বাগান--
নিলেশ নন্দী
ছোট্ট দোতলা বাড়িটার সামনে বিশাল বড় বাগান। ফুল, ফল, শাক-সব্জি, কি নেই তাতে? রং-বেরংয়ের বাহারি ফুল, আম, জাম, কাঁঠাল, সবেদা, আতা ইত্যাদি গাছ এবং লাউ, কুমড়োর সঙ্গে বাহারি শাকে বাগান ছেয়ে রয়েছে। সাগ্নিক রোজ বাগানের পরিচর্যা করে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণভরে বাতাসের গন্ধ ফুসফুসে শুষে নিতে থাকে। দুহাতে আলতো করে সযত্নে সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলের সুবাস নেয়। প্রকৃতিই তার আদি অন্ত প্রাণ। সে জানে, গাছ না থাকলে কোন প্রাণীও থাকবে না। সবুজের সংস্পর্শেই সে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত। এখন শরৎকাল। বাগানের একপাশে একফালি জমিতে ছোট ছোট কাশফুল ফুটেছে। শিউলি গাছে অজস্র শিউলি ফুল ফুটে আছে। গাছের তলায়ও কচি কচি ঘাসের উপর শিউলি ফুল ঝরে পড়েছে। কি অপূর্ব সুন্দর সেই দৃশ্য! সাগ্নিক দেখল আকাশের টুকরো টুকরো মেঘের তলে এখন কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে। এই সময়টায় প্রায়ই এমন হয়। বর্ষাকাল চলে যাওয়ার পরেও বর্ষা পিছু ছাড়ে না। তবে বর্ষা হলে গাছেরা বর্ষার জল পায়, যা গাছেদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তারপর বর্ষা শেষে মেঘ সরে গিয়ে সূর্যের কোমল কিরণ বিচ্ছুরিত হয়ে গাছেদের পাতা ঝলমলিয়ে ওঠে। যেন শত শত হীরককণা তাদের বাগানে এসে জড়ো হয়েছে। এরই মধ্যে কখন যেন বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা তার গায়ে এসে পড়েছে, তার খেয়ালও নেই। ঠিক সেই সময় অনিন্দিতা এসে তাকে ডাক দিল, "কি গো, বৃষ্টিতে ভিজছ কেন? ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে। তুমি জানো না, এই সময় বৃষ্টিতে ভেজা বারণ? কতজনের অসুখ-বিসুখ হয়ে গিয়েছে।"
সাগ্নিক একটু হেসে বলল, "আমার কিচ্ছু হবে না। তুমি চিন্তা করো না। পরিবেশকে যখন কাছ থেকে পেয়েছি, তখন তাকে প্রাণভরে উপভোগ করা উচিত। সবার ভাগ্যে তা জোটে না।"
অনিন্দিতা একটু গলে গিয়ে বলল, "আচ্ছা বাবা। এখন এসো। বৃষ্টি কমে গেলে আমরা দুজন একসঙ্গে বাগানে গিয়ে অনেকটা সময় কাটাব।"
সাগ্নিক ছুটে গিয়ে বারান্দার ওপর উঠে দাঁড়াল। অনিন্দিতা শাড়ির আঁচল দিয়ে তার মাথার জল মুছে দিল। অনিন্দিতা সাগ্নিকের খুব খেয়াল রাখে। সাগ্নিকও তাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু, সাগ্নিকের তো কোনদিনও গাছপালার উপর কোন টান ছিল না? তাহলে তার হঠাৎ করে এরকম টান জন্মানোর কারণ কি? তাছাড়া, এই বাগান তো তার বাবা শুভময়বাবু নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন। সারাটা দিন তিনি বাগানেই পড়ে থাকতেন। তিনি যখন রোগে শয্যা নিলেন, তখন সাগ্নিককে বলেছিলেন বাগান পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে। সাগ্নিক প্রথমে আপত্তি জানালেও পরে বাবার শরীরের দিকে নজর রেখে সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। শুভময়বাবু তাকে বারবার বলতেন, "প্রকৃতিকে যত ভালোবাসবি, তার দেখভাল করবি, ততই দেখবি সেও তোকে ভালো কিছু রিটার্ন দিচ্ছে। প্রকৃতি না থাকলে আজ আমরাও থাকতাম না।"
যেদিন তিনি সাগ্নিকদের ছেড়ে চলে গেলেন, সেদিন যাওয়ার আগে তিনি প্রাণভরে বাতাসের শ্বাস গ্রহণ করেছিলেন। তারপর চিরতরে প্রকৃতির মাঝেই বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন। তবে আজ সাগ্নিকের প্রকৃতির প্রতি যে অটল টানের সৃষ্টি হয়েছে, তা কি বংশানুক্রমে লাভ করা? নাকি অন্য কোন কারণ আছে? বাবার হঠাৎ করে মৃত্যুর শোকে কি সে বাবার কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে? সে তা জানে না। শুধু এটাই জানে সে প্রকৃতিকে ভালোবাসবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশে সাদা পেঁজা তুলোর মত টুকরো টুকরো মেঘ ভেসে উঠল। সূর্যের ছটা বাগানের ওপর পড়তেই শত শত হীরকবিন্দু ঝলমলিয়ে উঠল। সাগ্নিক এবং অনিন্দিতা দুজনে একে অপরের হাত ধরে বাগানের দিকে এগোল।

No comments:
Post a Comment