বানিয়ে বানিয়ে--
ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
দশম শ্রেণির ক্লাসে ঢুকলেন মৈত্রেয়ী মুখার্জী।ছেলে মেয়েরা উঠে দাঁড়ালো।মৈত্রেয়ী দি ছাত্রছাত্রীদের কাছে জনপ্রিয়।ফর্সা, পাঁচ ফুট উচ্চতা।বয়সটা পঁয়ত্রিশ এর কাছে হবে বোধহয়।আজ সাদা জমিতে পিঙ্ক এর কল্কা দেওয়া শাড়িতে খুব ভালো লাগছে।মৈত্রেয়ী দি চেয়ারে বসলেন।গোবিন্দ বললে "ম্যাডাম।টুকাই ঘুমোচ্ছে"।
মৈত্রেয়ী দি সবাই কে বসতে বললেন।তারপর বললেন "এই তো বারোটা বাজে।এর মধ্যে এত ক্লান্তি।"উঠে গেলেন লাস্ট বেঞ্চে।যেখানে টুকাই আছে।বললেন "টুকাই।অ্যাই টুকাই।"
টুকাই ঘুমের ঘোরে বলে "জগন্নাথ ধল"।
টুকাই এর পাশে বসে হরি।ও বলল "ম্যাডাম।ও স্বপ্ন দেখছে।ভুল বকছে।"
বলেই টুকাইকে ঠ্যালা দিল।বললে "অ্যাই।ওঠ"।
টুকাই ধড়ফড় করে উঠে চমকে উঠলো।দেখলে ম্যাম।উঠে দাঁড়িয়ে বলল "আর হবে না ম্যাম।"
মৈত্রেয়ী দি অন্যধরণের মানুষ।টুকাই এর মাথায় হাত দিয়ে বললেন "কী বলছিলে যেন ঘুমের ঘোরে?"
টুকাই বলে চলে "স্বপ্নে আমি ধলভূমে গিয়েছিলাম ম্যাম।জগন্নাথ ধলের সাথে কথা বলছিলাম"।
গোবিন্দ ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে বলে "ওর প্যাট গরম ম্যাম।ব'ই তে যা পড়ে স্বপ্নে তাই দেখে।কাল ইতিহাস ক্লাসে জগন্নাথ ধলের গল্প শুনিয়েছেন দেবপ্রিয় স্যার।আর ও এখন সেই স্বপ্ন দেখছে।"
"এখন টিউটোরিয়াল।তাই ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলেই হয়।কী বলো তোমরা?"বললেন মৈত্রেয়ী দি।
ছাত্রছাত্রীরা একসূরে বলে উঠল "হ্যাঁ।তাই।"
দিদিমণি বললেন "তাহলে টুকাই আমাদের বলুক ওর স্বপ্নের গল্প"।
সবাই এবার উৎফুল্ল।গোবিন্দ বললে "ম্যাম।ও খুব ভালো বানিয়ে বানিয়ে বলতে পারে"।
ম্যাম বললেন "এসো টুকাই।বল।কী দেখছিলে স্বপ্নে"।
টুকাই ম্যাম এর কাছে গিয়ে বন্ধুদের দিকে মুখ করে শুরু করে ওর স্বপ্নের গল্প।
"ম্যাডাম।কাল দেবপ্রিয় স্যার ক্লাসে বোঝাচ্ছিলেন বিদ্রোহ আর বিপ্লব এক নয়।এ প্রসঙ্গে উনি চুয়াড় বিদ্রোহের কথা বলেছেন।আর ওই চুয়াড়দের নেতা ছিলেন জগন্নাথ ধল"।
মৈত্রেয়ী ম্যাম উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন।বলেন বাঃ।তারপর বলো।
টুকাই বলে চলে "ধল দের প্রকৃত পদবী সিংহ।আর আমার পদবী ও তাই।"
গোবিন্দ বলে "ও ওইরকম ই।একটা কিছু শুনলে তাতে রঙ চড়ায়"।
মৈত্রেয়ী দি বলেন "টুকাইকে বলতে দাও"।
টুকাই এবার বেশ সাহস পেয়ে গেছে।বলল "স্বপ্নে আমি হয়েছিলাম জমিদার।আমার নাম দুর্জন সিং।আর আমার এলাকা হল রাইপুর।"
ফার্স্ট গার্ল প্রিয়াঙ্কা বললে "ইসস্।তুই হলি ট্যাঁকখালির জমিদার"।
মৈত্রেয়ী দি ডাস্টার ঠুকলেন।বললেন "কেউ অপ্রাসঙ্গিক কথা বলবে না"।
টুকাই বলে চলে "ইংরেজ কোম্পানি আমাকে একদিন বললে তোরা হ'লি চুয়াড়।তোদের জাতের ঠিক নেই।তোরা হলি নীচু জাত।"
এবার সব ছাত্র ছাত্রী আকৃষ্ট হয়েছে টুকাই এর গল্পে।চোখ বার করে শুনছে সবাই।ম্যাডাম বললেন "তারপর!"
"তারপর ম্যাম।কী বলবো!ইংরেজরা এত পাজি।বললে বেশি বেশি টাকা দাও।ফসল দাও।কনোয়ালিস নিয়ম করলে সুয্যি ডোবার আগে রাজস্ব দাও"।
মৈত্রেয়ী দি বললেন 'ঠিক করে বলো।কর্ণ ওয়ালিস।"
টুকাই বললে "হ্যাঁ।আমার পাইকান জমিতে অত ফসল হয় না।আর ওদের অত্যাচার দেখলে আপনিও রেগে যেতেন।"
হাসির ঝিলিক ম্যাডাম এর মুখে।বললেন "বিদ্রোহের জন্ম তো অসন্তোষ থেকেই হয়।কিন্তু পাইকান জমি বলছো কেন?এমন বলার কারণ কী?"
"কী বলবো ম্যাম।জঙ্গলমহলের নিষ্কর জমি আমি পূর্বপুরুষ এর আমল থেকে ভোগ করে আসছি।আর ব্রিটিশ রা বললে বাজেয়াপ্ত করবো।তাই বিদ্রোহ করেছি।জ্বালিয়ে দিয়েছি আগুন।আমার সাথে চালাকি!"
"তুমি কি রাজস্ব দিতে পারো নি?তারপর কী হল।"
"জমিদার দের সাথে আপোষ করলো।জগন্নাথ ধল বললে অন্যায়ের প্রতিবাদ যে মানুষ করতে পারে না তার শিরদাঁড়া নেই।সে পরাধীন"।
এটুকু বলার পর ঘন্টা বাজল।তৃতীয় ঘন্টা শেষ।মৈত্রেয়ী দি অবাক হয়ে গেলেন ।ভাবলেন এই ম্লান মুখগুলো তে কত শক্তি।কী সুন্দর করে আজ বলল টুকাই।তারপর বললেন "এইভাবে কল্পনা করবে তোমরা।স্বপ্ন দেখবে।তোমাদের মধ্যে অনেক শক্তি"।
আজ ম্যাডামকে খুবই আনন্দিত দেখাচ্ছে ।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment