Wednesday, 2 November 2022

বানিয়ে বানিয়ে--ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়



বানিয়ে বানিয়ে--

ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়


দশম শ্রেণির ক্লাসে ঢুকলেন মৈত্রেয়ী মুখার্জী।ছেলে মেয়েরা উঠে দাঁড়ালো।মৈত্রেয়ী দি ছাত্রছাত্রীদের কাছে জনপ্রিয়।ফর্সা, পাঁচ ফুট উচ্চতা।বয়সটা পঁয়ত্রিশ এর কাছে হবে বোধহয়।আজ সাদা জমিতে পিঙ্ক এর কল্কা দেওয়া শাড়িতে খুব ভালো লাগছে।মৈত্রেয়ী দি চেয়ারে বসলেন।গোবিন্দ বললে "ম্যাডাম।টুকাই ঘুমোচ্ছে"।

মৈত্রেয়ী দি সবাই কে বসতে বললেন।তারপর বললেন "এই তো বারোটা বাজে।এর মধ্যে এত ক্লান্তি।"উঠে গেলেন লাস্ট বেঞ্চে।যেখানে টুকাই আছে।বললেন "টুকাই।অ্যাই টুকাই।"

টুকাই ঘুমের ঘোরে বলে "জগন্নাথ ধল"।

টুকাই এর পাশে বসে হরি।ও বলল "ম্যাডাম।ও স্বপ্ন দেখছে।ভুল বকছে।"

বলেই টুকাইকে ঠ্যালা দিল।বললে "অ্যাই।ওঠ"।

টুকাই ধড়ফড় করে উঠে চমকে উঠলো।দেখলে ম্যাম।উঠে দাঁড়িয়ে বলল "আর হবে না ম্যাম।"

মৈত্রেয়ী দি অন্যধরণের মানুষ।টুকাই এর মাথায় হাত দিয়ে বললেন "কী বলছিলে যেন ঘুমের ঘোরে?"

টুকাই বলে চলে "স্বপ্নে আমি ধলভূমে গিয়েছিলাম ম্যাম।জগন্নাথ ধলের সাথে কথা বলছিলাম"।

গোবিন্দ ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে বলে "ওর প্যাট গরম ম্যাম।ব'ই তে যা পড়ে স্বপ্নে তাই দেখে।কাল ইতিহাস ক্লাসে জগন্নাথ ধলের গল্প শুনিয়েছেন দেবপ্রিয় স্যার।আর ও এখন সেই স্বপ্ন দেখছে।"

"এখন টিউটোরিয়াল।তাই ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলেই হয়।কী বলো তোমরা?"বললেন মৈত্রেয়ী দি।

ছাত্রছাত্রীরা একসূরে বলে উঠল "হ্যাঁ।তাই।"

দিদিমণি বললেন "তাহলে টুকাই আমাদের বলুক ওর স্বপ্নের গল্প"।

সবাই এবার উৎফুল্ল।গোবিন্দ বললে "ম্যাম।ও খুব ভালো বানিয়ে বানিয়ে বলতে পারে"।

ম্যাম বললেন "এসো টুকাই।বল।কী দেখছিলে স্বপ্নে"।

টুকাই ম্যাম এর কাছে গিয়ে বন্ধুদের দিকে মুখ করে শুরু করে ওর স্বপ্নের গল্প।

"ম্যাডাম।কাল দেবপ্রিয় স্যার ক্লাসে বোঝাচ্ছিলেন বিদ্রোহ আর বিপ্লব এক নয়।এ প্রসঙ্গে উনি চুয়াড় বিদ্রোহের কথা বলেছেন।আর ওই চুয়াড়দের নেতা ছিলেন জগন্নাথ ধল"।

মৈত্রেয়ী ম্যাম উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন।বলেন বাঃ।তারপর বলো।

টুকাই বলে চলে "ধল দের প্রকৃত পদবী সিংহ।আর আমার পদবী ও তাই।"

গোবিন্দ বলে "ও ওইরকম ই।একটা কিছু শুনলে তাতে রঙ চড়ায়"।

মৈত্রেয়ী দি বলেন "টুকাইকে বলতে দাও"।

টুকাই এবার বেশ সাহস পেয়ে গেছে।বলল "স্বপ্নে আমি হয়েছিলাম জমিদার।আমার নাম দুর্জন সিং।আর আমার এলাকা হল রাইপুর।"

ফার্স্ট গার্ল প্রিয়াঙ্কা বললে "ইসস্।তুই হলি ট্যাঁকখালির জমিদার"।

মৈত্রেয়ী দি ডাস্টার ঠুকলেন।বললেন "কেউ অপ্রাসঙ্গিক কথা বলবে না"।

টুকাই বলে চলে "ইংরেজ কোম্পানি আমাকে একদিন বললে তোরা হ'লি চুয়াড়।তোদের জাতের ঠিক নেই।তোরা হলি নীচু জাত।"

এবার সব ছাত্র ছাত্রী আকৃষ্ট হয়েছে টুকাই এর গল্পে।চোখ বার করে শুনছে সবাই।ম্যাডাম বললেন "তারপর!"

"তারপর ম্যাম।কী বলবো!ইংরেজরা এত পাজি।বললে বেশি বেশি টাকা দাও।ফসল দাও।কনোয়ালিস নিয়ম করলে সুয্যি ডোবার আগে রাজস্ব দাও"।

মৈত্রেয়ী দি বললেন 'ঠিক করে বলো।কর্ণ ওয়ালিস।"

টুকাই বললে "হ্যাঁ।আমার পাইকান জমিতে অত ফসল হয় না।আর ওদের অত্যাচার দেখলে আপনিও রেগে যেতেন।"

হাসির ঝিলিক ম্যাডাম এর মুখে।বললেন "বিদ্রোহের জন্ম তো অসন্তোষ থেকেই হয়।কিন্তু পাইকান জমি বলছো কেন?এমন বলার কারণ কী?"

"কী বলবো ম্যাম।জঙ্গলমহলের নিষ্কর জমি আমি পূর্বপুরুষ এর আমল থেকে ভোগ করে আসছি।আর ব্রিটিশ রা বললে বাজেয়াপ্ত করবো।তাই বিদ্রোহ করেছি।জ্বালিয়ে দিয়েছি আগুন।আমার সাথে চালাকি!"

"তুমি কি রাজস্ব দিতে পারো নি?তারপর কী হল।"

"জমিদার দের সাথে আপোষ করলো।জগন্নাথ ধল বললে অন্যায়ের প্রতিবাদ যে মানুষ করতে পারে না তার শিরদাঁড়া নেই।সে পরাধীন"।

এটুকু বলার পর ঘন্টা বাজল।তৃতীয় ঘন্টা শেষ।মৈত্রেয়ী দি অবাক হয়ে গেলেন ।ভাবলেন এই ম্লান মুখগুলো তে কত শক্তি।কী সুন্দর করে আজ বলল টুকাই।তারপর বললেন "এইভাবে কল্পনা করবে তোমরা।স্বপ্ন দেখবে।তোমাদের মধ্যে অনেক শক্তি"।

আজ ম্যাডামকে খুবই আনন্দিত দেখাচ্ছে ।

সমাপ্ত

অস্তিত্ব--ডঃ তাপস কুমার সরকার



অস্তিত্ব--

ডঃ তাপস কুমার সরকার 

আন্তর্জাতিক মাসিক রংধনু সাহিত্য পত্রিকার প্রথম বর্ষের  প্রথম সংখ্যার জন্য লেখা আহবান করা হচ্ছে।

বিষয়  অনির্দিষ্ট। ছড়া বা কবিতা  চব্বিশ লাইনের মধ্যে টাইপ করে পাঠান। লেখা মনোনীত হলে প্রকাশ করা হবে। শুধুমাত্র লেখায়  চিহ্ন/ শব্দ ব্যবহার করবেন। অন্যত্র নয়। নিজের অপ্রকাশিত লেখা বানান সংশোধন করে উল্লিখিত  তারিখের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাবেন। লেখা পাঠিয়েই ফোন/টেক্সট করবেন না। পেজে কলমসাথীদের লেখায় লাইক কমেন্ট ও শেয়ার করুন। নিজে পড়ুন অপরকে পড়ান।

   *।    *।    *।    *।    *।    *।    *।    *।    *।

বিজ্ঞাপন টা চোখে পড়তেই সুকান্ত কালকের লেখা কবিতাটা পাঠালো। যদি ছাপে! টাকা তো লাগবে না।   

অস্তিত্ব

শব্দের ও ধর্ম আছে

মনে পড়ে কার্নিভালে;

পিতৃপক্ষে বোধন হয়

শুভ অশুভের দ্বন্দ্বে।

ভালবাসি মাততে হুজুগে

উৎসব তো মজার।

আগে কে ? সাম্যবাদী না ধার্মিক

সে বিতর্ক যুক্তিহীন ;

ধর্মীয় বুদ্ধিজীবীদের সৃষ্টি ধর্মের

মূলমন্ত্র হলো "প্রশ্নহীন অন্ধ আনুগত্য"।

শিক্ষা জন্ম দেয় প্রশ্নের

প্রশ্ন করলেই নাস্তিক,

মুখ বুজে মানলেই আস্তিক।

কুচুটে, হিংসুটেদের যেন

নিন্দা মন্দ ছাড়া আর কিছু আসে না !

কারুর হয়ে কিছু বলা কে বলেছে ভালো ?

জানার পরিধিটা যার অজানায় ভরা

তার জন্য কিসের সমালোচনা ?

ধান্দার পদতলে টিঁকে থাকার মরিয়া চেষ্টায়

যাকে পাওয়া যায় তাকে আঁকড়ে ধরা।

পূজো পাঁজা ধম্মো কম্মো দেশপ্রেম মায়া মমতা

সব সাজিয়ে রাখা নিজের জন্য,,,

তথাকথিত রাজনীতির কারবার তাই

এটা যেন অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।    

*।   *।   *।   *। ‌‌ *।    *।    *।     *।     *।     *।    ‌*।    ‌

কয়েক দিনের মধ্যেই হোয়াটসঅ্যাপে উত্তর এলো " আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আপনার সাহিত্যকর্মটি প্রকাশের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এটি রংধনুর উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করবে এ বিষয়ে সন্দেহই নেই। আমরা সৌজন্য সংখ্যা দিতে অপারগ। সাহিত্যের উন্নতিকল্পে একটি সংখ্যা কিনে নেবার অনুরোধ করছি। হোয়াটসঅ্যাপে নির্বাচিত লেখক তালিকায় নাম দেখে ঐ নম্বরে ফোনপে করে সাতদিনের মধ্যে আড়াইশো টাকা পাঠানোর অনুরোধ করছি।"

উৎসাহিত হয়ে সুকান্ত টাকাটা পাঠিয়েই দেয়।

সমাপ্ত

চোতরা পাতা চিকিৎসা-- রানা জামান


চোতরা পাতা চিকিৎসা--

রানা জামান


গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে ঢং-এর কোনো কাজ না পেয়ে কোচরের শেষ ক'টা টাকা দিয়ে একটা ক্রাচ কিনে ফেললো জব্বর। ওর কাছে আর কোনো টাকা না থাকলেও চিন্তিত নয় ও। শিশুমেলার মোড় থেকে বাংলাদেশ বেতারের মোড় পর্যন্ত খুড়িয়ে হেঁটে ভিক্ষা করতে শুরু করলো। টাকার অভাব আর থাকলো না ওর। তবে এই রাস্তায় ভিক্ষা করার জন্য ট্রাফিক সার্জেণ্টকে ঘুষ দিতে হয়। শুধু ও না, সবাইকে দিতে হচ্ছে।

জব্বর আরেকটা বিষয় লক্ষ করেছে ট্রাফিক সার্জেণ্ট, ওর নাম আলাওল, লক্করঝক্কর বাস না আটকালেও মোটরবাইক এলেই আটকে রাস্তার পাশে নিয়ে যায় এবং যতই কাগজপত্র ঠিক থাকুক না কেনো মামলার ভয় দেখিয়ে ঘুষ আদায় করে যাচ্ছে। ওর কী তাতে!

জব্বর ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে ভিক্ষে করে যাচ্ছে। প্রতি মাসে কিছু না কিছু টাকা পাঠাচ্ছে বাড়িতে বৌ-বাচ্চাদের জন্য। যতই ও দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে চাক, কিন্তু যখন সার্জেণ্ট কোনো বাইকারকে আটকায় তখন অজান্তে ওর দৃষ্টি চলে যায় ওদিকে।

সহকর্মীদের সাথে মাঝে মাঝে জব্বর এটা নিয়ে কথা বললে, ওরা বলে, আমাগো কী! আমাগোও ছাড় দিতাছে না সারজেন! ঢাকায় কাম করতে হইলে পুলিশরে ঘুষ দিতে অইবো।

ছয় মাস পরে জব্বর গাঁয়ের বাড়ি এলো। ছেলেমেয়ে বৌ সবাই খুব খুশি। গাঁয়ে কোনো কাজ নেই। দুই শিশুকে দুই কাঁধে নিয়ে গাঁয়ের রাস্তা ধরে হেঁটে বেড়াচ্ছে।

একদিন দক্ষিণপাড়ার সামনে একটা বালককে দুই হাতে শরীর চুলকাতে চুলকাতে লাফাতে ও কাঁদতে দেখলো। ও এমন করছে কেনে জিজ্ঞেস করায় বালকটি বললো যে ওর ছোট ভাই ওর গায়ে চোতরা পাতা ঘষে দিয়েছে। জব্বর চোতরা পাতা চিনে।

দুই দিন পরে জব্বর চলে এলো ঢাকা। ও ভিক্ষা করে যাচ্ছে। সার্জেণ্ট আলাওল জ্যামে এক ট্রাকের কাগজপত্র দেখছেন। জব্বর হৃদপিণ্ডের স্পন্দন যথাসম্ভব সংযত রেখে এগিয়ে গেলো ওদিকে। সার্জণ্ট আলাওলের একদম গা ঘেঁষে ঝোলা থেকে চোতরা পাতার টুকরো সার্জেণ্টের ঘাড় ও দুই বাহুতে ছড়িয়ে দিয়ে সরে এলো। জব্বর তাকিয়ে আছে সার্জেণ্ট আলাওলের দিকে।

সার্জেণ্ট আলাওল প্রথমে ঘাড় চুলকালো, পরে বাহু। চুলকানি বাড়ছে। হাতের কাগজ ফেলে দিয়ে চুলকাতে

লাগলো শরীর। শুরু হলো সার্জেণ্টের লাফালাফি।

ছোটনের কীর্তি--রমা গুপ্ত



ছোটনের কীর্তি--

রমা গুপ্ত

পাড়ার ছেলে ছোটন ভীষণ দুরন্ত। ছোটবেলায় পাড়ার অন্যান্যদের বাড়িতে গিয়ে ভুলভাল কাজ করে মজা পেত। একবার একজনের বাড়ির ছাগল চুরি করে অন্যের বাড়িতে লুকিয়ে বেঁধে রেখে এসে দুই বাড়ির মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছিল।উল্টো দিকের বাড়ির মেয়েটা জানলা দিয়ে সেটা দেখেছিল। সে বলে দেওয়ায় ছোটনের কীর্তি ফাঁস হয়ে যায় এবং সে বেদম মার খায়। তবে ছেলেটি সরল ছিল মানুষের উপকারে লাগত। তোতলা ছিল বলে সবাই ওকে ক্ষেপাতো।

মনে পড়ে একবার 'শোলে' সিনেমা দেখে এসে শোলের ডায়লগ বলছে আর সবাই শুনে মজা পাচ্ছে। বলছে " তেলা তেয়া থোগা লে তালিয়া"  উ--ফ্ সবার কি হাসি! ওর মুখের এই ডায়লগ শোনার কারণে লোকের কাছে ওর বেশ কদর ছিল।

একদিন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, " হ্যাঁরে ছোটন শোলে সিনেমায় কে কে অভিনয় করেছে রে?" বলল- ধনন্দন আল হেনানালিনী। আমি বললাম, আর কেউ নেই?

ও বলল, "আতে তো!  অনিতাদ বাত্তন, দয়া ধাদুলি, হন্দিত্ তুনাল, আনজাদ আলি থান।" বললাম একটা ডায়লগ বলনা। ও খুশি হয়ে বলল, " তিতনে আদনি তে? দো আদনি?" 

এতটুকু বলেছে; অমনি একদল ছেলে এসে ওকে বলছে, " তুই আমাদের ঘুড়ির সুতো চুরি করেছিস কেন রে--? " বলেই  ওকে মারতে শুরু করেছে। ও বার বার বলছে , "আনি তুলি তলিনি " কিন্তু ছেলেগুলো শুনছে না।

ওর এইসব বদনাম আছে বলে আমি প্রথমটা গা করিনি। পরে ছেলেগুলোকে বাধা দিয়ে বললাম, " ও যে চুরি করেছে তার প্রমাণ কোথায়? তোমরা ওকে একদম মারবে না।" ছোটন কেঁদে কেঁদে বলছে" আনি তো ঘুলি ওলাই না, তুলি তলবো তেন?" ছেলেগুলো বলল, তাহলে তোদের বাড়ির   বাগানে কেন সুতো গুলো ছিল?

ছেলে মার খাচ্ছে শুনে ছুটে এসেছেন ওর মা। বললেন , "দেখছেন দিদি , পাড়ায় কিছু হলেই ওর দোষ হয়।ওকে কত বলি দুরন্তপনা করিস না। ও এখন তেমন বদমায়েশি করে না। তবু ওকে সবাই দোষ দেয়। তারপর ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, "ঐ ঘুড়ির সুতো মন্টু আর দিলু রেখে গেছে আমাদের বাগানে আমার সামনেই;  বলল পরে নিয়ে যাবে। এখন শুনি ছেলে মার খাচ্ছে , তাই ছুটে এলাম।"

তারপর ছেলেকে বললেন, "দেখ তোর পরিচিতি কি হয়েছে! এর ওর জিনিস নিয়ে   এখানে ওখানে লুকিয়ে রেখে মজা পাস; এখন কিছু ঘটলে তোকেই এসে ধরে। কতদিন বলেছি এসব করিস না, ঘর থেকে বেরোবি না। তোকে বাজে বললে আমার খারাপ লাগে না। আমি যে তোর মা!" বলেই কেঁদে ফেললেন। 

আমি সাত্বনা দিয়ে বললাম, বাচ্চারা ওরকম একটু দুষ্টুমি করে থাকে, ও তো ভালো ছেলে। এখন তো আর দুষ্টুমি করে না; তাই না? ছোটন মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল। মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "না আনি  আল থেলবো না। আনায় পাথি তিনে দাও, আনি পাথি নিয়ে থেলবো"। মা আঁচলে চোখ মুছে ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন।

আমার খুব খারাপ লাগলো। ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলতে পারেনা ছেলেটা। সবাই ওকে খ্যাপায়। একা একাই ঘোরে। তাই হয়তো ঐসব ভুলভাল কাজ করে মনে আনন্দ  উপভোগ করে।

অনেক দিন হলো ছোটনটাকে দেখা যায় না। ভাবলাম ওর মা হয়তো ওকে  আর বেরোতে দেয় না।পাড়ায় অন্য ছেলেপুলেদেরও বিশেষ খেলতে দেখি না।

শীতের বেলা বিকালে বারান্দায় বসে  উল বোনার কাজে ব্যস্ত। পাশের বাড়ির মহিলা আমায়  ডেকে বললেন,- ছোটনের কীর্তি শুনেছেন? বাব্বা! ভাবতাম  ছেলেটা খুবই দুরন্ত, সবাইকে বিরক্ত করা কাজ।  জানেন ও কি করেছে?  আজকে ঐ পাড়ার টোকনকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

বললাম, ঘটনাটা কি?  

উনি বললেন ছোটনের মা  গোটা কয়েক পায়রা কিনে দিয়েছে ছেলেকে। সেই নিয়েই  ছেলের দিন কাটে। আজ দুপুরে একটা পায়রা উড়ে টোকনদের বাড়ির ভিতর ঢুকে যায়।ছোটন পায়রার পিছন পিছন পাঁচিল টোপকে টোকনদের বাড়িতে ঢোকে। দ্যাখে উঠোনে মাদুর পেতে রোদে টোকন শুয়ে আছে আর ওর মাথার কাছে একটা সাপ ফনা তুলে  আছে। ছোটন তাড়াতাড়ি উঠোনে শুকোতে দেওয়া চাদর নিয়ে সোজা সাপটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সাপটাকে ঢেকে ফেলে।এতে টোকনের গায়ে ধাক্কা লাগে। টোকন ধড়পড়িয়ে উঠে ছোটনকে টানা হিঁচড়া করে মারতে থাকে আর বলে তোর স্বভাব যাবেনা বল! তুই বাড়ির ভিতর ঢুকে উৎপাত করতে চলে এসেছিস! 

ছোটন চাদরের উপর শুয়েই আছে, চাদরের তলায় সাপ। কিছুতেই চাদর ছাড়ছে না; তোতলিয়ে বলছে" থা--প, থা--প; গোথলো থাপ  তাদলেল তলায়"।

টোকনের চিৎকারে বাড়ির অন্যরা চলে এসেছে। ছোটন কি বলতে চাইছে আন্দাজ করে টোকনের বাবা সামনে রাখা গামলা দিয়ে চাদর সমেত সাপটা ঢাকা দিয়ে রাখলেন। পরে কায়দা করে চাদরে জড়িয়ে সাপটাকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এলেন। বিপদ থেকে ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ছোটনকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বাহবা দিলেন।

ছোটনকে পায়রার খোঁজ করতে দেখে টোকন বলে, তোকে আর পায়রার খোঁজ করতে হবেনা, আমি তোকে চারটে পায়রা কিনে দেব ; এখন বাড়ি যা।

খবরটা শুনে আমি আবেগ ধরে রাখতে পারলাম না। সঙ্গে সঙ্গে ছোটনদের বাড়ি ছুটলাম। দেখি সেখানে টোকন ও তার মা বসে আছে। ছোটনের  খুব গুনগান  করছে। আমি ছোটনকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করলাম। বললাম, " দেখেছো আমাদের এই ছেলে  কত পরপোকারী। আমরা এতদিন শুধু ওকে দুরন্ত, দুষ্টু বলেই জানতাম। আজ ঈশ্বর দেখিয়ে দিলেন ওর মধ্যে কেমন মহৎ গুণ আছে"। ছোটন  হাসলো, ওর মায়ের মুখেও হাসি।

শুনলাম ওর পায়রাটা ফিরে এসেছে। সকলেই খুশি। আমি বাড়ি চলে এলাম। মনে মনে ভাবলাম, আমিও দুটো পায়রা কিনে ছোটনকে গিফট করবো।

সমুদ্র হৃদয়--সান্ত্বনা চ্যাটার্জি



সমুদ্র হৃদয়--

সান্ত্বনা চ্যাটার্জি


বিশ্বনাথ হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়াল মালতী সেনের কিউবিকেলের সামনে । বলতো মিলিদি এবার কাকে প্রধাণ অতিথি করে আনছি; তুমি ভাবতেও পারবেনা । কমপুটারের খোলা স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়ে , সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করে মালতী- কেন কাকে আনছিস - আমিতাভ না কি শাহরুখ খান ! কিন্তু বিশ্বনাথ দমবার ছেলে নয়, ছেলেটার অফুরন্ত প্রাণ শক্তি; এতই উচ্ছল, চঞ্চল যে তার উপর রাগ করে থাকা যায় না। উঁহু হলনা, বললাম না তোমাদের তাক লাগিয়ে দেব। এবার প্রধান অতিথি বিজন রায় দি গ্রেট। কলকাতার ভ্যান গগ - কি ভুল বললাম ? মালতীর শীল্প প্রীতি কারু অজানা নয় এখানে । মালতী মাথা নামিয়ে গভীর মনজোগে তার সামনে খোলা ফাইলে চোখ রাখে ।বুকের ভিতর দামাম বাজছে যেন । কিশোরি মেয়ের মতন রাঙ্গা হয়ে ওঠে মুখ । বিব্রত মালতী কি করবে, কি বলবে, কোথায় মুখ লুকাবে ভেবে পায়না । মালতী কে বাঁচায় দীপ্তেন্দু । নিজের জায়গা থেকে চেঁচিয়ে ডাকে - এইযে বিশু খুব তো ভ্যানগগ ভ্যানগগ করছিস, প্রধান অতিথি হলেই চলবে, আর আর্টিস্ট লাগবে না। লোকে গান শুনতে আসবে অনুষ্ঠানে , প্রধান অতিথি রাখ ; আরতি না করে দিয়েছে শুনেছিস। ঐ টাকায় হয় না । নতুন আর্টিস্ট ধর । এখন তো ডুপ্লিকেটের যুগ । তাড়াতাড়ি যা - না হলে অনিক ও ফস্কে যাবে । মালতী হাঁফ ছেড়ে বাঁচে । স্বপ্নের জগতের মানুষ মালতী। সমুদ্র তাকে টানে । সমুদ্রের গভীরতা, তার গাম্ভির্য, তার উদ্দাম উদাসীনতা মালতীর ভালবাসার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখে । এই কঠিন বাস্তব জগতে ভালবাসার মতন কোমল, অবাস্তব স্বপ্ন বার বার ভেঙ্গে যায় কাঁচের ঘরের মতন। গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে মালতী । ****** মিলি, তোমার ভার আমি নিতে পারবনা, তুমি জানো। বল জাননা ! কেমন একটা রুক্ষ স্বরে বলে ওঠে বিজন। বালির উপর পিঠ করে থাকা মালতী কোনো উত্তর করে না । তুমি তো জান আমি ছন্নছাড়া, ঘরছাড়া, বাউল । এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে পারিনা আমি । ঘর , সংসার আমার জন্য নয়। আমি তোমায় সাথে নিয়ে চলতে পারবনা । আমার জীবন, আমার আত্মা, আমার সবকিছু আমি আমার সৃস্টির জন্য সরিয়ে রেখেছি মিলি, সেখানে তোমার কোনো জায়গা নেই । মিলি, মিলি শুনছ । মিলি তার ডান হাতটা বিজনের বুকের বাঁ-দিকে রাখে আস্তে করে , যেন ওজন করছে । মিলির চোখের দিকে তাকিয়ে বিজনের কথা থেমে যায় । সহসাই যেন মিলির দৃষ্টু বিজনের একেবারে বুকের ভিতর প্রবেশ করে তার চলাটা একেবারে থামিয়ে দেয় একটা ব্যথার মতন আনন্দে তার হৃদয় শিউরে ওঠে । মিলি বুঝতে পেরে হাসে । সমুদ্রের এক একটা ঢেউ যেন আরো কাছে এসে যাচ্ছে । এই ঘন বর্ষায় খ্যাপা মিলির টানে সমুদ্রের তীরে ছুটে আসা বিজন মিলির চোখের গভীরে হারিয়ে যায় - 'কি চাও মিলি, কি চাও আমার কাছে;' মনে মনে বলে বিজন ।স্টুডিওতে রাখা ক্যানভাস, তুলি , রঙ, কিছুই এই পাগল করা, বুক থমকে দেওয়া চোখ-দুটোকে ধরতে পারে না। অনেক চেষ্টা করেছে বিজন। ঠিক এমনি একটা ছবি আঁকবে যা দেখে দর্শক হৃদয় ঠিক তারই মতন থমকে যাবে ।- তা হয়না বিজন। ছবির আমি আর তোমার আমি কি এক !' ভীষণ ভাবে চমকে উঠল বিজন। মিলি কি তার মনের কথাও শুনতে পায়। মিলির শরীরের ছোটোছোটো ঢেউগুলো কাছে টানে বিজনকে। ভীষণ আকুল হয়ে বলে ওঠে বিজন- মিলি চল ফিরে যাই। চোরাবালির মধ্যে দুজনে হারিয়ে যাব। শেষ হয়ে যাব দুজনে চিরদিনের মতন। তাই কি চাও তুমি! বিজনের চিবুকের ভাঁজ একটা আঙ্গুল রাখে মালতী- চোরাবালি নয় বিজন- আমরা দুজনে দুজনের মধ্যে হারিয়ে যাব। যেমন সমুদ্রের ঢেউ সমুদ্রের মধ্যে হারিয়ে যায়, আবার ওঠে, আবার হারায়। ঠিক তেমনই করে নতুন নতুন করে হারাব দুজনে দুজনের মধ্যে। চেয়ে দেখ বিজন এখানে তুমি আর আমি, ঐ আকাশ আর সমুদ্র। ঢেউ আর বালি, মেঘ আর বৃষ্টি। আর কেউ নেই । চল আমরা আজ প্রথমবার হারিয়ে যাই। কোথায় হারিয়ে গেলি আবার- সুদর্শনার ডাকে চমকে ওঠে মালতী, হাসে অল্প । ঘরি দেখে এবার, পাঁচটা বাজে। ্টেবিলের কাগজ গুছিয়ে উঠে দাঁড়ায় মালতী। সুদর্শনা ব্যাগ হাতে করেই দাঁড়িয়েছিল। দুজনে গল্প করতে করতে চাঁদনি চক মেট্রো স্টেশনের দিকে এগিয়ে যায়। পথে চেনা ফলওলার কাছে এক কেজি আম কেনে মালতী, যা দাম হয়েছে এবার আমের, তবু কেনে মালতী। বুলতু আম বড় ভালবাসে আর মেয়েঅন্ত প্রাণ মালতীর । দেখতে দেখতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিন এগিয়ে আসে। মালতীর অস্থিরতাও বাড়তে থাকে । বিজন কি এখনও তাকে মনে রেখেছে । তার কি মনে আছে এই সংস্থায় মালতী কাজ করে । গত বার বছরে কত কি পরিব্ররতন হয়েছে । মালতীর জীবনে বিমান এসেছে, এসেছে তাদের মিলিত সন্তান বুলতু । বিমান ও মালতীর বিবাহিত জীবন এক কথায় বলা যায় একটি বিপর্যয় । বিমান ও মালতী দু-মেরুর প্রতীক। মালতী কোমল , বিমান কঠিণ, মালতী ভালবাসে কবিতা, ভালবাসে শীল্প, বিমানের মতে কবিতা ভাবাবেগের ট্র্যাস, শিল্প তার কাছে নিরর্থক । মালতীর প্রিয় গন্ধরাজ, বিমানের পিয় হুইস্কি । সন্ধ্যার পর যখন বিমানের ঘর্মাক্ত শরীর, নেশায় চূর অবস্থায় সোফার ওপর হাত-পা ছড়িয়ে পরে থাকে, মালতীর সারা সত্ত্বা যেন ঘৃণায় শিঊরে ওঠে । শরীর সর্বস্ব বিমানের কাছে মালতীর সুন্দর দেহ এক বিরাট আকর্ষণ , কিন্তু মালতীর হৃদয় মানেনা । তার প্রাণের অর্ঘ্য সে অপাত্রে কেমন করে ঢালে ! মালতীর সমর্পণ যে অপূর্ণ, বিমানের মনে সে সন্দেহ ছুঁএ ছুঁয়ে যায়, কিন্তু এর কারন খোঁজার মতন ধৈর্য বা মানসিকতা কোনটাই তার নেই । এক অর্থে সে সুখী, কারন সে বোধহীন । দীর্ঘ বার বছরে বিমান আরো ভারিক্কী হয়েছে, আরো বেরসিক, আরো সুরাসক্ত, আরো নির্বোধ ।মালতীর জীবনের সব রঙ মুছে গেছে, নিভে গেছে চোখের আলো, ভালবাসার স্বপ্ন বিমানের রুক্ষ স্বভাবের কাছে এসে ভেঙে পড়েছে । গত একমাসে বিন্দু বিন্দু জল পড়ে সে চরাপড়া ভাঙ্গা হৃদয়ে একটা চেনা সুর ছুঁইয়ে যাচ্ছে । মালতী আবার হারিয়ে যাচ্ছে তার স্বপ্নের জগতে । আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে চিন্তা করছিল মালতী, কোন শাড়িটা পরবে। বুলতু পাশে এসে দাঁড়ায়, তুমি লাল শিফনটা পর মা। দারুন দেখায় তোমায়। হ্যাঁ, তোর মায়ের তো বয়স বাড়ছেনা কমছে, মন্তব্য করে বিমান । নিঃশব্দে মালতী ঘন শ্যামলা সবুজ রঙের ঢাকাই শাড়িটা বার করে। সারা গায়ে মেরুন বুটি আর ঘন আঁচল। তার সঙ্গে বেছে নেয় মেরুন মিনে করা দুটো সোনার চুড়ি, একটা সরু সোনার চেনের সঙ্গে মেরুন মিনে করা লকেট আর , তেমনই একজোড়া দুল । প্রসাধন শেষে যখন উঠে দাঁড়ায় মালতী, মেয়ে বুলতু আবেগে জড়িয়ে ধরে মালতীকে। ওমা তুমি কি সুন্দর। মেয়েকে তাড়া দেয় মালতী। দেরী হয়ে যাবে যে, তাড়াতাড়ি জামা ছেড়ে নে দেখি। দুজনেই যাবে কারন বিমান গান বাজনা শুনে সময় নষ্ট করার পাত্র নয় । একটা ট্যাক্সি নেয় আজ মালতী। মেয়েকে নিয়ে যখন অনুষ্ঠান সভায় এসে পৌঁছয় তখন সভাপতির ভাষন শুরু হয়ে গেছে । বিশ্বনাথ ছুটে আসে- এত দেরী করে কেন । বিজন রায় এসে গেছেন । সবাই কত অটোগ্রাফ নিলো। বুলতুর মাথায় টোকা মেরে বললে- তোর মা একদম বোগাস। বিজন রায়ের মতন শিল্পীর কদর বোঝেনা । মা-মেয়েকে সামনের সারিয়ে দুটো খালি চেয়ারে বসিয়ে দেয় । সভাপতির ভাষন শেষ হয়েছে। এবার প্রধান অতিথি বিজন রায়কে কিছু বলতে অনুরোধ করা হল। মালতী তাকিয়েছিল। মাইকের সামনে এসে দাঁড়াল বিজন। সেই চোখ, সেই নাক, সেই ঠোঁঠ, একমাথা চুল এখনও আছে। কিন্তু তাতে সাদার ছোঁয়া লেগেছে। খদ্দরের পাঞ্জাবী আর পাজামা গায়। বয়স বিজনকে ছুঁতে পারেনি। তেমনি ঋজু ভঙ্গি , সোজা, পাতলা চেহারা । বিজন রায় কি বললেন কিছু শুনতে পেলোনা মালতী। ওনার বলা বোধ হয় শেষ হয়ে গেছে। সবাই হাততালি দিচ্ছে। দেউ একজন ছুটে এসে সই নিল একটা । এবার স্টেজ থেকে নেমে চলে যাচ্ছেন বিজন রায়। মালতীর বুকের মধ্যেকার পাঁজর ভেঙ্গে যাচ্ছে । কিন্তু না বিজন রায় এই দিকেই আসছেন। মালতীর সামনে এসে দাঁড়াল বিজন। চোখের কোনায় হাসি। মুখ গম্ভীর । তার হাতে একটা প্যাকেট। সেটা মালতীর দিকে এগিয়ে ধরে গম্ভীর স্বরে বলে বিজন- অনেক ধন্যবাদ। আপনার একটা প্রাপ্য ছবি আমার কাছে গচ্ছিত ছিল। আসলটা আমার কাছেই আছে । এটা তার নকল- সেটা দেখে আঁকা । এটা আপনার। যন্ত্রচালিতের মতন হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নেয় মালতী। বিজন রায় বেরিয়ে গেলেন। সবাই এবার ঘিরে ধরে মালতীকে। বাবা, ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছিল। তুমি তো আচ্ছা মহিলা। অমন একটা লোককে চেন, সে কথা বলনিতো । আরও কত কি। মেয়ে বুলতু মালতীর হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে খুলে ফেলে। একটা ছবি। বিশাল সমুদ্র আর আকাশের মিলন । তীরে বালুর উপর খোলা চুলে বসে এক রমনী। কি গভীর তার চোখের দৃষ্টি, কি আবেগ, কি মায়াময় । বুলতু বলে- ওমা ঠিক যেন তুমি মা, কিন্তু থেকে সুন্দর, আরো অনেক অনেক সুন্দর । হারানো ভুলে যাওয়া সমুদ্রের জোয়ার এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় মালতীকে, এই পার্থিব জগতের কাছ থেকে, সবার থেকে অনেক অনেক দূরে, এক সমুদ্র হৃদয়ে ।

সমাপ্ত

প্যাকেট বেনসন-- আফতাব উদ্দিন (বাংলাদেশ)


প্যাকেট বেনসন--

আফতাব উদ্দিন (বাংলাদেশ)


নিলয়ের গানের গলা ছিল অসাধারণ। যেমন তার সুরের দক্ষতা তেমনি তালে। কালে ভদ্রে অনেক অনুরোধের পর দু একটা গান যা করতো তাই মনে বাজতো সারাক্ষণ। কিন্তু ভার্সিটির এত এত লোভনীয় অফার আসার পরও কোন স্টেজ প্রোগ্রামে সে গান করতো না।

 ছোটবেলায় যা শিখেছিল। সেটুকু প্রতিভা দেখেই গান বাজনার লোকজন তাজ্জব বনে যেত। নিলয় রেগুলার গান না করলেও গানের তর্কে তাকে হারানোটা ছিল অসম্ভব। 

ছোটবেলায় নিলয় গান শিখেছিল কিছুদিন। তবে সেটা আর নিয়মিত হয়নি। সে পারিবারিক ভাবে রক্ষণশীলও ছিল না, আবার অর্থ কষ্ট আছে সেটাও না। তাহলে গান ছাড়লো কেন ?  নিলয় এই প্রশ্নের রহস্য এড়িয়ে যেত সবসময়...।


 মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সেকেন্ড সেমিস্টারে রেজাল্ট ফল্ট করলো অনেকের। নিলয় কোন রকমে পার পেয়ে গেলেও অনেকেই সেটা পারে নি। তাই সন্ধ্যার আড্ডায় গিটার নিয়ে এলো রাহাত। রাহাত ভাল বাজায় কিন্তু নিলয়ের হাতে গিটার যাওয়া মাত্রই মনে হল সরোদের আবেশ ঝরছে চারপাশ। আমাদের অনেকেই সেদিন প্রথম জানলো নিলয় গিটারটাও শিখেছিল ছোটবেলায়। বেশখানিকটা আড্ডার পর রাহাত পকেট থেকে এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট বের করল। ছাত্র জীবনে বেনসনটা একপ্রকার বিলাসীতাই ধরা যায়। বেনসন পেয়ে সবাই বেশ খুশি। কিন্তু হঠাৎ নিলয়ের মেজাজ বিগড়ে গেল। সে আর থাকতে চাইছে না। রাহাত চেপেচুপে মিনিট দশেক বসিয়ে রাখলেও নিলয় উঠে চলে যায়। সবাই কমবেশি ওর এই আচরণে আশ্চর্য। শুধু শিহাব ছাড়া। শিহাব ওর এলাকার। নিলয়ের স্কুল ফ্রেন্ড। তার মুখেই শোনা গেল বাকি ঘটনা। 

ছোটবেলায় গায়ক হিসেবে বেশ নাম করে নিলয়। একবার এক কম্পিটিশনে ভাল গান গেয়েও বেচারা বাদ পড়ে । ছোট্ট নিলয় দেখতে পায় বিচারকের আসনে বসা গুণী মানুষটি এক প্যাকেট বেনসনের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে নিলয়ের শ্রম, নিলয়ের মেধা। 

তারপর যা ঘটার তাই। ছোট্ট নিলয় সেদিন থেকেই রাগে ক্ষোভে গান গাওয়া ছাড়ে। আজও বেনসন সিগারেটের প্যাকেট মনে করিয়ে দেয় ছোট্ট বেলার সেই যন্ত্রণা....!

নিলয়ের মত এমন অনেক শিশু শিল্পী ছোট্টতেই হারিয়ে যায়। তারা বড় হয়ে কেউ ডাঃ হয় কেউ ইঞ্জিনিয়ার কিংবা অন্য পেশার। অথচ তারা কেউ শিল্পী পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠে না।

একটা ভাল গানের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা যে কতটা যন্ত্রণার তা শ্রোতারাই ভাল জানেন। নিলয়ের মত শিল্পীরা যদি এক প্যাকেট বেনসনের কাছে তখন বিক্রি না হত তবে দীর্ঘ এ অপেক্ষার যন্ত্রণা শ্রোতাদের থাকত না.......।

সমাপ্ত

ধোঁয়ার কুণ্ডলী--সুমনা রায়


ধোঁয়ার কুণ্ডলী

সমনা রায়

বৃষ্টি রাতে একা পড়ে থাকা বেঞ্চটায় বসে চোখ থেকে চশমা খুলে নেয় শুভ্র। বাইরে কিছু আর যেন দেখবার নেই। তাকায় নিজেরই দিকে। ঘন তমসায় নিভৃত নির্জন চারিধার। আকাশ আর শুভ্র মুখোমুখি। রবিবাবুর কয়েকটা পংক্তি খুব তাড়া করছে -' সমাজ সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব।' অবাক হয়ে ভাবে কেউ এতটা বদলাতে পারে! ভাবে আজকের দিনটার কথা!শেষরাত থেকেই একটানা বৃষ্টি। অবশ্য অকালবর্ষণ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই কারণ আজ আর অফিস টাইমের ট্রাফিক ঘাঁটার নেই। আজ ট্যুর। কোভিডের জন্য দেড় বছর পর। সাংসারিক অভ্যস্ততা ঝেড়ে আজ থেকে আবার শুরু। কোয়ালিটি কন্ট্রোলের হেড শুভ্র সেন। কাজে যেমন চাপ তেমন নাম। কলিগরা অনেকেই এখন ভালো বন্ধুও। শুভ্র যদিও নিজের ঘরের কথা বা ব্যক্তিগত বিষয়গুলো অফিসে কখনোই আলাপ করতে অভ্যস্ত নয় কিন্তু অন্যরা ওর সাথে সহজেই নিজেদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কথা বলতে পারে। রমাদি, রেহান, শান্তনু, অজয়দারা অনেক ব্যক্তিগত কথা বলেন। পরামর্শও চেয়ে থাকেন। অজয়দা তো বৌদির সাথে সম্পর্কের তিক্ততা নিয়ে মাঝেমাঝেই কথা বলেন। দুঃখ করেন। অনেকের সঙ্গেই এখন যোগাযোগটা কিছুটা পারিবারিকও। শুভ্রর বাড়িতেও এসেছে কেউ কেউ । মিমির সাথেও পরিচয় আছে। মিমির রান্নায় মুগ্ধ হয়েছে অনেকেই। শুভ্রর অফিসে জনপ্রিয়তার আরও একটা কারণ আছে। অফিসে ও অনলাইন শপিংগুরু। আজকাল প্রায় সব কলিগরাই কিছু কিনতে হলে ওকে ডাকে। জামা জুতো নতুন কিছু কেনার পর পরে এসে শুভ্রকেই আগে দেখায়। অজয় বোস তো পরশু নতুন জুতো পরে সবার আগে এসে শুভ্রকে দেখালেন। অবশ্য একদিন শুভ্রই বলেছিলো ব্রাউন জুতোজোড়া কিনতে আর কার্টে রেখেও দিয়েছিল। শুভ্র খুশি হয়। 

ঘুম থেকে উঠেই এমন কান্নাভেজা দিন দেখলে মেজাজটা খারাপ হয়। শুভ্র খুব একটা বৃষ্টিবিলাসী নয়। তবে আজ খুব একটা খারাপ লাগছে না। বিকেল পাঁচটায় দিল্লির ফ্লাইট। একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই মিমি এক মগ চা নিয়ে এলো। বৃষ্টি আর ঠান্ডা হাওয়ায় গরম অনেকটাই কমে গেছে। একসময়ের গণসঙ্গীত শিল্পী গুনগুন করে 'এমন দিনে তারে বলা যায়'। জলখাবারে আজ প্রিয় সব খাবার।

"এতকিছু! কেন করতে গেলে? বাবিও তো নেই বাড়িতে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব করার কী দরকার ছিল? এই বৃষ্টিতে সুমিত্রা আসতে পারেনি নিশ্চয়!"

" কী হলো তাতে!”

"কী দরকার ছিল? তোমার ব্যথাটা আবার বাড়িয়েই ছাড়বে।"

"আরে না না। এইটুকুতেই কিচ্ছু হবে না। রোজ তো সকালে অফিসের তাড়া থাকে। সুমিত্রাও সময়মতো এসে রান্নায় হাত লাগাতে পারে না। আজ কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তাই। খেয়ে বলোনা কেমন হয়েছে?"

"দারুণ!

জানতে তো আমার ট্যুর আছে। কেন বাবিকে ওই বাড়ি যেতে দিলে?

"ইউনিট টেস্টের জন্য অনেক চাপে ছিল কদিন। ওখানে ডাব্বু আর ডোডোদের সাথে একটু মজা করে আসুক। দুটোদিন আমার কেটে যাবে।

শুভ্র মিমির দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের ব্যথাটা চেপে ঘরের সবকাজ সামলাচ্ছে তবু এতটুকু বিরক্তি নেই চোখে মুখে!

“কী এতো ভাবছো? শোনো না! তুমি তো আগে দিল্লি গেলে মাঝে মাঝে রিমিটার সাথে দেখা করে আসতে। এখন ছেড়েই দিয়েছো। এমন স্মার্ট আর সুন্দরী শ্যালিকা পেলে লোকে ঘন ঘন ট্যুর চেয়ে নিতো আর তুমি?"

খুব জোরে বিষম খায় শুভ্র। মিমি ওকে কথা বলতে বারণ করে। উঠে এসে পিঠ বুলিয়ে দেয়। অবশ্য মিমি না বললেও শুভ্র এইমুহূর্তে কোন কথাই বলতে পারতো না। রিমির প্রসঙ্গটা এই চারবছর ধরে এড়িয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করে যাচ্ছে। নিজেকে তিনজনের কাছেই অপরাধী লাগে সেই রাতের কথা মনে পড়লে। নিজের কাছে সবচেয়ে বেশি।

রিমির বর রাজর্ষি ওকে কত ভালোবাসে! ডাকে বারবার। শুভ্রই এড়িয়ে যায়। শুভ্র আজও বুঝতে পারে না কী করে সেদিন এমন হলো। রিমির ওখানে গিয়ে ফ্রেশ হলো একটু গল্প করলো। ভিডিওকলে মিমির সাথে কথাও বললো। রাজর্ষির সাথে ফোনে কথা হলো। ওর অফিসের সার্ভার  ক্রাশ করেছে। ও কিছুতেই রাতে আর বাড়ি ফিরতে পারছে না জানালো। তারপর কাবাব আর মোয়িতো খেলো। এইটুকু পরিষ্কার মনে আছে। তারপরের সবটুকু ঘোলাটে। কতোটা কাছে গিয়েছিলো? ও নিজের ইচ্ছায় এগিয়ে গেলো! এমন তো হবার কথা নয়। জীবনে কখনও তো এমন হয়নি। মিমি ছাড়া কোথাও কোনোদিন ও এমন সুখের কাছে যেতে চায়নি! আর চাইবেই বা কেন! মিমিতেই তো খুঁজে নিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সুখের আশ্রয়। তবে কি রিমি ওকে ছলে কৌশলে এমন করলো! কিন্তু কেন করবে! ও তো নিজেই বললো রাজর্ষিকে নিয়ে খুব সুখী। এই সুখের ইচ্ছাগুলো কি তবে সুযোগ পেলেই আগাছার মতো বেড়ে ওঠে এদিক ওদিক? এই জট শুভ্র আজও খুলতে পারে না।

জলখাবার খেয়ে ঘরে চলে যায়। প্যাকিং একটু বাকি। মিমির সব মেডিক্যাল রিপোর্টস গুছিয়ে নিতে হবে। স্কুলের বন্ধু তাপস তার সিনিয়র এক ডাক্তারবন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। দিল্লির। খুব বড় ডাক্তার। এমনিতে এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া সোজা নয়। কিন্তু তাপসের জন্য পেয়ে গেলো। আজ রাতেই ওখানে যাবে। উনি সব দেখে বলবেন মিমির হাঁটু রিপ্লেসমেন্ট এখনই করাতে হবে কি না। কোথায় কীভাবে করা যায় এসব পরামর্শ। মিমির ব্যথা শুভ্রকে অপরাধী করে তোলে। বাবি আর শুভ্রর অসুবিধে হবে আর অনেক টাকা খরচ হয়ে যাবে হয়তো এসব ভেবে ভেবেই মিমি অপারেশনের প্রসঙ্গটাই এড়িয়ে যায়। শুভ্র আর শুনবে না এইসব। এয়ারপোর্ট থেকেই সোজা চলে যাবে। সব ফাইনাল করে তবেই মিমিকে জানাবে।

তৈরি হয়ে উবার ডেকে নিল। মিমিকে একা রেখে যেতে খারাপ লাগছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন মায়া লাগছে। এরকম ওয়েদারে টিভিও চলে না প্রায়ই। পাওয়ারও যদি চলে যায়! ইনভার্টারের সীমিত আলোর ভরসায় একা ঘরে থাকবে। মিমিকে জড়িয়ে ধরে আলতো করে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে টেনে নেয় ট্রলিটা।

এয়ারপোর্ট পৌঁছেই দেখলো ফ্লাইট এক ঘন্টা লেট। মেজাজ একটু খারাপ হলো। এই ব্যাজার মুখ নিয়েই ঝটপট সেরে নিল সিকিউরিটি। বার বার ঘড়ি দেখছে। একটা কফি নিয়ে আসার সময় দেখলো আরও এক ঘন্টা লেট। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো দিল্লির আবহাওয়ার জন্য এই দেরি। রাত সাড়ে নয়। জানতে পারলো ফ্লাইট ক্যান্সেল। মোবাইলও চার্জ করা হলো না। সুইচ অফ করে দিল। বিরক্তি, বিগড়ানো মেজাজ আর মনখারাপ নিয়ে বাইরে এলো। আবার একটা উবারে চাপলো শুভ্র। টের পেল মেজাজ খারাপটা কমেছে একটু। ঘরে ফেরাগুলো বুঝি সব মনখারাপকে এভাবেই হারিয়ে দিয়ে যায়। দরজার কাছে এসে বেলের দিকে আঙুল তুলতেই চোখ পড়ে তার পাশটায়। কী দেখা যাচ্ছে ! চকচকে একজোড়া ব্রাউন সু। খুব চেনা। হাত থেকে ট্রলিটা যেন আলগা হয়ে গেলো। পা দুটো অবশ লাগছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। ডোরবেল চাপতে পারলো না। যেন নিজের মধ্যেই তলিয়ে যাচ্ছে। সোজা গেটের কাছে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালো। ধোঁয়ার কুণ্ডলীগুলোকে বৃষ্টি কেমন করে ভেঙে চুরমার করছে শুভ্র তা দেখছে মগ্ন হয়ে। গেটের কাছের জগিংপা র্কটায় গিয়ে বসলো।

রাত প্রায় দেড়টা। চেনা চেনা একটা গাড়ি বেরিয়ে গেলো। দ্বিধাজড়ানো পায়ে উঠে আসে শুভ্র। কোনোদিকে না তাকিয়ে ডোরবেল চেপে দিলো শুভ্রকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মিমি শুরু করে - "ফ্লাইট ক্যানসেল? মোবাইল সুইচ অফ কেন?”

শুভ্র কিছু বলার আগেই পেছন থেকে পিসতুতো ভাই অর্ক আসে ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে। হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ লাগানো। শুভ্র আবার দরজা খুলে দেখে জুতোজোড়া এখনও আছে!

“তুই কী রে দাভাই? আমরা ফোন করে করে হয়রান।“

অর্ক আরো কী কী বলে যাচ্ছে শুভ্র শুনতেই পাচ্ছে না। শুধু এটুকু শুনলো – “জানিস তো মাকে এখন কমই মনে পড়ে। রাঙাবউদি আবার মনে করালো।"

শুভ্র মিমির মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে শুধু ...

সমাপ্ত

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ সপ্তদশ অধ্যায়--অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর --বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল

শ্রদ্ধাত্রয়ো যোগ  সপ্তদশ অধ্যায় -- অনুবাদ তথা গল্প রূপান্তর -- বীরেন্দ্রনাথ মন্ডল  ------------------------------------------- ...