মা আপনি যদি এই ছোট ঘরটাতে থাকেন তবে আমাদের একটু সুবিধা হয় l
মা সন্ধ্যায় একটু টিভি দেখেন l একদিন ছেলে বললো, মা, যখন বাবাইকে পড়াতে আসে টিভিটা একটু বন্ধ করে রেখো, না হলে বাবাইয়ের অসুবিধা হয় l
দিনে দিনে এমন নানা অসুবিধা আর অসুবিধা বিজয়াদেবী কে অতিষ্ঠ করে তুললো l মেয়েকে ফোনে সব কথা বললো l কিন্তু সে তেমন পাত্তা দিলো না l শুধু বলে, তোমার অসুবিধার কথা বুঝতে পারছি, কিন্তু কি করবো বলো, আমাদেরও তো মাত্র দুটো ঘর l তোমাকে কোথায় রাখবো l
বড় হতাশ হলেন বিজয়াদেবী l নিজের স্বামীর তৈরী করা ঘর বাড়ি, অথচ আজ সেখানে তারই থাকার জায়গা হচ্ছে না l
এমনি করে নানান ঝুট ঝামেলা নিয়ে দিন কাটছিল l একদিন অফিস থেকে ফিরে অতনু মাকে ডেকে বলে, মা খুব সুন্দর একটা বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে l তুমি কিন্তু সেখানে থাকলেও পারো l তোমার মত অনেকে থাকে সেখানে l তোমার বয়সীদের সঙ্গে ভালোই লাগবে l
আর এখানে আমরা কখন কোথায় যায়, তোমাকে একা থাকতে হয়, তাছাড়া বাবাই এখন বড় হচ্ছে l ওর পড়াশুনার জন্য একটা ঘর লাগে l বাবা যা রেখে গিয়েছেন তাতে বৃদ্ধাশ্রমের ডোনেশনটা হয়ে যাবে l মাসের টাকাটা না হয় আমি আর বুনু মিলে দেবো l বিজয়া দেবী আকাশ থেকে পড়লেন l কিন্তু বুঝতে পারলেন যে ওরা সব ঠিক করেই ফেলেছে l আর পীড়াপীড়ি করে কোন লাভ হবে না l
মালপত্র মোটামুটি গোছানো হয়ে গিয়েছে ওদের, এ ব্যাপারে এতটুকু ক্লান্তি বোধ করেনি l
নাতি বাবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন তিনি l ছোট্ট বাবাই কিছুই বুঝলো না l
শুধু ঠাকমার মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো l
পরেরদিন সকালে অতনু, পারমিতা, বাবাই সবাই মিলে বিজয়া দেবীকে নিয়ে শহরের অন্য প্রান্তে বৃদ্ধাশ্রমে এসে পৌছালো l মায়ের ঘরের সব কিছু ঠিকঠাক করে দিয়ে আশ্রমের লোকের সঙ্গে কথা বলে মাকে রেখে চলে আসছিলো তারা l হঠাৎ বাবাই বাবাকে জিজ্ঞাসা করলো, বাবা, বাবা ঠাকমা ফিরবে না? অতনু বললো, না বাবা আজ থেকে তোমার ঠাকমা এখানেই থাকবেন l বাবাই চিৎকার করে কেঁদে উঠলো, না না, ঠাকমাকে না নিয়ে আমি যাবো না, বলেই ছুটে গিয়ে বিজয়াদেবীকে জড়িয়ে ধরলো l বিজয়া দেবীও হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন l দাদু ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, কাঁদে না দাদু ভাই l তুমি যখন বড় হবে আমি আবার তোমার কাছে ফিরে যাবো l এখন যাও লক্ষী সোনা l বাবা মার কথা শুনে চলো, মন দিয়ে লেখা পড়া করো l বলেই বাবাইকে ছাড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন l বাবাইকে একরকম টানতে টানতেই নিয়ে এলো অতনু আর পারমিতা l কিন্তু বাবাইয়ের কান্না বৃদ্ধাশ্রমের চারপাশে শুধুই প্রতিধনিত হয়ে ফিরে এলো, আমি ঠাকমাকে ছেড়ে যা---বো--না l
ও ঠাকমা তুমি কেন আমাদের সঙ্গে যাবে না, কেন তুমি এমন করছো l ও ঠাকমা, ঠাক---মা---গো--l
-------------

No comments:
Post a Comment