Wednesday, 2 November 2022

বকুল বন্যা--তমা কর্মকার


বকুল বন্যা--

তমা কর্মকার

                  

     বোলপুর যাওয়ার সময় বন্যার সাথে বকুলের ট্রেনে আলাপ |সেই আলাপ একদিন ভালোবাসায় রূপ নিল |তার পর শুভ দিনে ওদের বিয়ে হলো |বকুল পেশাগত ভাবে স্কুল মাস্টার |আর বন্যা গৃহকন্নার পাশাপাশি একটু আধটু লেখা লেখি করে বেশ নাম হয়েছে |বকুল বন্যা দুজন দুজনকে প্রচন্ড ভালো বাসে |ওদের সব পছন্দই মোটা মুটি মিলে যায় |ওদের দুজনারই বোলপুরশান্তি নিকেতন  খুব ভালোলাগে, সেজন্য প্ৰতি বছর ছুটিতে ওরা বোলপুর শান্তি নিকেতন বেড়াতে যায় |সব ঠিক মতোই চলছিল |আজ পাঁচ বছর ওদের বিয়ে হয়েছে কিন্তু কোন সন্তান হয়নি |বকুলকে বন্যা ডাক্তার দেখাতে বলেই বকুল বলে তোমায় ডাক্তার দেখবো কেন সময় হলে এমনিই হবে |আর যদি না হয় তো না হবে |বন্যা তাই আজ বকুলকে লুকিয়ে মাস তুতো দাদার বন্ধু ডাক্তার কুন্তলের কাছে নিজেকে চেকআপ করিয়েছে | তারপর বাড়ী ফিরে সারাদিন অনেক লিখেছে মনটাও বেশ ভালো তবু কাল ডাক্তার রিপোর্ট দেবে তাই একটা চিন্তা তো রয়েছেই, রিপোর্টে কি আসে কি জানি? এই প্রথম বকুলকে কিছু না জানিয়ে এমন কাজ করলো বন্যা তাই  আজ সারাদিন একটা অপরাধ বোধে ভুগেছে , আনমনে নানা কাজের মধ্যে সময় কেটে গেলো |পরের দিন সকাল বেলা বকুল বেরিয়ে যেতেই বন্যা ডাক্তার কুন্তলের চেম্বারে রিপোর্ট আনতে গেলো  |কিন্তু ডাক্তার কুন্তলের রিপোর্ট টা বন্যার জীবনে নিয়ে এলো এক দূর্বিসহ ঝড়, সব কিছু যেন উল্টে পাল্টে দিতে চাইছে |বন্যা রিপোর্ট দেখে ধুপ করে বসে পরে |বন্যাকে ঐভাবে বসতে দেখে ডাক্তার কুন্তল সান্ত্বনা দিয়ে বলে বন্যা নিজেকে সামলাও ভেঙে পরো না, এতে তোমার কি দোষ, তোমার মতো অনেক মেয়েই আছে যাদের একটা ওভারী আছে যা কিনা বাচ্ছা ধারণ করতে পারেনা |তাই বাস্তব টাকে মেনে নাও |বন্যা ডাক্তারের চেম্বার থেকে কোন রকমে বাড়ী আসে, দিন সাতেক একটু অন্যমনস্ক থাকে বকুলের সাথেও ভালো করে কথা বলেনা |বকুল ভাবে বন্যা হয়তো লেখা নিয়ে ব্যস্ত তাই বন্যার এ হেন ব্যবহারে বকুল কিছু মনে করে না, সেদিন বার টা ছিল সোমবার বকুল বাড়ী থেকে স্কুল যাওয়ার জন্য বেরিয়ে যেতেই, বন্যাও বাড়ী ছেড়ে বেরিয়ে গেলো |শুধু একটা চিরকুট রেখে |বকুল বাড়ী ফিরে বন্যা কে দেখতে না পেয়ে বন্যার খোঁজ শুরু করলো |কোথাও খুঁজে পেলো না বন্যাকে, হঠাৎ বন্যার লেখার টেবিলের উপর চোখ পড়তেই বন্যার লেখা চিরকুট টা বকুল দেখতে পেলো, তাড়াতাড়ি বকুল চিরকুটটা খুলে পড়তে লাগলো তাতে বন্যা লিখেছে বকুল আমায় ক্ষমা করো আমি তোমায় সুখী করতে পারলাম না তুমি আবার বিয়ে করে স্ত্রী সন্তান নিয়ে সুখী হও| আমার খোঁজ করোনা lবকুল চিরকুটটা পড়ে হতভম্ব হয়ে গেলো, এসব কি লিখেছে বন্যা কেনই বা লিখেছে,আর কোথায়ই বা গেছে,  কিছুই বুঝতে পারছে না বকুল এসব ভাবছে এমন সময় বকুলের  ফোন টা বেজে উঠে বকুল ফোনটা ধরে দেখে ডাক্তার কুন্তলের ফোন বকুল হ্যালো বলার আগেই ডাক্তার কুন্তল বলে ওঠে বন্যা কেমন আছে?ওর ফোনটা বন্ধ, তাই তোমায় ফোন করলাম, বকুল ভয়ার্ত গলায় বলে কেন বন্যার কি হয়েছে?ডাক্তার কুন্তল বলে কেন বন্যা তোমাকে  কিছু বলে নি? বকুল বলে নাতো |তখন ডাক্তার কুন্তল বকুলকে সেদিনের সব কথা বলে  |তখন বকুল ও ডাক্তার কুন্তলকে বলে বন্যার বাড়ী ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা, আর সাথে এও বলে এবার মনে হয় আমি বুঝতে পারছি |বন্যা কোথায় যেতে পারে, ফোন করার জন্য ডাক্তার কুন্তলকে ধন্যবাদ জানিয়ে সোজা চলে যায়, বোলপুর অনাথ আশ্রম থেকে একটা ছোট্ট  তিন বছরের মেয়েকে দত্তক নিয়ে, শান্তি নিকেতনে চলে আসে |দেখে বন্যা চোখ বন্ধ করে শিমুল গাছের নিচে বসে আছে |আর ওর চারিদিকে লাল শিমুল ফুল পড়ে আছে দূর থেকে ওকে দেবীর মতো লাগছে |বকুল ওর কোলে ছোট্ট মেয়েটাকে বসিয়ে দিতেই বন্যা চোখ খুলে সামনে বকুলকে দেখে অবাক হয়ে জিগ্যেস করলো তুমি কি করে জানলে আমি এখানে? আর এটাই বা কে?বকুল বলে এটা আমাদের মেয়ে শিমুল |রবীন্দ্রনাথ সবার প্রাণের কবি তাই একজন কবি তো তার মন খারাপ হলে আরেক জন কবির কাছেই যাবে |আর তুমি ও তো কবি তাই আমি বুঝে ছিলাম তোমাকে এখানেই পাবো,আর দেখো পেয়েও গেলাম ? বকুল চুপ করতেই শিমুল আধো আধো গলায় বলে উঠে মা বাড়ী চলো আমার খিদে পেয়েছে, বন্যা শিমুলকে বুকে জড়িয়ে, বলে বকুল আজ তুমি আমাকে আমার জীবনের সবথেকে দামী উপহার দিলে| বকুল কিছু বলেনা,বন্যাও শিমুলকে জড়িয়ে বন্যার কপালে একটা চুমু খেলো  |

সমাপ্ত 

No comments:

Post a Comment

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...